বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান সম্প্রতি বলেছেন, বিএনপি পানি খায় ঠিকই, কিন্তু ঘোলা করে খায়। উক্তিটি যে প্রেক্ষাপটে, যেভাবেই বলা হয়ে থাকুক না কেন, দেশের অর্থনীতির প্রধান চাবিকাঠি চট্টগ্রাম বন্দরের সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে এই কথার প্রায় নিখুঁত ও নগ্ন প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতার বাইরে থাকতে যে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা সুর চড়িয়ে রাজপথ উত্তপ্ত করেছিল, সার্বভৌমত্ব বিক্রির জিগির তুলেছিল, ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম হতেই সেই একই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাদের আর কোনো দ্বিধা দেখা যাচ্ছে না। নীতি ও অবস্থানের এই অলৌকিক উল্টো রথযাত্রায় আজ সাধারণ মানুষের মনে কেবল একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে, দেশপ্রেমের যে সুর সেদিন শোনানো হয়েছিল, তা কি তবে কেবলই ক্ষমতার মসনদে বসার রাজনীতি ছিল?

ঘটনার শুরু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। ভঙ্গুর অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের এই প্রধান সমুদ্রবন্দরের টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও দক্ষ বিদেশি অপারেটরদের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। তাদের যুক্তি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। চট্টগ্রাম বন্দরে একটি পণ্যবাহী জাহাজ ভেড়ানোর জন্য গড়ে তিন থেকে চার দিন অপেক্ষা করতে হয়, যেখানে পার্শ্ববর্তী সিঙ্গাপুর বন্দরে সময় লাগে মাত্র ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা। কনটেইনার খালাস করতেও আমাদের সময় লাগে সাত থেকে দশ দিন। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় এই ধীরগতি বিশাল এক অপচয়। অন্তর্বর্তী সরকার চেয়েছিল আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও বিপুল বৈদেশিক বিনিয়োগ এনে এই ‘টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম’ কমিয়ে আনতে। বিশ্বখ্যাত এপিএম টার্মিনালস, মেডলগ কিংবা ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো আন্তর্জাতিক অপারেটরদের সঙ্গে তখন আলোচনা ও চুক্তির প্রক্রিয়া এগোতে থাকে।

কিন্তু তৎকালীন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের এই সংস্কারমুখী পদক্ষেপকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। শুরু থেকেই তারা এই সিদ্ধান্তের তীব্র ও অন্ধ বিরোধিতা শুরু করে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত একটাই কথা বলা হয়েছিল, বিদেশিদের হাতে বন্দর দিলে দেশের অর্থনীতি নাকি ধ্বংস হয়ে যাবে। জাতীয় নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে। আর দেশের সার্বভৌমত্ব অন্য কোনো রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এমনকি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অন্যতম তারেক রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ বার্তা দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কড়া মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল সোজা, কোনো অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ার নেই দেশের এত বড় একটি কৌশলগত সম্পদ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বা কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার। গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট ছাড়া কোনো সরকারের পক্ষে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এভাবে বিদেশি চুক্তিতে বেঁধে ফেলা নাকি বড় অপরাধ।

দলের শীর্ষ পদ থেকে বার্তা আসার পর সারা দেশে বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলো নেমে পড়ে আন্দোলন-সংগ্রামে। চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনীতিতেও এর উত্তাপ ছড়িয়ে দেওয়া হয় সুপরিকল্পিতভাবে। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নাম ভাঙিয়ে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের উসকে দেওয়া হয় সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। শ্রমিক নেতারা তখন মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বুক চাপড়ে হুংকার ছেড়েছিলেন, রক্ত দেব, প্রাণ দেব, তবুও এনসিটি বা অন্য কোনো টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে তুলে দেব না। তাদের সভা-সমাবেশ, কর্মবিরতি আর ধর্মঘটের কারণে বারবার থমকে দাঁড়িয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দরের চাকা। একপর্যায়ে শ্রমিকদের আট ঘণ্টার আকস্মিক কর্মবিরতিতে স্থবির হয়ে পড়েছিল বন্দরের পুরো কার্যক্রম, যার চরম মাশুল গুনতে হয়েছিল দেশের আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের। কেবল রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিতে বিএনপি যে সেদিন আন্দোলনের এই আগুন উসকে দিয়েছিল, তা তৎকালীন যেকোনো সচেতন নাগরিকের কাছেই স্পষ্ট ছিল।

কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরল, রাজনৈতিক দৃশ্যপটেরও পরিবর্তন ঘটল। বিএনপি সরকার গঠন করল। আর সরকারে বসার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের নীতি, আদর্শ, সার্বভৌমত্ব রক্ষার চেতনা আর শ্রমিক দরদের সমস্ত বয়ান তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। ক্ষমতার মসনদে বসে বিএনপি সরকার এখন ঠিক সেই পথেই হাঁটছে, যে পথের তারা একসময় চরম বিরোধিতা করেছিল। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল, পানগাঁও আইসিডিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এখন একে একে তুলে দেওয়া হচ্ছে সেই একই বিদেশি কোম্পানিগুলোর হাতে।

আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড, সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে, ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস কিংবা সুইজারল্যান্ডের মেডলগ, যে কোম্পানিগুলোকে কিছুদিন আগেও ‘দেশ বিক্রির চক্রান্তকারী’ বা ‘সার্বভৌমত্বের হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল, ক্ষমতার চশমা চোখে লাগাতেই তারা এখন বিএনপি সরকারের কাছে রাতারাতি উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের পরম মিত্র হয়ে উঠেছে। যেসব টার্মিনাল দেশীয় অর্থায়নে তৈরি, যেগুলো গত দেড় দশক ধরে লাভজনকভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে, সেগুলোকেও এখন দীর্ঘমেয়াদি ইজারায় বিদেশিদের হাতে সঁপে দিতে বিএনপির বর্তমান সরকারের কোনো দ্বিধা কাজ করছে না।

সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, আজ বিএনপির কোনো নেতার মুখে আর দেশের সার্বভৌমত্ব হারানোর ভয় দেখা যাচ্ছে না। ডিপি ওয়ার্ল্ড কিংবা বিদেশি অপারেটরের কাছে দেশের অর্থনৈতিক চাবিকাঠি সঁপে দিলে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, এমন কোনো বার্তা এখন আর তারেক রহমান বা দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের ফেসবুক পেজ কিংবা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায় না। ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় যে বিষয়টিকে তারা বলতেন ‘দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ার নীলনকশা’, ক্ষমতায় এসে সেই একই বিষয়কে এখন উপস্থাপন করা হচ্ছে ‘অর্থনৈতিক গতিশীলতা ও আধুনিকায়নের নিয়মিত কাজ’ হিসেবে।

আরও করুণ চিত্র দেখা যাচ্ছে চট্টগ্রামের সেই তথাকথিত শ্রমিক রাজনীতির মাঠে। যেসব শ্রমিক নেতা গতকাল পর্যন্ত ‘জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও বন্দর রক্ষা’ করার জন্য রাজপথে স্লোগান তুলেছিলেন, কড়া আন্দোলনের হুমকিতে বন্দর অচল করে দিয়েছিলেন, তারা আজ হঠাৎ রহস্যজনকভাবে নীরব। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সেই বিপ্লবী শ্রমিক নেতাদের রাজপথের হুংকার কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে। এখন আর কোনো নতুন আন্দোলনের ডাক নেই, কোনো মশাল মিছিল নেই, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব কিংবা বন্দর ভবনের সামনে কোনো জোরালো প্রতিবাদ নেই। কারণ, পানি এখন ঘোলা করা শেষ হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা গেছে। যে ঘোলা জলের পেছনে এত দিন রাজনীতির ফন্দা করা হয়েছিল, এখন শান্ত হয়ে সেই পানিটুকু গিলে নেওয়ার সুবর্ণ সময় এসেছে বলে তারা মনে করছেন।

এই যে দ্বিমুখী নীতি, একে রাজনীতির ভাষায় বলা হয় ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ বা দ্বিচারিতা। ক্ষমতার বাইরে থাকলে দেশপ্রেম ও জাতীয় স্বার্থের গান গাওয়া আর ক্ষমতায় গেলে ঠিক তার উল্টো পথে হেঁটে নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করা, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই রোগ নতুন নয়। তবে চট্টগ্রাম বন্দর ইস্যুতে বিএনপি যে নজির স্থাপন করল, তা লোকচক্ষুর সামনে অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলে থাকার সময় যে সিদ্ধান্তকে তারা ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ ও ‘অনভিপ্রেত’ বলে আখ্যায়িত করেছিল, ক্ষমতায় বসে সেই একই সিদ্ধান্তকে আলিঙ্গন করে নেওয়া কেবল সাধারণ জনগণের সঙ্গেই প্রতারণা নয়, বরং রাজনীতিকে যে তারা নিছক এক স্বার্থসিদ্ধির খেলায় পরিণত করেছে, তারই প্রমাণ।

যে সাধারণ শ্রমিকদের তারা আন্দোলনে নামিয়েছিল, তাদের চাকরি ও ভবিষ্যৎ রক্ষা পাওয়ার বদলে আজ তারা ব্যবহৃত এক হাতিয়ার ছাড়া আর কিছুই নয়। সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও খেটে খাওয়া বন্দর শ্রমিকরা আজ বুঝেছেন, সেদিন সার্বভৌমত্ব রক্ষার ডাক কিংবা শ্রমিকের পেটে লাথি না মারার আহ্বানগুলোর উদ্দেশ্য মোটেও দেশহিতৈষী ছিল না। এর একমাত্র লক্ষ্য ছিল পানি ঘোলা করা, সরকারকে চাপে ফেলা এবং নিজেদের ক্ষমতার পথ সুগম করা।

রাজনীতির হাটে চালকের আসন বদলালেও চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাস ও নথিপত্র সাক্ষী হয়ে রইল। সাধারণ নাগরিকরা দেখল, সরকারে থাকা বা না থাকার ওপর কীভাবে বদলে যায় নীতির সংজ্ঞা, কীভাবে বদলে যায় সার্বভৌমত্বের অর্থ। বিএনপি সত্যিই পানি খেল, তবে তা খেল দেশবাসীকে চরম ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে পানিটুকু নিজের হাতে ঘোলা করে নেওয়ার পর। আর দেশের জনগণ রাজনৈতিক নাটকের এই শেষ দৃশ্য দেখে নীরবে কেবল একটা কথাই অনুধাবন করতে পারল, এই দেশে রাজনীতির রং বদলায়, মুখের ভাষা বদলায়, কিন্তু সাধারণ মানুষকে বলির পাঁঠা বানিয়ে ক্ষমতার ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের এই নোংরা কৌশল কখনোই বদলায় না।