হাসিনাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে ফের বসাতে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর কী আলাপ ও পরিকল্পনা করছেন, তা পরে বলছি। এর আগে শ্রদ্ধেয় 'সিনিয়র সাংবাদিক' নবনীতা চৌধুরীর একটি নিউজ নিয়ে দুই কথা বলি। তাঁর বিশ্লেষণে দেখবেন, এর প্রথম কয়েকটি বাক্যে দাঁড়ি-কমা থাকে না। থাকে প্রশ্নবোধক ও বিস্ময়সূচক চিহ্ন। যেমন, এখানে বলা হয়েছে, হাসিনার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে উঠছে! ভারতে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কী আলাপ? শেখ হাসিনার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে উঠছে কোন প্রেক্ষাপটে?

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে উঠছে, এমন দাবি করার পেছনে কী তথ্য, কী ঘটনা কিংবা কী ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা রয়েছে? কোন দেশ, কোন রাজনৈতিক পক্ষ কিংবা আন্তর্জাতিক মহলের কারা সেই জনমত গড়ে তুলছে? নাকি কোনো একটি বৈঠক, সফর কিংবা কূটনৈতিক যোগাযোগকে কেন্দ্র করে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হচ্ছে, যার পক্ষে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য সামনে আসেনি?

সাংবাদিকতার এই 'ছোটলোকি' ট্রিকস একটা ভারতীয় সিনেমা দেখে শিখেছিলাম। ধরুন, আমি বললাম, ‘বান্দরে বাঘেরে থাপড়াইছে।’ দাঁড়ি দিয়েছি। মানে, ঘটনা ঘটেছে। এখানে আমি সরাসরি একটি ঘটনার দাবি করছি। পাঠককে জানিয়ে দিচ্ছি, বান্দর বাঘকে থাপড়েছে। এখন পাঠকের কাছে বিষয়টি একটি ঘটনার বিবরণ।

কিন্তু বললাম, ‘বান্দরে বাঘেরে থাপড়াইছে?’ একটা চিহ্ন বদলের মাধ্যমে পুরো আলাপ বদলে গেছে। এখন পাঠকের ঘাড়ে দিয়ে দিলাম, পুরো ঘটনা পড়ে সত্য উদ্ঘাটনের দায়িত্ব। আমি আর সরাসরি বলছি না, ঘটনা ঘটেছে। বরং প্রশ্নের আড়ালে ঘটনাটি ঘটেছে কি না, সেই সন্দেহটাও পাঠকের মাথায় ঢুকিয়ে দিলাম।

এই যে প্রশ্নবোধক চিহ্ন, এর ক্ষমতা কিন্তু কম নয়। একটি বাক্যের শেষে দাঁড়ি থাকলে সেটি একটি দাবি হিসেবে পাঠকের সামনে হাজির হয়। আর প্রশ্নবোধক চিহ্ন থাকলে সেটি প্রশ্ন হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্নের ভেতরে যদি কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা থাকে, তাহলে পাঠক অনেক সময় প্রশ্নটিকে সত্যের অনুসন্ধান না ভেবে সত্যের ইঙ্গিত হিসেবে গ্রহণ করেন।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন তোলা অবশ্যই সাংবাদিকতার অংশ। কিন্তু প্রশ্নের আড়ালে কোনো ঘটনা প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া, কিংবা এমন একটি ধারণা তৈরি করা যে ঘটনা ঘটেছে বলেই এখন তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন, সেটি আলাদা বিষয়।

একটি প্রশ্নের মধ্যে অনেক সময় এমন অনুমান লুকিয়ে থাকে, যা পাঠককে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায়। যেমন, হাসিনার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে উঠছে! এই বাক্যটি যদি প্রশ্নবোধক বা বিস্ময়সূচক চিহ্ন দিয়ে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে পাঠকের মনে প্রথমেই একটি ধারণা তৈরি হতে পারে যে, হাসিনার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত সত্যিই গড়ে উঠছে। এরপর তিনি জানতে চাইবেন, কোথায় গড়ে উঠছে, কারা গড়ে তুলছে, কীভাবে গড়ে উঠছে?

অথচ শুরুতেই প্রশ্ন করা দরকার, আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে উঠছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তার ভিত্তি কী?

এবার আসি মার্কো রুবিওর ভারত সফরে। মার্কো রুবিওর ভারত সফর দেশটিতে সমালোচিত হচ্ছে। কারণ, ট্রাম্পের খাস আদমি মার্কো রুবিও ওয়াশিংটন থেকে দিল্লি যাননি। ল্যান্ড করেছেন মুম্বাইয়ে। উঠেছেন তাজ প্যালেস হোটেলে। সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন জয়শঙ্কর।

ভারতের বিরোধী দলগুলো প্রশ্ন তুলেছে, একজন সফরকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী কীভাবে স্বাগতিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ডেকে পাঠান? কারণ, কূটনৈতিক রীতি-রেওয়াজ হচ্ছে, সফরকারী মন্ত্রী দেখা করবেন স্বাগতিক দেশের মন্ত্রীর সঙ্গে।

এখানে বিষয়টি শুধু কোথায় বিমান অবতরণ করেছে কিংবা কোন হোটেলে উঠেছেন, তা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, একজন বিদেশি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের ক্ষেত্রে স্বাগতিক দেশের কূটনৈতিক মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিকতার জায়গাটি কোথায়? আর সফরের কর্মসূচিতে এমন ব্যতিক্রম থাকলে, তার ব্যাখ্যা কী?

ধরুন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর ঢাকায় না এসে চট্টগ্রামে ল্যান্ড করে হোটেল রেডিসনে উঠলেন। সেখানে গিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান তাঁর সঙ্গে দেখা করলেন। তাহলে ব্যাপারটা কেমন হতো?

ভারতের বিরোধী দলগুলো যে প্রশ্ন তুলছে, সেটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কল্পনা করলে বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়। একজন সফরকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী যদি বাংলাদেশের রাজধানীতে না গিয়ে অন্য কোনো শহরে অবস্থান করেন এবং সেখানে স্বাগতিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হয়, তাহলে সেই সফরের কূটনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

ভারতে যা ঘটেছে, ব্যাপারটা ঠিক তেমনই। রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা মোদি সরকারকে তাই আমেরিকার পুতুল বলছেন। তাঁদের অভিযোগ, আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে ভারতের কূটনৈতিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। একজন বিদেশি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য স্বাগতিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অন্য শহরে যেতে হয়েছে, অথচ সফরকারী মন্ত্রী দিল্লিতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেননি। এই পরিস্থিতিকে তাঁরা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাতে বলেছেন, ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো দিল্লি না এসে সিমলায় ল্যান্ড করেছিলেন। সেখানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু এই ব্যাখ্যা টিকছে না। কারণ, সিমলার ঘটনাটি ছিল দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠান। দুই দেশই ওই স্থানটি নির্বাচন করেছিল।

অর্থাৎ, সিমলায় ভুট্টোর যাওয়া এবং ইন্দিরা গান্ধীর সেখানে গিয়ে দেখা করার পেছনে একটি নির্দিষ্ট কূটনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। দুই দেশের মধ্যে আলোচনার বিষয়, চুক্তির প্রেক্ষাপট এবং সাক্ষাতের স্থান নির্ধারণ ছিল পারস্পরিক সিদ্ধান্তের অংশ।

কিন্তু রুবিওর ভারত সফরের ক্ষেত্রে সেই ধরনের কোনো চুক্তি বা দ্বিপক্ষীয় আয়োজনের কথা সামনে আসেনি। ফলে সিমলার উদাহরণ দিয়ে মুম্বাইয়ে জয়শঙ্করের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাখ্যা দেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

একটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর আর দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য নির্ধারিত বিশেষ আয়োজন এক বিষয় নয়। কূটনৈতিক সফরে কোথায় বৈঠক হবে, কে কার সঙ্গে দেখা করবেন, কীভাবে কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে, এসব বিষয় সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ঠিক হয়।

তাই ১৯৭৪ সালের সিমলা বৈঠকের উদাহরণ দিয়ে বর্তমান সফরের ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে হলে দুই ঘটনার উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপটের মিল দেখাতে হবে। শুধু একজন বিদেশি নেতা দিল্লির বাইরে গিয়ে সাক্ষাৎ করেছিলেন, এই যুক্তি দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না।

রুবিওর সফরে চুক্তি-টুক্তি নেই। আর ট্রাম্পের আরেক খাস লোক সার্জিও গর, যিনি ভারতে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত, তাঁর অফিস আগেই যে ভাষায় জানায়, তার সরল অর্থ হচ্ছে, হ্যাঁ, আমরা জয়শঙ্করকে ডেকে পাঠিয়েছি।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সফরকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের আনুষ্ঠানিকতা নির্ধারণে স্বাগতিক দেশের ভূমিকা কোথায়? আর যদি সফরের সূচি ও সাক্ষাতের স্থান এমনভাবে নির্ধারিত হয়, যাতে স্বাগতিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সফরকারীর কাছে যেতে হয়, তাহলে সেটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?

আরও আজব হলো, রুবিও মুম্বাই থেকে ওয়াশিংটন চলে গেছেন। দিল্লিতে গিয়ে মোদির সঙ্গে দেখা করেননি। অতীতে কোনো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমনটা করেননি।

ভারতের বিরোধী দলগুলোর কাছে এই বিষয়টিই আরও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। কারণ, আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফরে এসেছেন, অথচ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়নি। দিল্লিতে গিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বদলে তাঁর সফরের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হয়েছে মুম্বাইয়ে।

তাহলে এই সফরের উদ্দেশ্য কী ছিল? ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল? কূটনৈতিক আলোচনা, নাকি বাণিজ্য ও জ্বালানি স্বার্থ?

এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। কোনো বিদেশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফরে এসে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা না করলেই যে সফরটি ব্যর্থ কিংবা অস্বাভাবিক হয়ে যায়, এমন নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক হয়। সব সফরেই রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ বাধ্যতামূলক নয়।

কিন্তু সফরের কর্মসূচি, সাক্ষাতের স্থান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যখন একসঙ্গে সামনে আসে, তখন সফরের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে সফরকারী মন্ত্রীর সঙ্গে যদি এমন একজন ব্যবসায়ীর সাক্ষাৎ হয়, যার ব্যবসা সংশ্লিষ্ট দেশের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তাহলে সেই সাক্ষাতের গুরুত্বও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

তাহলে রুবিও কি হাসিনার বিষয়ে কথা বলতে এসেছিলেন? না গো ভাই। উনি এসেছিলেন মুকেশ আম্বানির সঙ্গে দেখা করতে। দুইজন মিলে গিয়েছেন গুজরাটের জামনগরে। যেখানে আম্বানির তেল শোধনাগার রয়েছে। এই রিফাইনারি দুনিয়ার সবচেয়ে বড়। এখানে ভেনেজুয়েলার ক্রুড ওয়েল রিফাইন করে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন উৎপাদন করা যায়।

এবার একটু তেলের হিসাব বুঝি।

গত জানুয়ারিতে মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ভেনেজুয়েলার তেলখনির নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার হাতে। কিন্তু এই খনির ক্রুড দুনিয়ার সবচেয়ে খচ্চর। রিফাইন করা সবচেয়ে কঠিন ও ব্যয়বহুল।

আমেরিকার যেহেতু দেশটির সঙ্গে কয়েক দশকের শত্রুতা, তাই তারা ভেনেজুয়েলার ক্রুড রিফাইন করার প্রযুক্তি তৈরি করেনি।

ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল সাধারণত ভারী ও উচ্চ সালফারযুক্ত। এই ধরনের তেল পরিশোধন করতে বিশেষ ধরনের প্রযুক্তি ও অবকাঠামো প্রয়োজন। সব তেল শোধনাগারে এই ধরনের ক্রুড প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব নয়। ফলে তেল উৎপাদন করলেই সেটিকে সরাসরি বাজারে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করা যায় না।

আমেরিকার শোধনাগারগুলো বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য তৈরি। কিন্তু ভেনেজুয়েলার ভারী ক্রুডের ক্ষেত্রে বিশেষ সক্ষমতা প্রয়োজন। সেই সক্ষমতা তৈরি করতে সময়, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি দরকার।

টেক্সাসে ভবিষ্যতে করবে। যেখানে আম্বানি ৩০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে ডিজেলের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় আমেরিকার তো এখনই তেল দরকার।

এখানে আমেরিকার জ্বালানি চাহিদার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে টেক্সাসে নতুন শোধনাগার কিংবা বিদ্যমান অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা থাকলেও, তাতে এখনকার জ্বালানি সংকটের সমাধান হবে না। বর্তমান চাহিদা মেটাতে হলে এমন একটি ব্যবস্থা দরকার, যেখানে দ্রুত ভারী ক্রুড পরিশোধন করে ডিজেলসহ প্রয়োজনীয় জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব।

আম্বানি যেহেতু আগে থেকেই ভেনেজুয়েলার ক্রুড রিফাইন করেন, তাই রুবিও এসেছিলেন যাতে দ্রুত ডিজেল পাওয়া যায়।

আমেরিকা চায়, আম্বানি আরও বেশি বেশি ভেনেজুয়েলার ক্রুড আমদানি করুক। সস্তায় এই ক্রুড আম্বানিকে পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে আমেরিকা।

তারপর সেটা থেকে ডিজেল উৎপাদন করে ভারতের বাজারে নয়, আম্বানি আমেরিকায় রপ্তানি করবেন। যাতে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম কমে।

অর্থাৎ, এখানে আলোচনার মূল বিষয় যদি জ্বালানি হয়, তাহলে মুম্বাইয়ে রুবিওর অবস্থান, আম্বানির সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং জামনগরের শোধনাগারে যাওয়ার মধ্যে একটি অর্থনৈতিক যোগসূত্র তৈরি হয়।

আমেরিকার জন্য ভেনেজুয়েলার ভারী ক্রুড দ্রুত পরিশোধন করে ডিজেল উৎপাদন করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আর আম্বানির শোধনাগার সেই ধরনের ক্রুড প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রাখে।

কিন্তু এই পুরো বিষয়টি বুঝতে হলে কূটনৈতিক সফরের আনুষ্ঠানিকতা, জ্বালানি বাজারের বাস্তবতা এবং আমেরিকার সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেখতে হবে।

শুধু কোনো একজন মন্ত্রীর সফর কিংবা একটি বৈঠক দেখেই তার উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা যায় না। আবার সফরের দৃশ্যমান কর্মসূচি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলেও অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়।

তবে কোনো একটি বৈঠকের সঙ্গে রাজনৈতিক ঘটনাকে যুক্ত করার আগে দেখতে হবে, সেই বৈঠকে আসলে কী আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কী বলেছেন, কোনো চুক্তি বা সমঝোতা হয়েছে কি না, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনার বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে কি না।

এবার আসি হাসিনার প্রসঙ্গে।

দুনিয়ার সবাই ডিজেল-গ্যাসের জন্য ইয়া নফসি, ইয়া নফসি করছি। আর বলদেরা কারও মিটিং হলেই মনে করে, শেখ হাসিনাকে ফেরানোর জন্য আলাপ চলছে।

কূটনৈতিক বৈঠক মানেই কোনো রাজনৈতিক নেতাকে ক্ষমতায় ফেরানোর পরিকল্পনা, এমন ধারণা করার আগে বৈঠকের বিষয়বস্তু, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং সফরের বাস্তব উদ্দেশ্য বুঝতে হবে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একাধিক দেশের স্বার্থ জড়িত থাকে। সেখানে জ্বালানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের মতো নানা বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।

কিন্তু কোনো বৈঠকের খবর সামনে এলেই সেটিকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে ফেরানোর পরিকল্পনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা, আর সেই ব্যাখ্যার পক্ষে প্রশ্নবোধক ও বিস্ময়সূচক বাক্য সাজিয়ে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরির দাবি করা, দুইটি আলাদা বিষয়।

একটি বৈঠক হয়েছে, তাই সেখানে হাসিনাকে ফেরানোর আলোচনা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন। আর সেই তথ্য ছাড়া বৈঠকের সঙ্গে হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে যুক্ত করে দেওয়া মানে অনুমানকে খবরের মতো উপস্থাপন করা।

এখানেই শুরু হয় রাজনৈতিক গুজবের বাজার। কোনো একজন বিদেশি মন্ত্রী সফরে এলেন, কোনো ব্যবসায়ীর সঙ্গে বৈঠক করলেন, কিংবা দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ হলো। এরপর সেই ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হলো নানা ব্যাখ্যা। কেউ বললেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কেউ বললেন, হাসিনাকে ফেরানোর পরিকল্পনা চলছে। কেউ আবার সেই ধারণাকে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরির প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করলেন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব বক্তব্যের পক্ষে তথ্য কোথায়?

কোনো বৈঠকে শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ এসেছে কি না, সেটি জানা দরকার। আর যদি প্রসঙ্গ এসে থাকে, তাহলে কী আলোচনা হয়েছে, কারা সেই আলোচনায় ছিলেন, কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য আছে কি না, সেটিও জানা দরকার।

এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু সফর, বৈঠক কিংবা কূটনৈতিক যোগাযোগের খবর থেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলে সেটি বিশ্লেষণ নয়, অনুমান।

দুনিয়ার সবাই ডিজেল-গ্যাসের জন্য ইয়া নফসি, ইয়া নফসি করছি। আর বলদেরা কারও মিটিং হলেই মনে করে, শেখ হাসিনাকে ফেরানোর জন্য আলাপ চলছে।

এই জন্য আমাদের গ্রামে বলে, জাহাজ দেখলে ভাবে, তার জন্য ওইটা ভরে আসতেছে।