বিএনপি সরকারের ছয় মাসও পূর্ণ হয়নি। এর মধ্যেই দলের নেতাকর্মীদের নানা কর্মকাণ্ডে সরকার ও বিএনপি সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। সর্বশেষ মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান কেন্দ্র ভাঙচুর, লুটপাট ও গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা এবং এর পরদিন রাজধানীর ইসিবি চত্বরে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা সেই সমালোচনাকে আরও তীব্র করেছে। দুটি ঘটনা এক নয়, দুটির পেছনের বিরোধও এক নয়। কিন্তু দুটির ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপি সরকার কি শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জ সামলাচ্ছে, নাকি একই সঙ্গে নিজের দলের একটি অংশের আচরণও সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে?

মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ঘটনাটি বিশেষভাবে গুরুতর। ২৫ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি দল মুখোশ পরে সেখানে ঢুকে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে কেন্দ্রটির ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সাল থেকে সেখানে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা এবং টিকাদান কার্যক্রম চলছিল। পুলিশ এ ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে এবং লুট হওয়া সামগ্রীও উদ্ধার করেছে। মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে; তবে ঘটনার সঙ্গে কার কী সম্পৃক্ততা, সেটি তদন্তেই নির্ধারিত হবে।

আরও অস্বস্তিকর তথ্য এসেছে পুলিশের তদন্তে। ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, ঘটনাটি প্রতিরোধ করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ত। পরে তদন্তে দায়িত্ব পালনরত পুলিশের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ। অর্থাৎ এখানে শুধু দখল বা স্থাপনা ভাঙার অভিযোগ নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে থাকা অবস্থায় কীভাবে এত বড় ঘটনা ঘটল, সেই প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে। তদন্তকারীরা রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করছেন বলে জানিয়েছেন, তবে কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা এখনো বলা হয়নি।

মিরপুরের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা হয়। সালমান তাঁর স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটিকে চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত করেছেন এবং বিএনপির লোকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তবে পুলিশ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে এখন পর্যন্ত যে প্রাথমিক তথ্য এসেছে, তাতে ঘটনাটির পেছনে প্রায় ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে নিউ জিনি প্রপার্টিজ ও একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার পক্ষের বিরোধের কথা বলা হয়েছে। পুলিশ বলেছে, একটি পক্ষ জমির দখল নিতে গেলে সেখানে থাকা বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর হয় এবং সালমানের স্টুডিওও তার মধ্যে পড়ে। তিনজনকে আটক করা হয়েছে। সালমান এখনো এ ঘটনায় নির্দিষ্ট মামলা করেননি বলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন।

অর্থাৎ সালমানের চাঁদাবাজির অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তের বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ঘটনা ততক্ষণে বড় হয়ে গেছে। কারণ একজন জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতার স্টুডিওতে কয়েক শ লোক গিয়ে হামলা করছে, গুলি ছোড়ার অভিযোগ উঠছে, যন্ত্রপাতি ভাঙচুর ও লুটপাট হচ্ছে এবং ঘটনার ব্যাখ্যায় ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে। পরে টিআইবি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও দুটি ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জানিয়েছে। টিআইবি বিশেষভাবে বিএনপিকে নিজেদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

এই বিষয়গুলো বিএনপির শুভাকাঙ্খীদের মনেও প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিএনপি ক্ষমতায় আসার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে যদি দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের ঘিরে এমন একের পর এক অভিযোগ তৈরি হয়, তাহলে সমস্যাটি কি শুধু কয়েকজন ব্যক্তির, নাকি এর মধ্যে দলের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনারও কোনো দুর্বলতা রয়েছে?

কেউ কেউ হয়তো বলবেন, এই ঘটনাগুলো দিয়ে বিএনপির ছয় মাসের পুরো মূল্যায়ন করা যাবে না। হ্যাঁ, কিন্তু এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ধরে নেওয়া যায় না। কারণ ক্ষমতায় থাকা একটি দলের জন্য তার নেতাকর্মীদের আচরণও সরকারের কার্যকারিতার অংশ হয়ে যায়। একজন মন্ত্রী বা সচিব ভুল করলে যেমন সরকারের ওপর দায় আসে, তেমনি একজন স্থানীয় নেতা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কোনো অনিয়মে জড়ালে তার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও সরকারের ওপর পড়ে। আর এই জায়গাতেই বিএনপির অতীতের দিকে তাকানো দরকার।

খালেদা জিয়ার সময়ের রাজনৈতিক সহায়ক কাঠামো

বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় তাঁর চারপাশে এমন কয়েকজন রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন, যাঁরা শুধু আনুষ্ঠানিক কর্মকর্তা ছিলেন না; তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক যোগাযোগ, দলীয় সমন্বয় এবং ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবেও কাজ করতেন।

মোসাদ্দেক আলী ফালু এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া সরকার গঠন করলে ফালু তাঁর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকার সময়ও তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ২০০১ সালে বিএনপি আবার সরকার গঠন করলে ফালু প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব নেন। ২০০৪ সালে ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য তিনি ওই পদ ছাড়েন। তৎকালীন সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁকে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় এবং খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।

হারিস চৌধুরীর অবস্থানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া সরকার গঠন করলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠনের পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হন। তৎকালীন সরকারি নথিতে তাঁকে ‘পলিটিক্যাল সেক্রেটারি টু দ্য প্রাইম মিনিস্টার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। রাজনৈতিক সচিব হিসেবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিএনপির রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন।

তবে হারিস চৌধুরীর উদাহরণটি একেবারে সরলভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে এবং এসব অভিযোগে আদালতে মামলা ও দণ্ডের ঘটনাও ঘটে। তৎকালীন তদন্ত ও সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারি কাজ, নিয়োগ ও ব্যবসায়িক স্বার্থে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল। ফলে তাঁকে দুর্নীতিমুক্ত বা আদর্শ রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে দেখানোর কোনো সুযোগ নেই।

কিন্তু এখানেই ঐতিহাসিক তুলনাটির গুরুত্ব অন্য জায়গায়। খালেদা জিয়ার সময় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব বা বিশেষ সহকারীর পদগুলোতে থাকা ব্যক্তিরা ছিলেন রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান। তাঁদের নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় নেটওয়ার্ক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। তাঁরা শুধু প্রশাসনিক ফাইলের কর্মকর্তা ছিলেন না; দল, সরকার, সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে যোগাযোগের একটি স্তর হিসেবে কাজ করতেন। আর এখন....?

বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করেন। প্রধানমন্ত্রীসহ এই ৫০ জনের ৪১ জনেরই জাতীয় বা মন্ত্রিসভা পর্যায়ে প্রথমবারের মতো দায়িত্ব নেওয়া। অর্থাৎ এটি ছিল অভিজ্ঞতার সঙ্গে বড় আকারের নতুন মুখের সমন্বয়ে গঠিত একটি টিম।

নতুন মুখ আনা নিজে কোনো সমস্যা নয়। বরং দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দলের জন্য নতুন প্রজন্মকে রাষ্ট্র পরিচালনায় আনা প্রয়োজনীয়ও হতে পারে। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন নতুন বা পুরোনো যেই হোক, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে থাকে। মন্ত্রিসভা গঠনের সময়ই বিশ্লেষণে উঠে এসেছিল, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয় নতুনদের হাতে দেওয়া হয়েছে এবং একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন মন্ত্রীর অধীনে রাখা হয়েছে। এতে সমন্বয় কীভাবে হবে, সেটিও প্রশ্ন হিসেবে সামনে এসেছিল।

তারপর ছয় মাসের মধ্যেই মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন এসেছে। চারজন নতুন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হয়েছেন, একজন মন্ত্রীর দায়িত্ব পরিবর্তন হয়েছে। একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ছয় মাস পূর্তির আগে প্রধানমন্ত্রী যে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার কথা বলেছিলেন, তার ভিত্তিতে মন্ত্রীদের কার্যক্রম মূল্যায়ন হওয়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সেই মূল্যায়নের প্রক্রিয়া বা ফলাফল কতটা প্রকাশ্য, তা স্পষ্ট নয়। একই বিশ্লেষণে গত ছয় মাসে কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক, কিছু সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গও এসেছে।

এখানে মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাসকে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি বলা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি একে নিছক সম্প্রসারণ বলেও শেষ করা যায় না। কারণ একটি সরকার যখন ছয় মাসের মাথায় টিমে পরিবর্তন আনে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, প্রথম ছয় মাসের অভিজ্ঞতা থেকে নেতৃত্ব কী শিখল। কোন জায়গায় কাজ প্রত্যাশামতো হয়নি, কোথায় সমন্বয় ঘাটতি ছিল, কোন মন্ত্রণালয়কে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন হয়েছে, কিংবা কোন ব্যক্তিকে অন্য দায়িত্বে পাঠানোর প্রয়োজন হয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তরেই আসলে টিম ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বোঝা যায়।

এর আগে জুনেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের কাজ নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সেখানে উন্নয়ন প্রকল্প, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ, প্রশাসনিক কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও পর্যালোচনার আওতায় থাকার কথা বলা হয়েছিল। তিনজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে মৌখিকভাবে সতর্ক করার তথ্যও ওই প্রতিবেদনে ছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তখন বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতি তিন মাসে মন্ত্রীদের কাজ মূল্যায়ন করছেন।

এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নেতৃত্ব যদি সত্যিই নিয়মিত মূল্যায়ন করে থাকে, তাহলে ছয় মাসের অভিজ্ঞতার পর আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হওয়ার কথা, কোথায় সমস্যা হচ্ছে। আর সেখানেই তারেক রহমানের জন্য আসল প্রশ্নটি দাঁড়ায়- তিনি কি শুধু ব্যক্তিদের কাজ পর্যালোচনা করছেন, নাকি যেভাবে টিম নির্বাচন করা হয়েছে, সেই নির্বাচন প্রক্রিয়াটিকেও পর্যালোচনা করছেন?

যোগ্য মানুষের অভাব নয়, বাছাইয়ের দর্শন

বিএনপিতে যোগ্য মানুষের অভাব আছে, এমন কথা বলা কঠিন। দলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেতৃত্বে যেমন অভিজ্ঞ মানুষ আছেন, তেমনি নতুন প্রজন্মের মধ্যেও শিক্ষিত ও পেশাগতভাবে দক্ষ অনেক মুখ উঠে এসেছেন। সরকারের বাইরে থেকেও বিভিন্ন একাডেমিক, পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞকে রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত করার সুযোগ ছিল এবং আছে। ফলে বিষয়টি মানুষ খুঁজে পাওয়ার নয়, বরং কোন কাজের জন্য কাকে বেছে নেওয়া হচ্ছে, সেই রাজনৈতিক দর্শনের।

এখানে বিএনপির নিজের নির্বাচনী অঙ্গীকারও গুরুত্বপূর্ণ। দলের নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ থেকে মুক্ত রাখা এবং সততা, দক্ষতা, মেধা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রশাসন পরিচালনার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু জুলাই মাসে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ১২ জন বিএনপি নেতা-কর্মীকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়েও বিএনপির সঙ্গে পূর্বসম্পৃক্ত একজন সাবেক কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সরকার অবশ্য এসব নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিয়োগগুলো যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী ইশতেহারে দলীয় আনুগত্যের বদলে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ওপর জোর দেওয়ার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এসব নিয়োগের রাজনৈতিক উপলব্ধি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু আইনগত বৈধতা যথেষ্ট নয়; জনগণের আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। কোনো রাজনৈতিক দলের অভিজ্ঞ নেতা বা কর্মী যোগ্য হলে তিনি সরকারি দায়িত্ব নিতে পারবেন না, এমন কোনো যুক্তি নেই। কিন্তু তিনি কেন সেই পদে উপযুক্ত, তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতা কী, তাঁর নিয়োগের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ এবং একই পদে অন্য যোগ্য প্রার্থীদের বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর যত পরিষ্কার হবে, নিয়োগ তত বেশি গ্রহণযোগ্য হবে।

অন্যদিকে প্রশাসনে গত ছয় মাসের চিত্রও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮৯ জন সচিবের মধ্যে অন্তত ৪৪ জনকে বর্তমান সরকার নিয়োগ দিয়েছে এবং তাঁদের ১৬ জন চুক্তিভিত্তিক। মোট ২১ জন সচিব চুক্তিতে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সময়ে একজন সচিব ও ৩২ জন অতিরিক্ত সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। বদলি, ওএসডি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং নতুন করে ‘অ্যাটাচমেন্ট’ ব্যবস্থার ব্যবহার নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে প্রশ্ন রয়েছে।

সরকারের জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পদায়নের চেষ্টা চলছে এবং আইন মেনেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর জন প্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টাও বলেছেন, আগের সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলবে। অর্থাৎ সরকারের বক্তব্য হলো, এটি দলীয় প্রতিশোধ নয়; প্রশাসনকে পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা থেকেই পরিবর্তন করা হচ্ছে।

কিন্তু এখানেই পুরোনো বাংলাদেশের একটি সমস্যা আবার সামনে আসে। নতুন সরকার এলেই প্রশাসনের ওপর নতুন রাজনৈতিক ছাপ পড়বে, এই সংস্কৃতি থেকে যদি বের হওয়া না যায়, তাহলে সরকার বদলালেও শাসনব্যবস্থার চরিত্র খুব বেশি বদলায় না। আগের সরকারের সময়ে যে কর্মকর্তাকে ‘দলীয়’ বলা হয়েছে, নতুন সরকার তাঁকে সরিয়ে নিজের পছন্দের মানুষ বসালেই যদি সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে সেটি সংস্কার নয়, শুধু পক্ষ পরিবর্তন।

তারেক রহমানের জন্য তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে এই জায়গায়। বিএনপি যদি সত্যিই প্রশাসনে মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দিতে চায়, তাহলে দলীয় পরিচয় যেন যোগ্যতার বিকল্প না হয়। একইভাবে আগের সরকারের সঙ্গে কাজ করার অভিযোগ যেন একমাত্র অযোগ্যতার কারণও না হয়। রাষ্ট্রের প্রশাসন কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি যেমন দরকার, তেমনি দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহিও দরকার।

তৃণমূলে ক্ষমতার নতুন সমীকরণ

সরকার গঠনের পর বিএনপির আরেকটি সমস্যা তৈরি হয়েছে দলের ভেতরেই। প্রায় দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার পর দলটি ক্ষমতায় এসেছে। বহু কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতা এখন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা সরকারি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সরকার পরিচালনা এবং দল পরিচালনা দুটি আলাদা দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় আসার পর দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং তৃণমূলের একটি অংশ এখন দলীয় পদ, সরকারি সুবিধা বা স্থানীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার হিসাব নিয়ে বেশি ব্যস্ত। একই প্রতিবেদনে দখল, চাঁদাবাজি ও সহিংসতায় দলের একাংশের জড়িয়ে পড়ার অভিযোগের কথাও এসেছে।

এটি শুধু ভাবমূর্তির সমস্যা নয়। ক্ষমতায় থাকা একটি দলের জন্য সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ হারানো রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি করতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে এমপির প্রভাব, উপজেলা ও জেলা কমিটি গঠন, প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক, ব্যবসা ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ কিংবা স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই নিয়ে যদি দলের বিভিন্ন অংশের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ে, তাহলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।

এ কারণেই ২৭ আগস্টের সংসদীয় দলের বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে দলীয় নেতাকর্মীদের আচরণ নিয়ে সতর্ক করতে হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, নেতাকর্মীদের আচরণ সংশোধন করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিজেও বুঝছে, ক্ষমতায় আসার পর দলের একটি অংশের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা একটি বাস্তব রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

এই জায়গায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাও আলোচনায় আসে। আগস্টে জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল, ছাত্রশক্তি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। আবার সেপ্টেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত তিনজন আহত হন। এসব ঘটনা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সরাসরি সিদ্ধান্তে হয়েছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত যখন বারবার প্রকাশ্যে আসে, তখন সংগঠনটির ওপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

অর্থাৎ এখন বিএনপির জন্য সমস্যাটি শুধু বিরোধীদের সঙ্গে রাজনৈতিক লড়াই নয়। নিজের সংগঠনের ভেতরকার ক্ষমতার প্রতিযোগিতাও সামলাতে হচ্ছে। গত দুই দশকের আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে যে নেতারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন, তাঁদের সঙ্গে ক্ষমতার সময়ে সামনে আসা নতুন সুবিধাভোগীদের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কে আন্দোলনে ছিলেন, কে ছিলেন না, কে এখন হঠাৎ ক্ষমতার কাছাকাছি চলে এসেছেন, কার হাতে স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ যাচ্ছে, এসব নিয়ে দলের ভেতরেই অসন্তোষ তৈরি হওয়ার খবর এসেছে।

ছয় মাসের মূল্যায়নে সাফল্যও আছে, কিন্তু প্রশ্নও আছে

ন্যায্য মূল্যায়নের জন্য বিএনপি সরকারের ঘোষিত কাজগুলোকেও বিবেচনায় নিতে হবে। ছয় মাস পূর্তিতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল পুনঃখনন, খাদ্যশস্যের মজুত বৃদ্ধি এবং গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন উদ্যোগকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে। দ্য ডেইলি স্টারের ছয় মাসের মূল্যায়নেও সামাজিক নিরাপত্তা ও কিছু জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের অগ্রগতির কথা এসেছে।

কিন্তু একই মূল্যায়নে আইনশৃঙ্খলা ও জ্বালানি পরিস্থিতিকে সরকারের দুর্বল জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকেরা। অর্থাৎ সরকারের ছয় মাসের ছবি একরঙা নয়। কোথাও উদ্যোগ আছে, কোথাও অগ্রগতি আছে, আবার কোথাও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এই পার্থক্যটি স্বীকার করাই বাস্তব মূল্যায়নের প্রথম শর্ত।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের ক্ষেত্রে বিএনপির পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যার কথা বলা হয়েছে। রুহুল কবির রিজভী বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে বিশ্লেষকেরা বলেছেন, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রুত ফল দেখানোর চাপও রয়েছে।

সুতরাং ছয় মাসের মাথায় বিএনপিকে ব্যর্থ বা সফল—কোনো একক অভিধায় আটকে দেওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, জনগণের প্রত্যাশা শুধু বড় প্রকল্প বা নতুন কর্মসূচি নিয়ে নয়। তারা দেখতে চায়, রাষ্ট্রের ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান কতটা নিরপেক্ষ থাকছে। প্রশাসন কতটা পেশাদার হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা কতটা নিয়ন্ত্রিত থাকছেন। আর কোনো অনিয়ম বা বিতর্ক দেখা দিলে নেতৃত্ব কত দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে।

কারণ শেষ পর্যন্ত সরকারের ভাবমূর্তি তৈরি হয় বড় বড় ঘোষণার পাশাপাশি ছোট ছোট ঘটনার মধ্য দিয়েই। একটি টিকাকেন্দ্র রাতের আঁধারে গুঁড়িয়ে দেওয়া, পুলিশের উপস্থিতিতে লুটপাটের অভিযোগ ওঠা, একটি স্টুডিওতে হামলা, স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কোন্দল, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় পরিচয়ের ব্যক্তিদের নিয়োগ—প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে হয়তো সীমিত। কিন্তু এগুলো একসঙ্গে মানুষের মনে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহারের একটি ধারণা তৈরি করে।

তাহলে পেছনে কী?

এখানে একট ‘অদৃশ্য শক্তি’র প্রশ্ন আসে। বিএনপির সব বিতর্কের পেছনে কেউ পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে, এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত সামনে নেই। কাজেই এটিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ঠিক হবে না। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে বিভিন্ন বলয়, স্থানীয় স্বার্থ, ব্যক্তিগত আনুগত্য, ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক প্রভাব যে সক্রিয় হতে পারে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার নজির নতুন নয়।

প্রশ্ন হলো, তারেক রহমান এই বলয়গুলোকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন। কারণ একজন প্রধানমন্ত্রী নিজে কোনো হাসপাতাল ভাঙতে যান না, কারও স্টুডিওতে হামলা করেন না, স্থানীয় পর্যায়ে দখলদারির নির্দেশও দেন না। কিন্তু তাঁর দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ এসব করলে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দায় তাঁর সরকারের ওপরই আসে। এই দায় এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো, নিজের দলের লোক বলেই কাউকে ছাড় না দেওয়া।

মিরপুরের ঘটনায় পুলিশের তদন্তে দায়িত্বে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার স্পষ্ট করেছেন, কোনো দল বা মত দেখা হবে না। এই নীতি যদি বাস্তবে প্রয়োগ হয় এবং তদন্তে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কারও সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধেও একই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা।

একইভাবে সালমান মুক্তাদিরের ঘটনায় চাঁদাবাজির অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে ঘটনাটি আসলে জমি দখলের বিরোধ, তাহলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। একটি সরকারের জন্য সত্য গোপন করার চেয়ে সত্য প্রকাশ করা অনেক নিরাপদ। কারণ তদন্তের ফল যত দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সামনে আসবে, রাজনৈতিক অভিযোগের জায়গা তত সংকুচিত হবে।

তারেক রহমানের আসল পরীক্ষা

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ক্ষমতায় ফিরেছে। ফলে তাঁর সামনে সুযোগও বড়, ঝুঁকিও বড়। সরকার যদি প্রশাসনে পেশাদারিত্ব, রাজনৈতিক শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে ছয় মাসের সমস্যাগুলো সংশোধনের পথে চলে যেতে পারে। কিন্তু যদি দলীয় পরিচয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রবেশপত্র হয়ে ওঠে, তাহলে সমস্যা অন্য জায়গায় যাবে।

সেখানে প্রশ্নটি আর কোনো একজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা স্থানীয় নেতাকে নিয়ে থাকবে না। প্রশ্ন উঠবে পুরো শাসনপদ্ধতি নিয়ে।

তারেক রহমান ইতিমধ্যে মন্ত্রী-এমপিদের কাজ নিয়মিত পর্যালোচনা করছেন বলে তাঁর সরকারের পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে। তাহলে এখন সেই পর্যালোচনার পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত আরও কঠিন। শুধু কে কতটি প্রকল্প করেছেন, কে কতবার এলাকায় গেছেন, সেটি নয়; কার কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কার বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ উঠছে, কে দলের সিদ্ধান্ত মানছেন না এবং কোথায় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার বদলে ব্যক্তিগত আনুগত্য গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে।

একই সঙ্গে দল ও সরকারের সম্পর্কটিও নতুনভাবে নির্ধারণ করতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের নেতা হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করার অধিকার এক জিনিস নয়। একজন এমপি তাঁর এলাকায় প্রভাবশালী হতে পারেন, কিন্তু তিনি প্রশাসনের ওপর বেআইনি প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না। একজন দলের নেতা স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় হতে পারেন, কিন্তু জমি দখল বা চাঁদাবাজির অভিযোগে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ঢাল হতে পারে না। এই সীমারেখা যত পরিষ্কার হবে, সরকার তত শক্তিশালী হবে। আর এখানেই প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

এই টিমই কি তারেক রহমানের সেরা টিম?

প্রশ্নটি আসলে শুধু মন্ত্রিসভা নিয়ে নয়। এটি দল, সরকার, প্রশাসন এবং মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব মিলিয়ে পুরো টিমের প্রশ্ন। বিএনপির ভেতরে যোগ্য মানুষ আছেন কি না, সেটি নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক থাকার কথা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সেই যোগ্যতা কি সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথেষ্ট জায়গা পাচ্ছে? রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে পেশাগত যোগ্যতার ভারসাম্য রাখা হচ্ছে কি? বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হলে তা সংশোধনের ব্যবস্থা আছে কি? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নেতৃত্বের কাছে ভুল স্বীকার করার মতো পর্যাপ্ত স্বাধীনতা আছে কি?

ছয় মাসের অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত এটুকু বোঝা যায়, বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু বিরোধীদের মোকাবিলা করা নয়। ক্ষমতার ভেতর তৈরি হওয়া নতুন স্বার্থ ও প্রত্যাশাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দলের পুরোনো কর্মী, নতুন নেতা, মন্ত্রী, এমপি, প্রশাসন, ব্যবসায়ী, স্থানীয় প্রভাবশালী এবং বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠী সবাই এখন ক্ষমতার নতুন কাঠামোর অংশ হতে চাইবে। কে কোথায় থাকবে, কে কতটা প্রভাব পাবে, সেই সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করবে।

সেখানে ভুল বাছাইয়ের মূল্য শুধু একটি পদ বা একটি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কোনো একজন মন্ত্রীর বিতর্ক সরকারের ভাবমূর্তিতে আঘাত করতে পারে। কোনো একজন এমপির আচরণ স্থানীয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কোনো একজন কর্মীর দখল বা চাঁদাবাজির অভিযোগ পুরো দলের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে পারে। আর কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় পরিচয়ের ব্যক্তির নিয়োগ সেই প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সন্দেহ তৈরি করতে পারে।

তাই তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজ সম্ভবত নতুন কোনো স্লোগান দেওয়া নয়; বরং নিজের টিমকে আরও কঠোরভাবে যাচাই করা। কোথায় পরিবর্তন দরকার, কোথায় জবাবদিহি দরকার, কোথায় ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরা দরকার এবং কোথায় যোগ্য মানুষকে আরও বেশি দায়িত্ব দেওয়া দরকার, সেটি নির্ধারণ করা।

বিএনপি সরকারের ছয় মাসকে চূড়ান্ত বিচারের সময় বলা যাবে না। কিন্তু এটি সতর্ক হওয়ার জন্য যথেষ্ট সময়। মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংসের ঘটনায় পুলিশি গাফিলতির প্রশ্ন উঠছে, ইসিবিতে একটি স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় জমি বিরোধ ও চাঁদাবাজির পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সামনে এসেছে, দলীয় নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসনে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তির অভিযোগ এসেছে, মন্ত্রিসভা ছয় মাসেই পুনর্বিন্যাস হয়েছে, তৃণমূলেও দখল, চাঁদাবাজি ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। এগুলোকে একসঙ্গে রেখে এখনই আত্মসমালোচনা করা গেলে সমস্যা সংশোধনের সুযোগ আছে।

নইলে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো একসময় ধারাবাহিকতার চেহারা নিতে পারে। আর তখন প্রশ্নটি শুধু হবে না, এই টিমই কি তারেক রহমানের সেরা টিম? প্রশ্ন উঠবে, এই টিম দিয়ে তিনি যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না।

সেই উত্তর দেওয়ার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বরং ছয় মাসের মাথায় উত্তরটি তৈরি করার সুযোগই সবচেয়ে বেশি। তার জন্য দরকার দলের পরিচয়ের আগে রাষ্ট্রের আইন, ব্যক্তিগত আনুগত্যের আগে যোগ্যতা, ক্ষমতার আগে জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সুবিধার আগে জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া।

কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ কোনো সরকারের বিচার শুধু তার বক্তৃতা দিয়ে করে না। তারা দেখে, রাস্তায় কী হচ্ছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কী হচ্ছে, প্রশাসনে কাকে বসানো হচ্ছে, দলের লোকেরা কী করছে এবং অন্যায় করলে তাদের কী হচ্ছে।

তারেক রহমানের সামনে এখন সেই বাস্তব পরীক্ষাই। বিএনপির সমস্যা যোগ্য মানুষের অভাব কি না, সেই প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—যাদের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তাঁরা সেই ক্ষমতার মর্যাদা রাখতে পারছেন কি না। আর যদি না পারেন, তাহলে তাঁদের জায়গায় কাকে আনা হবে, সেটিই এখন নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত।