জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন জাপানি বিনিয়োগ এবং এর ফলে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়ে এ বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) টোকিওতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে এ বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়। গত ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারি জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
দুই নেতা এ উপলক্ষে ঘোষিত বড় ধরনের বিনিয়োগ উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানান। তারা টেকসই সরবরাহব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে একমত হন।
দুই দেশের প্রধান দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগটিকে ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’তে উন্নীত করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ফলে উদীয়মান অর্থনৈতিক সুযোগ, সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায়ও উদ্যোগটির পরিধি বাড়বে।
দুই প্রধানমন্ত্রী এ উদ্যোগের আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও আইসিটি অবকাঠামোর উন্নয়ন একযোগে এগিয়ে নেওয়া, শিল্প মূল্য শৃঙ্খলের একটি বড় কেন্দ্র গড়ে তোলা, এবং একই সঙ্গে বাণিজ্য ও সরবরাহের একটি প্রবেশদ্বার তৈরির বিষয়ে একমত হয়েছেন।
আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নিতে একমত হয়েছেন।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তারেক রহমানের সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি আগামী পাঁচ বছরে জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাকে স্বাগত জানান।
জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরকে স্বাগত জানান দুই নেতা। দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে চুক্তিটি দ্রুত কার্যকর করার অঙ্গীকারও তারা পুনর্ব্যক্ত করেন। এ চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্পের বহুমুখীকরণে জোর দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তাঁরা। এতে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া সহজ, টেকসই ও অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম হবে।
জাপানের ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণে জরুরি সহায়তা ঋণ’ কর্মসূচির আওতায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েন সহায়তার জন্য জাপানকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দ্বিপক্ষীয় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল রূপান্তর, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন আইসিটি পেশাজীবী তৈরি এবং নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধানের গুরুত্ব স্বীকার করেন দুই নেতা।
ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর অভিপ্রায় পুনর্ব্যক্ত করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর এবং কার্যকর হওয়াকে তারা স্বাগত জানান। এ ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতায় আরও অগ্রগতি হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক পর্যালোচনা করে দুই নেতা দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব এবং অবকাঠামো, জ্বালানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে কৌশলগত অংশীদারিত্বের অগ্রগতির প্রশংসা করেন।
মিয়ানমারের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি, এর আঞ্চলিক নিরাপত্তাগত প্রভাব, বাস্তুচ্যুতি এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। তারা অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং রোহিঙ্গাসহ সব পক্ষ ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সংলাপের আহ্বান জানান।
মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত উত্তেজনা প্রশমন এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে অবিলম্বে ও সম্পূর্ণভাবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান বাংলাদেশ ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী। অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই সব জাহাজের নিরাপদ ও অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার ওপরও তাঁরা গুরুত্ব দেন।
দুই নেতা গাজা পুনর্গঠনে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানসহ ফিলিস্তিন সমস্যার ন্যায়সঙ্গত, স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
দুই প্রধানমন্ত্রী বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের নীতির প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় তাকে অভিনন্দন জানান তাকাইচি। আরও সক্ষম ও অভিঘাত মোকাবিলায় শক্তিশালী জাতিসংঘ গড়ে তুলতে তাঁর সঙ্গে সহযোগিতার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি এবং দেশটির জনগণের উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি তাকাইচিকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানান।








