মেঘের রাজ্য আর শান্ত প্রকৃতির অনন্য আধার রাঙামাটির সাজেক। যে জনপদে পাহাড় আর আকাশের মিতালী দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসতেন পর্যটকেরা, সেই অপরূপ ভূমি এখন অস্থিরতা ও উদ্বেগের কালো মেঘে আচ্ছন্ন। সৌন্দর্যের এই স্নিগ্ধ জনপদ আজ ক্ষমতা প্রদর্শন, আধিপত্য বিস্তার ও গোপন স্বার্থসিদ্ধির এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ জমে, আবার ভেসেও যায়। কিন্তু সাজেকের আকাশ থেকে নিরাপত্তাহীনতার ঘোর কুয়াশা কাটছে না। দিনের পর দিন জমে থাকা রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি, ভূমির মালিকানার বিরোধকে পুঁজি করে চাঁদাবাজি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত সাজেককে ঠেলে দিচ্ছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারের নোংরা প্রতিযোগিতা। এর সঙ্গে ভারতের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও সামরিক মদদ পাওয়ার অভিযোগ এবং পার্বত্য অঞ্চলকে অস্থিতিশীল রাখার ভূরাজনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে তা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হবে গভীর উদ্বেগের বিষয়।

সম্প্রতি সাজেকের গঙ্গারাম এলাকার উজোবাজারে ঘটে যাওয়া গুলিবর্ষণের ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা নাজুক। অভিযোগ উঠেছে, পর্যটকবাহী যানবাহন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইউপিডিএফের সশস্ত্র ক্যাডাররা অতর্কিত গুলি চালায়। সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির দিকে ফেরার পথে প্রায় তিন হাজার পর্যটক সড়কে আটকা পড়েন বলে সংশ্লিষ্ট বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। পর্যটকদের জীবন যখন চরম ঝুঁকির মুখে, তখন সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। সেনাসদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পর্যটকদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেন এবং খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দিতে সহায়তা করেন। উদ্ধার অভিযান চলাকালে সশস্ত্র হামলাকারীরা নিরাপত্তারক্ষীদের লক্ষ্য করে ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। আত্মরক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাসদস্যরা পাল্টা গুলি চালালে হামলাকারীরা পাহাড়ি জঙ্গলে পালিয়ে যায় বলে ঘটনার বিবরণে দাবি করা হয়েছে।

ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হয়ে থাকলে তা-ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু কোনো সংগঠনের বক্তব্যই তদন্তের বিকল্প হতে পারে না। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, কী উদ্দেশ্যে গুলি চালানো হয়েছে এবং সশস্ত্র হামলাকারীদের কাছে অস্ত্র কোথা থেকে এসেছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তে বের করে আনতে হবে। পর্যটক ও নিরাপত্তারক্ষীদের জীবন বিপন্ন করার মতো ঘটনা কোনোভাবেই রাজনৈতিক বিরোধের অজুহাতে আড়াল করা যায় না। পাহাড়ে অস্ত্রের ভাষায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার যে প্রবণতা গড়ে উঠেছে, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে দৃঢ় অবস্থান নিতেই হবে।

এই সংকটের নেপথ্যে রয়েছে আরও গভীর ভূরাজনৈতিক সমীকরণ। লেখকের উত্থাপিত অভিযোগ অনুযায়ী, পাহাড়ে সক্রিয় ইউপিডিএফের সশস্ত্র ক্যাডারদের একটি অংশকে সীমান্তের ওপার থেকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সাজেক ও তৎসংলগ্ন পার্বত্য এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে ইউপিডিএফের প্রায় পাঁচ শতাধিক সশস্ত্র সদস্যকে ভারতে বিশেষ সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই দাবি সত্য হলে তা নিছক কোনো আঞ্চলিক সংগঠনের তৎপরতার বিষয় থাকবে না; বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব সশস্ত্র সদস্যের তৎপরতার লক্ষ্য বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বজায় রাখা, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা এবং পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্থায়ী আতঙ্ক সৃষ্টি করা। ভারতের কোনো মহল থেকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র কিংবা অন্য কোনো সামরিক সহায়তা দেওয়া হয়ে থাকলে তার উদ্দেশ্য ও পরিণতি নিয়ে কঠোরভাবে প্রশ্ন তোলা জরুরি। পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা বা রাষ্ট্রকে দুর্বল করার কোনো বিদেশি তৎপরতা থাকলে তা প্রতিহত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের পক্ষে গোয়েন্দা তথ্য, প্রত্যক্ষ প্রমাণ ও স্বাধীন সূত্রের ভিত্তিতে সত্যতা প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে যেমন কোনো ছাড় দেওয়া যায় না, তেমনি প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তাও উপেক্ষা করা যায় না।

পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে খুন, অপহরণ, নির্যাতন ও চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ড্যানিডার কর্মকর্তাদের অপহরণের ঘটনা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিংবা সাধারণ পাহাড়ি কৃষককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে কোন ব্যক্তি বা সংগঠন জড়িত, তা সুনির্দিষ্টভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: পাহাড়ের সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, অপহরণ কিংবা সশস্ত্র তৎপরতার মাধ্যমে জিম্মি করে রাখার কোনো অধিকার কোনো সংগঠনের নেই। বিদেশি মদদে পরিচালিত হোক কিংবা স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই থেকে জন্ম নিক, সশস্ত্র অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে।

পাহাড়ের সংঘাতের ইতিহাসের দিকে তাকালে বিভাজন ও রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বের দীর্ঘ চিত্র সামনে আসে। ১৯৭২ সালে জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে সংগঠনটির সশস্ত্র সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে জেএসএসের নেতৃত্বে সন্তু লারমার পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু চুক্তিকে অপূর্ণাঙ্গ ও জুম্ম স্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে ১৯৯৮ সালে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে গঠিত হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এরপর থেকে জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। দুই পক্ষের সংঘাতের কারণে প্রায় চার শতাধিক মানুষের প্রাণহানির যে হিসাব উল্লেখ করা হয়, তার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও উৎস যাচাই করা প্রয়োজন। তবে পাহাড়ে সশস্ত্র দ্বন্দ্ব যে বহু মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার পাহাড়ের সাধারণ মানুষ। জুমচাষি, নৌকার মাঝি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা কিংবা সিএনজিচালক—কেউই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতার বাইরে নন। বিভিন্ন এলাকায় নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা আদায়, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অর্থ দিতে অস্বীকার করলে শাস্তি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শত শত কোটি টাকার চাঁদাবাজির যে অভিযোগ সামনে আসে, তা তদন্ত করে অর্থের উৎস, আদায়কারী এবং ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করা প্রয়োজন। অবৈধভাবে আদায় করা অর্থ যদি অস্ত্র কেনা, সশস্ত্র ক্যাডার নিয়োগ কিংবা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর কাজে ব্যবহৃত হয়, তবে সেই অর্থের প্রবাহ বন্ধ করাই হতে হবে রাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার। পাহাড়ের মানুষকে জিম্মি করে কোনো সংগঠন নিজেদের সমান্তরাল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে, এমন পরিস্থিতি মেনে নেওয়া যায় না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে পার্বত্য অঞ্চল থেকে একাধিক অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। লেখকের উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে এ পর্যন্ত ২০০টিরও বেশি অস্থায়ী সেনাক্যাম্প সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ২০০৯ সালে এক সিদ্ধান্তে এক ব্রিগেড সেনা ও ৩৫টি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্প প্রত্যাহারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সংখ্যা ও সময়কাল সরকারি নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে নিরাপত্তাব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ক্যাম্প প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব খতিয়ে দেখা জরুরি।

অভিযোগ রয়েছে, দুর্গম সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে নিরাপত্তা স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার ফলে কোথাও কোথাও রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি দুর্বল হয়েছে এবং সেই শূন্যতার সুযোগে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের প্রভাব বাড়িয়েছে। সাজেক, বাঘাইছড়ি, পানছড়ি ও দীঘিনালার মতো স্পর্শকাতর এলাকায় সশস্ত্র তৎপরতা, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা দুর্বল হলে অবৈধ অস্ত্রের চলাচল ও বহিরাগত সহায়তা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তগুলো শুধু প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সেগুলোর প্রভাব কী ছিল, তা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

তবে সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারই পাহাড়ের সব অস্থিরতার একমাত্র কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সীমান্ত নজরদারি, গোয়েন্দা সক্ষমতা, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকারিতা, রাজনৈতিক বিরোধ এবং শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি—সবকিছুর সম্মিলিত মূল্যায়ন দরকার। কিন্তু কোনো নীতির ফলে যদি বাস্তবেই নিরাপত্তার ঘাটতি তৈরি হয়ে থাকে, তবে রাজনৈতিক অজুহাতে সেই ভুল সংশোধন থেকে বিরত থাকার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

বর্তমানে সাজেককে ঘিরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা পর্যটন খাতকে জিম্মি করার এক বিপজ্জনক পরিস্থিতিও তৈরি করছে। পর্যটকদের চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে স্থানীয় পরিবহনশ্রমিক, হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং অন্যান্য সেবাদানকারী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন। সশস্ত্র হামলা, সড়ক অবরোধ ও নিরাপত্তাহীনতার খবর ছড়িয়ে পড়লে পর্যটকেরা সাজেক ভ্রমণে নিরুৎসাহিত হন। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হয়।

এই পরিস্থিতির পেছনে দুটি উদ্দেশ্য কাজ করতে পারে। প্রথমত, পর্যটন খাতকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে স্থানীয় অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং চাঁদাবাজির সুযোগ বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, পর্যটকদের আটকে রেখে কিংবা অবরুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা। এসব উদ্দেশ্য বাস্তবে কাজ করছে কি না, তা তদন্তের বিষয়। তবে যে উদ্দেশ্যেই পর্যটকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা হোক, তার পরিণতি ভোগ করেন সাধারণ মানুষ। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় সাজেকের পর্যটন অর্থনীতি ধ্বংস হতে দেওয়া যায় না।

পাহাড়ের সাধারণ বাসিন্দাদের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হুমকি, ভয়ভীতি এবং জুমচাষে বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোনো পরিবারকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য করা হলে কিংবা সাধারণ মানুষকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। রাজনৈতিক কর্মসূচি বা অবরোধের আড়ালে সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া যায় না। একইভাবে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকারও অস্বীকার করা যাবে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে অপরাধী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রেখে আইন প্রয়োগ করা। সাজেকের সংকট তাই কেবল কয়েকটি সড়কে অবরোধ কিংবা পর্যটকবাহী গাড়ি আটকে দেওয়ার ঘটনা নয়; এটি প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, স্থানীয় মানুষের অধিকার এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

এই অস্থিরতার মুখে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়কার পার্বত্য নিরাপত্তা ও সীমান্ত কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। সত্তরের দশকের শেষভাগ ও আশির দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তাঁর সরকার নিরাপত্তা জোরদার, প্রশাসনিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল। তাঁর সমর্থকদের মতে, নিরাপত্তা, জনসংখ্যার ভারসাম্য ও উন্নয়নকে সমন্বিত করে পার্বত্য অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমান সরকার শিক্ষা নিতে পারে। তবে সেই সময়কার পুনর্বাসননীতি, ভূমির মালিকানা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, তা-ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অতীতের অভিজ্ঞতা মূল্যায়নের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কার্যকর নিরাপত্তানীতি নির্ধারণ, ইতিহাসের বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়া নয়।

জিয়াউর রহমানের সময়কার নিরাপত্তা কৌশলের অন্যতম দিক ছিল দুর্গম এলাকায় নিরাপত্তা স্থাপনা ও সীমান্ত চৌকি জোরদার করা। এর পাশাপাশি দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বহু বাঙালি পরিবারকে পার্বত্য অঞ্চলে পুনর্বাসনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। সমর্থকদের দৃষ্টিতে, এই পদক্ষেপগুলো পার্বত্য অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি জোরদার এবং জাতীয় মূলধারার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর কৌশলের অংশ ছিল। একই সময়ে পুনর্বাসনের ফলে ভূমির অধিকার, জনসংখ্যার বিন্যাস ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিরোধেরও সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বর্তমানের জন্য কার্যকর শিক্ষা নিতে হলে নিরাপত্তা ও উন্নয়নের পাশাপাশি ভূমি নিয়ে বিরোধের ন্যায়সংগত সমাধানও নিশ্চিত করতে হবে।

আজকের সাজেক ও সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপত্তাব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন আর বিলম্বিত করা উচিত নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে জিয়াউর রহমানের সন্তান তারেক রহমানের সরকার রয়েছে। ফলে অতীতের নিরাপত্তানীতির অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন সময় এসেছে অতীতের ভুল নীতি সংশোধন করে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। শান্তিচুক্তির পর যেসব এলাকায় সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের কারণে নিরাপত্তার ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেসব এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যাম্প পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। আন্তর্জাতিক সীমান্তসংলগ্ন দুর্গম এলাকাগুলোতে সেনা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর টহল বাড়াতে হবে। সীমান্তপারের প্রশিক্ষণ, অবৈধ অস্ত্রের চালান কিংবা বিদেশি সহায়তায় পরিচালিত সশস্ত্র তৎপরতার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা কেবল রাঙামাটি বা খাগড়াছড়ির অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে তার প্রভাব দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তার ওপর পড়তে পারে। তাই রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। ইউপিডিএফসহ যেকোনো অবৈধ অস্ত্রধারী সংগঠন যদি নিজস্ব কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে কিংবা বিদেশি মদদে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা অভিযান জোরদার করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সশস্ত্র অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে। একই সঙ্গে যেকোনো বিদেশি রাষ্ট্র বা পক্ষের সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করতে হবে এবং কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পদক্ষেপ নিতে হবে।

ভারতের কাছ থেকে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা প্রশিক্ষণ বা সামরিক সহায়তা পেয়ে থাকলে বিষয়টি কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া যায় না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই সম্পর্কের অজুহাতে বাংলাদেশের নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ উপেক্ষা করা চলে না। সীমান্তের ওপার থেকে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রশিক্ষণ, অস্ত্র কিংবা অর্থ পেলে তার বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সীমান্ত নজরদারি জোরদার, অবৈধ অস্ত্রের উৎস শনাক্ত এবং প্রয়োজন হলে কূটনৈতিক পর্যায়ে জবাবদিহি চাওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কোনো প্রচেষ্টা বরদাশত করা হবে না—রাষ্ট্রের নীতিতে এই অবস্থান স্পষ্ট থাকা জরুরি।

একই সঙ্গে সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগণের সমান অধিকার, ন্যায়বিচার এবং নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যাতে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে বা বিভ্রান্ত করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর উপস্থিতি বাড়াতে হবে। ভূমি নিয়ে বিরোধের ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জনের উদ্যোগও জোরদার করতে হবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার নামে কোনো জনগোষ্ঠীর অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না। কারণ, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারকে পাশাপাশি এগিয়ে নিতে হবে।

যে সাজেক প্রতিদিন হাজারো মানুষকে মেঘের দেশে স্বাগত জানায়, যে সাজেক পাহাড়, মেঘ ও প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্যের প্রতীক, সেই সাজেককে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী কিংবা বিদেশি শক্তির স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত হতে দেওয়া যায় না। পাহাড়ের মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তাকে জিম্মি করে আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রকে তার সাংবিধানিক ক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে পাহাড়ে কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধ, সশস্ত্র অপরাধ দমন, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সব জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই সাজেককে আবার নিরাপদ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব।

মেঘের দেশে অস্থিরতার এই কালো মেঘ কাটাতে হলে রাষ্ট্রকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দৃঢ় নিরাপত্তাব্যবস্থা, সীমান্তে কার্যকর নজরদারি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তবে তা হতে হবে ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা রক্ষায় কোনো আপস নয়। সাজেককে আবার শান্ত, নিরাপদ ও প্রাণবন্ত জনপদে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব এখন রাষ্ট্রের।