নির্বাচনী রাজনীতিতে জামায়াত বা এনসিপি কতখানি বড় হবে, তা এখনো নির্ভর করে আওয়ামী লীগ থাকা, না থাকার ওপর। অবশ্য পাঁচ থেকে দশ বছর পর কী হবে, তা সময় বলবে। তবে সাড়ে চার দশকের সমীকরণের কারণে এখন পর্যন্ত ভোটের রাজনীতির দ্বৈরথ বিএনপি ও আওয়ামী লীগের।

নৌকা নির্বাচনে থাকলে আওয়ামী লীগবিরোধীদের একমাত্র গন্তব্য বিএনপি। আওয়ামী লীগের ভোটের সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হলেও। শেখ হাসিনার জুজু যতক্ষণ আছে, ততক্ষণ প্রত্যেক আওয়ামী লীগবিরোধী ভোটার ব্যালটে নৌকা দেখলে ধানের শীষেই ভোট দেবেন, শত মতভিন্নতা নিয়েও। তিনি দাড়িপাল্লা কিংবা শাপলা কলির সমর্থক হলেও। কারণ, অতীতের নিপীড়নের দুঃসহ অভিজ্ঞতা। কারণ, নৌকার মাইর থেকে বাঁচাতে পারে শুধু ধান। সাড়ে চার দশকের এই ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতার কারণে।

কিন্তু ব্যালটে নৌকা না থাকলে শুধু এই ভোটাররা নন, যাঁরা বিএনপিকে অতীতে ভোট দিতেন এবং এখনো দিতে পারেন, তাঁদেরও অনেকে ভোট দেবেন দাড়িপাল্লা কিংবা শাপলা কলিকে। এই সমর্থন ইস্যু, মোমেন্টাম এবং সুইং নির্ভর। এ কারণেই এবার জামায়াত জোট ৩৭.৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এটা অনেক বড় সংখ্যা। ১৯৯১ সালে বিএনপি ৩০.৮ শতাংশ এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ৩৭ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করেছিল।

কিন্তু ব্যালটে যদি কামাল বদ্দারের নেতৃত্বেও নৌকা থাকত, তাহলে পুরোনো ভয়ের কারণে জামায়াত জোট ৩৭.৫ শতাংশ ভোট পেত না। এই ভোটারদের একাংশ শুধু নতুন কিছু ট্রাই করার চিন্তা বা বিএনপির প্রতি অসন্তোষ নয়, হাসিনার ভয় নেই বলেই ধানের শীষের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পেরেছেন। এই ভয় চলে গেলে আগামী এক-দুই নির্বাচন পর কী হবে, তা সময় বলবে।

হাসিনার ভয় না থাকায় বিএনপি যেমন এবার পুরোনো ভোটারদের একাংশের ভোট পায়নি, তেমনি জামায়াতের ভয় থাকার কারণে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট পেয়েছে। বিশেষ করে হিন্দু ভোট বাক্সভরে পেয়েছে। নেত্র নিউজের অ্যানালাইসিসে দেখলাম, যত দূর মনে পড়ে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় বিএনপি ৭৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে। যেসব আসনে বিএনপি হেরেছে, সেখানেও হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ কেন্দ্রগুলোতে ৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছে।

দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, টাঙ্গাইল, জামালপুর, হবিগঞ্জ, বৃহত্তর ফরিদপুর, উত্তর চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ অতীতে শক্তিশালী ছিল। এবারের নির্বাচনে এসব এলাকায় বিএনপি বিপুল ব্যবধানে জিতেছে। জামায়াত শুধু হারেনি, দাঁড়াতেই পারেনি। যে ঠাকুরগাঁও-২, দিনাজপুর-৬, দিনাজপুর-১ আসনে অতীতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো, সেগুলোতেও হেরেছে জামায়াত। এটা হয়েছে নৌকার ভোট ধানে চলে যাওয়ায়।

পশ্চিমবঙ্গেও গত দুইবার একই ঘটনা ঘটেছে। যেসব আসনে আগের দুইবার তৃণমূল ও বামেদের মধ্যে টক্কর হয়েছিল, সেগুলো গত দুইবার বিজেপি জিতেছে। যেটাকে বলা হয়, বামের ভোট রামে গিয়েছে।

এবারের নির্বাচনে দেখা গেছে, যেসব এলাকায় অতীতে বিএনপি একচেটিয়া ছিল, সেগুলোতে জামায়াত জিতেছে। যেমন যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর। আর শহর এলাকার ভোট পেয়েছে কিছু অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সির কারণে।

এত কথা বলার কারণ হলো, জামায়াত কোনোভাবেই চায় না আওয়ামী লীগ ফিরুক। ২০২৫ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর জামায়াত নির্বাচনে ঢুকে যায়। এখন দলটির হিসাব হলো, ২০৩১ সাল পর্যন্ত এই পরিস্থিতি বজায় রাখা। এ কারণে, সরকার পড়ে যাবে, এমন পরিস্থিতি জামায়াত শুধু সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকবে না, সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে যেন এমন কিছু না ঘটে। তারা খুব ভালো করেই জানে, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়, অর্থাৎ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল হলে আওয়ামী লীগ ফিরতে পারবে না। শেখ হাসিনা একমাত্র এবং কেবলমাত্র ফিরতে পারবেন, যদি নির্বাচন ছাড়া সরকার পতন হয় বা ক্ষমতায় কেউ আসে।

এটা বিএনপিও জানে। তারাও শেখ হাসিনাকে রাজনীতিতে ফিরতে দেবে না ভোটের হিসাবের কারণে। নেতৃত্ব পরিবর্তন করে ক্ষমা চেয়ে আওয়ামী লীগ ফিরলে বিএনপি রিকনসিলিয়েশনে রাজি ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা যেমন ক্ষমা চাইতে রাজি নন, তেমনি চাইছেন কাল বাদে পরশু তাঁকে ক্ষমতায় বসাতে হবে, তারেক রহমানকে সরিয়ে। ১০ বছরের জন্য নিজের বর্তমান অবস্থা মেনে নিলেও হতো। হাসিনার যে চাওয়া, তাতে বিএনপি তাঁকে এক ইঞ্চিও স্পেস দেবে না।

কিন্তু জামায়াতকেও টাইটে রাখবে বিএনপি। রাজপথে বাধা দেবে না। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান, এস্টাবলিশমেন্ট, বিজনেসে প্রভাব তৈরি করতে দেবে না। আর ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে নিয়মিত আক্রমণ করবে। কারণ, আওয়ামী লীগের যে অংশ এবং সংখ্যালঘুরা জামায়াতকে ভয় পায়, তা যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে। যাতে তারা জামায়াত থেকে বাঁচতে ধানের শীষেই ভোট দিয়ে যায়। এবারের পূজাসহ সরকারের গত কয়েক মাসের প্রচেষ্টা দেখলেই তা বুঝবেন। এই দুই খাত থেকে ১২-১৩ শতাংশ ভোট পেলেই তো হয়। আর যেকোনো পরিস্থিতিতে বিএনপির নিজস্ব অনুগত ৩৫ শতাংশ ভোট রয়েছে।

তাই বলে কি বিএনপি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বক্তৃতা বন্ধ করবে? অবশ্যই করবে না। নিজেদের অনুগত সমর্থকদের অ্যাপিজ করতে এটা করেই যাবে। হাসিনার ভয় দেখাবে। এ কারণেই বারবার বলবে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাত হয়ে গেছে। একই আলাপ জামায়াতও বারবার করবে বিএনপির বিরুদ্ধে।

এটা পিওর ডেমোগ্রাফির রাজনীতি। এটাতে অন্যায় বা অনৈতিক কিছুই নেই। জামায়াত যেভাবে বিএনপির তুমুল বিরোধিতা করেও আওয়ামী লীগবিরোধীদের অ্যাপিজ করতে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াকে নেতা মেনে চলছে, এটাও সেই রাজনীতির অংশ। এনসিপিও একই রাজনীতি করছে। এর সঙ্গে তাদের পুঁজি হলো জুলাই। তবে এই খেলায় শেষ পর্যন্ত কে সফল হবে, তা একমাত্র ভবিষ্যৎ বলতে পারবে।