বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি এখন এক অদ্ভুত রাজনৈতিক বাস্তবতা। ভোটের মাঠে দলটির শক্তি কমেছে, সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে, নেতৃত্বের বিরোধ ও ভাঙন প্রকাশ্য হয়েছে। তবু দলটি হারিয়ে যায়নি। বরং সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে, কিন্তু জাতীয় পার্টি কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক পরিসরে জায়গা করে নিয়েছে। এই টিকে থাকার গল্পটি শুধু একটি দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন।

বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির কোনো না কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা ছিল। ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টি ৩৪টি আসন পেয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে, একই সময়ে দলটির নেতারা আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভাতেও ছিলেন। ফলে সরকার ও বিরোধী দলের এই দ্বৈত ভূমিকা নিয়ে তখনই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০১৮ সালে জাতীয় পার্টি ২২টি আসন পায় এবং আবারও সংসদে প্রধান বিরোধী দলের অবস্থান নেয়। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জাতীয় পার্টি ২৬টি আসন ছাড় পায় এবং শেষ পর্যন্ত ১১টি আসনে জয়ী হয়।

অর্থাৎ আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে জাতীয় পার্টি শুধু একটি বিরোধী দল ছিল না। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অনেক বেশি জটিল ও ঘনিষ্ঠ। কখনো জোটের অংশীদার, কখনো সংসদের বিরোধী দল, আবার কখনো সরকারের অংশ হিসেবে দলটির নেতাদের উপস্থিতি ছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার সরকারে জাতীয় পার্টির নেতারা মন্ত্রী হন, আবার একই দল সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকাও পালন করে। সংসদীয় গণতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দ্বৈত ভূমিকা নিয়ে তখন ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।

২০২৪ সালের নির্বাচনেও সেই সম্পর্কের আরেকটি প্রকাশ্য নজির দেখা যায়। আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির জন্য ২৬টি আসন ছেড়ে দিয়েছিল। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নিজেই তখন বলেছিলেন, জাতীয় পার্টির সঙ্গে আসন সমঝোতা নতুন কিছু নয়, ২০১৪ ও ২০১৮ সালেও এমন সমঝোতা হয়েছিল। ফলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক বোঝাপড়া কোনো গোপন বিষয় ছিল না। বরং নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতা নিয়ে দুই দলের নেতাদের প্রকাশ্য আলোচনা, বৈঠক এবং দর-কষাকষির খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

তারপর এল ৫ আগস্ট। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখন পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো, সহযোগী শক্তি এবং রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এল, তখন জাতীয় পার্টির অতীত ভূমিকা নিয়েও বড় প্রশ্ন ওঠার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে জাতীয় পার্টিকে ঘিরে যে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা আওয়ামী লীগকে ঘিরে তৈরি হওয়া জবাবদিহির আলোচনার সঙ্গে তুলনা করলে অনেকটাই ভিন্ন। জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা হয়েছে, দলটির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মসূচি হয়েছে, তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে, জি এম কাদেরকে গ্রেপ্তারের দাবিও উঠেছে। কিন্তু এসব চাপ শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টির অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে কোনো বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব-নিকাশে পরিণত হয়নি।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। জাতীয় পার্টি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চাপমুক্ত ছিল, এমন কথা বলা যাবে না। দলটির সঙ্গে গণ অধিকার পরিষদের সংঘর্ষ হয়েছে, জি এম কাদের সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছেন, দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়েও টানাপোড়েন হয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে সংঘর্ষে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর গুরুতর আহত হন। আবার জাতীয় পার্টি অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার অভিযোগও করেছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক চাপ ছিল।

কিন্তু চাপ থাকা আর রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়া এক বিষয় নয়। জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ক্ষোভ যতটা দৃশ্যমান ছিল, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনে দলটির ভূমিকা নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কোনো পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান বা প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির উদ্যোগ ততটা দৃশ্যমান হয়নি। বরং দলটি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছে এবং নির্বাচনেও অংশ নিয়েছে। এখানেই ‘সুরক্ষা বলয়’ কথাটি সামনে আসে।

এই সুরক্ষা বলয় বাস্তবে ছিল কি না, থাকলে তার চরিত্র কী ছিল, সেটি প্রমাণের বিষয়। কিন্তু প্রশ্নটি তদন্তযোগ্য। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যেও দলটির বিষয়ে কোনো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে হস্তক্ষেপ হয়েছিল কি না, হলে কারা করেছিলেন, কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং সেই সিদ্ধান্তের পেছনে কী যুক্তি ছিল, এসব তথ্য প্রকাশ্যে আসা দরকার। কোনো উপদেষ্টা বা নীতিনির্ধারককে প্রমাণ ছাড়া দায়ী করা সাংবাদিকতার কাজ নয়। কিন্তু ক্ষমতার ভেতরে এমন কোনো যোগাযোগ বা সিদ্ধান্তের অস্তিত্ব থাকলে সেটিও আড়াল থাকার কথা নয়। সরকারি বৈঠকের নথি, সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং প্রত্যক্ষ তথ্যের ভিত্তিতে এ বিষয়ে অনুসন্ধান হতে পারে।

কারণ জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ নতুন কিছু নয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে দলটির নির্বাচনে যাওয়া নিয়েও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে তৎপরতার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন অংশ নির্বাচনে না যাওয়ার অবস্থানে থাকলেও শেষ পর্যন্ত সরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে গিয়ে নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন এবং পরে দলটি নির্বাচনে অংশ নেয়। জি এম কাদের নিজেও পরে বলেছিলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ওপর গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ ছিল।

এই ঘটনাগুলো দেখায়, জাতীয় পার্টি ও ক্ষমতার কেন্দ্রের সম্পর্ককে শুধু প্রকাশ্য রাজনৈতিক জোট বা আসন সমঝোতার ভাষায় বোঝা যায় না। এর ভেতরে যোগাযোগের আরও অনেক স্তর ছিল। সেই যোগাযোগের ধরন, উদ্দেশ্য ও ফলাফল নিয়ে যথেষ্ট অনুসন্ধান এখনো হয়নি।

জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে নুরুল হক নুরের ঘটনাটিও তাই আলাদা করে দেখার মতো। জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে নুর দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে সরব ছিলেন। ২০২৫ সালের আগস্টে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে সংঘর্ষে তিনি গুরুতর আহতও হন। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় পার্টিকে নিয়ে তার আগের অবস্থান কতটা অটুট ছিল, সেই প্রশ্নও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার দাবি রাখে। এখানে ব্যক্তিগত সমঝোতা বা রাজনৈতিক লেনদেনের অভিযোগকে প্রমাণ ছাড়া সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ নেই। তবে একজন রাজনৈতিক নেতার অবস্থান কীভাবে বদলায়, তার পেছনে কী রাজনৈতিক বাস্তবতা কাজ করে, সেটি অনুসন্ধানের বৈধ বিষয়।

জাতীয় পার্টিকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জি এম কাদেরের আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগের প্রসঙ্গ। গত কয়েক বছরে শেখ হাসিনার বক্তব্য, আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত এবং দলটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বের যোগাযোগের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। অথচ আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির সম্পর্ক যে শুধু নির্বাচনের দিন ভোটের মাঠের সম্পর্ক ছিল না, সেটি ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহই দেখায়। ফলে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের যোগাযোগের রাজনৈতিক তাৎপর্যও আলোচনায় থাকা দরকার।

এখানে ‘আওয়ামী লীগের প্রক্সি’ শব্দটিও আসে। জাতীয় পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের প্রক্সি ছিল, এমন কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক বা আইনি সত্য নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনে জাতীয় পার্টির ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে এই ব্যাখ্যার ভিত্তি কেন তৈরি হয়েছে, সেটি বোঝা যায়। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বঞ্চিত একটি নির্বাচন হিসেবে সমালোচনা করা হয়েছিল। সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি অংশ নিয়ে ৩৪টি আসন পায় এবং সংসদে প্রধান বিরোধী দলের অবস্থান নেয়। একই সময়ে তাদের নেতারা সরকারের মন্ত্রিসভায়ও ছিলেন। ২০১৮ সালেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জাতীয় পার্টি ২২টি আসন পায়। ২০২৪ সালে আবারও আসন সমঝোতা হয়।

এই ধারাবাহিকতা থেকে অন্তত এটুকু বলা যায়, আওয়ামী লীগের ক্ষমতার কাঠামোকে রাজনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখতে জাতীয় পার্টির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে জাতীয় পার্টি নিজে এটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে এবং জি এম কাদেরও আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাই এখানে সিদ্ধান্তের চেয়ে তথ্য ও রাজনৈতিক ইতিহাসই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি বিষয়ও চোখে পড়ার মতো। জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক শক্তি যত কমেছে, দলটির সংবাদমাধ্যমে উপস্থিতি ততটা কমেনি। এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সমস্যা নয়। কোনো রাজনৈতিক দলের বক্তব্য সংবাদযোগ্য হলে তা প্রকাশিত হবেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমান বক্তব্যের পাশাপাশি সেই দলের অতীত ভূমিকাও কি একই গুরুত্বে যাচাই করা হচ্ছে? জাতীয় পার্টির একজন নেতা আজ কী বলছেন, সেটি সংবাদ। কিন্তু গত এক দশকে দলটি কোন কোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কী ভূমিকা নিয়েছে, ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে কী ধরনের সমঝোতা করেছে এবং সেই সমঝোতার বিনিময়ে কী রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে, সেটিও সংবাদ এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ।

আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও দলটি নিষ্ক্রিয় ছিল না। ২০২৫ সালের আগস্টে আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের একটি প্রতিনিধিদল জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। অর্থাৎ দেশের ভেতরে দলটি দুর্বল হলেও রাজনৈতিক যোগাযোগের জায়গায় তার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

তবে শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের ফল জাতীয় পার্টির দীর্ঘ রাজনৈতিক দুর্বলতাকে প্রকাশ্য করে দিয়েছে। দলটি কোনো আসন পায়নি। প্রথম আলোর বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক, সাংগঠনিক ভাঙন, নেতৃত্বসংকট ও ভোটব্যাংকের ক্ষয় দলটির সংকটকে গভীর করেছে। অর্থাৎ ভোটের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির অবস্থান যে দুর্বল হয়েছে, তা এখন আর অনুমানের বিষয় নয়।

কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি দল নির্বাচনে শূন্য আসন পেলেই তার রাজনৈতিক ইতিহাস শেষ হয়ে যায় না। বরং তখনই তার অতীত ভূমিকার হিসাব আরও জরুরি হয়ে পড়ে। জাতীয় পার্টি যদি আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হয়ে থাকে, তাহলে সেই সম্পর্কের রাজনৈতিক দায় কোথায়? যদি তারা নিজেদের স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাবি করে, তাহলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাদের ভূমিকার ব্যাখ্যা কী? আর যদি আওয়ামী লীগের পতনের পরও দলটি রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার সুযোগ পেয়ে থাকে, তাহলে সেই টিকে থাকার পেছনে কী কী রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করেছে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক রাজনৈতিক চরিত্রের অবস্থান বদলেছে। কেউ ক্ষমতাসীন থেকে বিরোধী হয়েছে, কেউ বিরোধী থেকে ক্ষমতার কাছাকাছি গেছে, কেউ আবার একসময় যাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি কথা বলেছে, পরে তাদের সঙ্গেই রাজনৈতিক সমীকরণ করেছে। জাতীয় পার্টির গল্পটিও সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে নয়। বরং দলটির বিশেষত্ব হলো, এত পরিবর্তনের মধ্যেও তারা কোনো না কোনোভাবে নিজেদের জন্য একটি জায়গা তৈরি করতে পেরেছে।

এই জায়গাটিই ‘অদৃশ্য খুঁটি’র প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। খুঁটিটি আছে কি না, সেটি প্রমাণ করতে হবে। কারও নাম অনুমান করে বসিয়ে দেওয়া যাবে না। কিন্তু জাতীয় পার্টির দীর্ঘ রাজনৈতিক টিকে থাকার ইতিহাস, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ধারাবাহিক সমঝোতা, ক্ষমতার বিভিন্ন কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির প্রতি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সীমিত পরিসর একসঙ্গে দেখলে বিষয়টি অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু বড় দলগুলোর দায় নিয়ে কথা বললেই হবে না। ক্ষমতার সঙ্গে যারা দীর্ঘদিন সুবিধাজনক দূরত্বে থেকেছে, কখনো সহযোগী হয়েছে, কখনো বিরোধী দলের আসনে বসেছে, কখনো আবার সরকারের অংশ হয়েছে, তাদের ভূমিকাও একইভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রেও সেটিই প্রযোজ্য।

আজ জাতীয় পার্টি নির্বাচনীভাবে প্রায় নিঃশেষ। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে দলটির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন ভোট নয়, অতীত। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রকৃতি কী ছিল, সেই সম্পর্কের বিনিময়ে দলটি কী পেয়েছে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনে তার ভূমিকা কী ছিল এবং ক্ষমতার পালাবদলের পরও দলটি কীভাবে রাজনৈতিক পরিসরে টিকে রইল, এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

জাতীয় পার্টি হয়তো দুর্বল হয়ে গেছে। কিন্তু দুর্বল দল মানেই দায়হীন দল নয়। বরং রাজনৈতিক শক্তি যখন ক্ষয় হয়, তখনই অতীতের হিসাব আরও স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সেই হিসাব যদি সত্যিই করা হয়, তাহলে হয়তো একদিন বোঝা যাবে, জাতীয় পার্টির এত দীর্ঘ রাজনৈতিক টিকে থাকার পেছনে কেবল ভোট ছিল, নাকি ছিল আরও কোনো অদৃশ্য খুঁটি।