বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যখন গভীর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে ঢাকায় নিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর নজিরবিহীন তৎপরতা নতুন এক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। কূটনৈতিক শিষ্টাচারের প্রচলিত ছক ভেঙে তিনি যেভাবে দিনরাত দৌড়ঝাঁপ করছেন, তা কেবল একজন সাধারণ রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভারতীয় মন্ত্রিসভার ক্যাবিনেট মন্ত্রীর সমমর্যাদাসম্পন্ন এই কূটনীতিকের ক্ষিপ্র ও কৌশলগত তৎপরতা দিল্লির জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ ও কৌশলের একটি তাৎপর্যপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ বলে প্রতীয়মান হয়।
পটভূমির দিকে তাকালে দেখা যায়, কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে গড়ে তোলা রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভারতের পছন্দের সরকারের বিদায়ের পর দিল্লি এক নজিরবিহীন আঞ্চলিক সংকটের মুখে পড়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ আগের মতো কোনো একক প্রতিবেশী শক্তির প্রভাববলয়ে আবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক ও জনমিতিক এই নাটকীয় পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ‘সেভেন সিস্টার্স’খ্যাত রাজ্যগুলোর স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ যদি দিল্লির স্বার্থের বিপরীতে যায়, তবে সেভেন সিস্টার্সের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে ঢাকায় কোনো গতানুগতিক ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাটকে না পাঠিয়ে একজন অভিজ্ঞ ও দলবদলের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার মূল স্রোতে টিকে থাকা রাজনীতিবিদকে দায়িত্ব দেওয়া দিল্লির হিসাব-নিকাশের অংশ বলে মনে হতে পারে।
দীনেশ ত্রিবেদীর রাজনৈতিক পথপরিক্রমা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, তিনি প্রচলিত অর্থে সাধারণ কূটনীতিকদের মতো নন। করাচিতে জন্ম নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে ভারতে বসতি গড়া ত্রিবেদী কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং শেষ পর্যন্ত বিজেপির রাজনীতির মধ্য দিয়ে ক্ষমতার মূল স্রোতে টিকে থেকেছেন। ভারতের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা এই নেতার অন্যতম শক্তি তাঁর ভাষাগত দক্ষতা ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতা। সাবলীলভাবে বাংলা বলতে পারা এবং এ অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব বোঝার সামর্থ্য তাঁকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। তবে তাঁর দায়িত্ব ও কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। প্রচলিত কূটনৈতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রদূতেরা নিজ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কাজ করলেও, ত্রিবেদীর ক্ষেত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কার্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে অনেকাংশে পাশ কাটিয়ে তিনি সরাসরি মোদির সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং বিশেষ দায়িত্বের অগ্রগতি সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করছেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
অভিযোগ ও বাস্তবতার নিরিখে ত্রিবেদীর বিশেষ দায়িত্বের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া। সেভেন সিস্টার্সকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমানো এবং ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের প্রশাসনিক ও সামরিক পর্যায়ে তৈরি হওয়া অস্বস্তি দূর করতে শীর্ষ পর্যায়ের একটি বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখছে দিল্লি। ত্রিবেদী বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে অন্তত ২৮ জন মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। এসব বৈঠকে তিনি প্রস্তাবিত সফরের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর হলো, দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্ব তারেক রহমানের জন্য অপেক্ষা করছে এবং দুই দেশের শীর্ষ নেতার মুখোমুখি বৈঠকে জটিল সংকটগুলোর সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
তবে ত্রিবেদীর এই অতিসক্রিয়তা কেবল প্রস্তাবিত শীর্ষ বৈঠকের আমন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি বাংলাদেশের আমলা ও বিচারকদের প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে পাঠানোর কার্যক্রম পুনরায় চালু করার প্রস্তাব দিয়েছেন, যৌথ সামরিক মহড়া ও সফর বিনিময়ে জোর দিয়েছেন এবং বাংলাদেশ-ভারত সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ গঠনের তাগিদ দিয়েছেন। বন্ধ থাকা ভারতীয় অর্থায়নের প্রকল্পগুলো সচল করা এবং শক্তি ও জ্বালানি খাতের করিডোরগুলো সুরক্ষিত রাখার বিষয়েও তিনি নিয়মিত আলোচনা ও দরকষাকষি করছেন বলে জানা গেছে। অথচ বাংলাদেশের মৌলিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হলে সেগুলোর সন্তোষজনক সমাধানের বিষয়ে তাঁর অবস্থান কতটা স্পষ্ট, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
ঢাকা থেকে সরাসরি মোদির কাছে গিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার ধরনটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ত্রিবেদী অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার দিল্লি সফর করছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। গত আগস্টে ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পরপরই তিনি দিল্লিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বিস্তারিত বৈঠক করেন বলে জানা গেছে। পরবর্তী সময়ে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এবং অক্টোবরের শুরুতেও তিনি দিল্লি সফর করেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। এসব উচ্চপর্যায়ের বৈঠক কূটনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জনের জন্ম দিয়েছে। মোদির পাশাপাশি তিনি ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরাজ শেঠ এবং দেশটির শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। একজন হাইকমিশনারের সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা পর্যায়ের শীর্ষ ব্যক্তিদের ধারাবাহিক যোগাযোগের বিষয়টি সত্য হলে তা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। এ থেকে প্রশ্ন উঠতে পারে, দিল্লি ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে কেবল সাধারণ পররাষ্ট্রনীতি ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে, নাকি এর সঙ্গে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলগত উদ্বেগও গভীরভাবে জড়িত।
ত্রিবেদীর ঢাকায় সক্রিয়তার পাশাপাশি একাধিক গোপন ও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের খবরও আলোচনায় এসেছে। কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হচ্ছে, ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর শীর্ষ কর্মকর্তারা আগাম প্রকাশ্য ঘোষণা ছাড়াই ঢাকায় এসে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোর শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ ছাড়া ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং দিল্লির প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক ও প্রবীণ সাংবাদিক এম জে আকবরের সম্ভাব্য ঝটিকা সফর নিয়েও গুঞ্জন রয়েছে। এসব তথ্যের সত্যতা ও ব্যাপ্তি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে এ ধরনের যোগাযোগ ও তৎপরতার খবরকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের ওপর ভারতের রাজনৈতিক প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি বৃহত্তর কৌশল কাজ করছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে আসে। এ ধরনের কৌশলকে অনেকে ছায়া কূটনীতি হিসেবেও ব্যাখ্যা করতে পারেন।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ত্রিবেদীকে যেসব উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলোর প্রতি ভারতের প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করলে দুই দেশের সম্পর্কের জটিলতা আরও স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশ সফরের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির ওপর ঢাকা গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের মুখোমুখি করা, শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের হস্তান্তর, গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির ন্যায্য নবায়ন এবং ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থান করে আওয়ামী লীগের নেতাদের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগের অবসান ঘটানোর মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টারা এসব বিষয়ে একাধিকবার ভারতকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের বক্তব্যের মূল কথা, এসব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট না হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুণগত উন্নয়ন কঠিন হবে।
কিন্তু এসব মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হলে দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে সন্তোষজনক সমাধানের স্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যায়নি বলে সমালোচনা রয়েছে। ঢাকায় আয়োজিত বিভিন্ন সম্মেলন ও গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শেখ হাসিনার বিষয়ে তিনি কৌশলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে সমালোচকেরা মনে করেন। তিনি প্রকাশ্যে যুক্তি দিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে ভারতীয় সামরিক বা বিমানবাহিনী বাংলাদেশ থেকে তুলে নিয়ে যায়নি; বরং বাংলাদেশের তৎকালীন সংকটময় পরিস্থিতিতে তাঁকে বহনকারী সামরিক বিমান ভারতে অবতরণ করেছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই প্রতিবেশীসুলভ মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে শেখ হাসিনার অবস্থান নিয়ে তিনি আইনি কাঠামোর কথা তুলে ধরেছেন এবং আদালতের প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
ত্রিবেদীর বক্তব্য ও কূটনৈতিক আচরণের অন্তর্নিহিত বার্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ভারত কি তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বলয় থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যেতে প্রস্তুত? নাকি একদিকে ওই বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে অন্যদিকে ঢাকার নতুন সরকারের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে দিল্লি? ভারতের আশ্রয়ে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে বাংলাদেশে যে উদ্বেগ রয়েছে, তারও সমাধান প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঢাকার সঙ্গে একটি কার্যকর ‘ওয়ার্কিং রিলেশনশিপ’ গড়ে তোলার আগ্রহ ভারতের বিভিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতায় প্রকাশ পাচ্ছে বলে মনে হয়। অর্থাৎ, পুরোনো রাজনৈতিক সম্পর্কের অবশিষ্ট প্রভাব ধরে রাখা এবং নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জনের চেষ্টা চলছে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এটাই হতে পারে ত্রিবেদীর ওপর অর্পিত বিশেষ দায়িত্বের অন্যতম তাৎপর্য।
তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে দিল্লির এই দ্বিমুখী লক্ষ্য বাস্তবায়ন সহজ হবে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও তরুণ প্রজন্মের চিন্তাধারায় বড় পরিবর্তন এসেছে। গত সতেরো বছরে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত হত্যা, অসম পানি বণ্টন এবং বাক্স্বাধীনতার সংকোচন নিয়ে ভারতের ভূমিকা সম্পর্কে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও ছাত্র-জনতার মধ্যে গভীর অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে দিল্লির নীতির সমালোচনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এক তরুণ শিক্ষার্থীর সরাসরি প্রশ্নের মুখে ত্রিবেদী যেভাবে হাস্যরসের আশ্রয় নিয়ে মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে গেছেন বলে সমালোচনা হয়েছে, তা দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে থাকা ক্ষোভ ও সংশয়ের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
ভারতের নীতিতে এক ধরনের পরস্পরবিরোধী অবস্থানও লক্ষ করা যায়। একদিকে দেশটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে বাণিজ্যিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ও করিডোর সুবিধা বজায় রাখতেও আগ্রহী। কিন্তু একই সঙ্গে ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থান করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া এবং বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কা দূর করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে তুলছে। ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাভাষী মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ, বাবরি মসজিদসহ ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে বিতর্ক এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ, সব মিলিয়ে পারস্পরিক আস্থার সংকট আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশ সব সময়ই সমমর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে সুস্থ ও প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। কিন্তু দিল্লি যদি মনে করে, অতীতে যেভাবে রাজনৈতিক মিত্র ও অনুগত গোষ্ঠীর মাধ্যমে একটি দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হয়েছিল, চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশেও একই কৌশল কার্যকর হবে, তবে তা হবে বড় ধরনের কূটনৈতিক ভুল। দীনেশ ত্রিবেদীকে দেওয়া নরেন্দ্র মোদির বিশেষ দায়িত্বের বিষয়টি যদি সত্যিই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং ভারতের কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষার উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, তবে সেটিকে কেবল একজন হাইকমিশনারের ব্যক্তিগত তৎপরতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে ভারতের আঞ্চলিক কৌশল, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ক রয়েছে।
অতীতের বিরোধ ও অবিশ্বাস দূর করে বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে সম্মান না জানালে কেবল কূটনৈতিক তৎপরতা দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন ‘সোনালি অধ্যায়’ রচনা সম্ভব নয়। বাংলাদেশকে সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, তার ন্যায্য উদ্বেগের জবাব দিতে হবে এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। অতীতের রাজনৈতিক সমীকরণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে দিল্লিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। পোস্ট-হাসিনা যুগে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে ভারতের পুরোনো নীতি ও কৌশল পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। অন্যথায়, দীনেশ ত্রিবেদীর দৌড়ঝাঁপ সাময়িক কূটনৈতিক তৎপরতা হিসেবেই থেকে যাবে; দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট কাটানোর স্থায়ী সমাধান হয়ে উঠবে না।