৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য রাজনৈতিক ক্ষমতা ভেঙে পড়েছে। কিন্তু ক্ষমতা হারালেই ক্ষমতার সঙ্গে তৈরি হওয়া সব সম্পর্ক, সুবিধা, ব্যবসায়িক সমীকরণ ও প্রভাবের নেটওয়ার্ক একদিনে শেষ হয়ে যায় না। বরং পুরোনো প্রভাব টিকে থাকার সবচেয়ে কার্যকর জায়গাগুলোর একটি হতে পারে বয়ান। সরাসরি আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলা যখন রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, তখন আওয়ামী লীগের পক্ষে না দাঁড়িয়েও এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব, যেখানে আওয়ামী লীগের চেয়ে জুলাইপন্থীরাই দেশের বড় সমস্যা হিসেবে হাজির হয়। তখন আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের জন্য আওয়ামী লীগের সাফাই গাওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না।

এই জায়গাটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। জুলাইপন্থীদের ভুল, অপরাধ, সহিংসতা, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা রাজনৈতিক ব্যর্থতার সমালোচনা অবশ্যই হবে। যার বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ আছে, তার বিচারও হতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একই মাপকাঠি কি সবার জন্য প্রযোজ্য? আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসন, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, দুর্নীতি এবং জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের দায় যখন ধীরে ধীরে আলোচনার বাইরে চলে যায়, আর তার বিপরীতে জুলাইয়ের পক্ষের মানুষদের প্রতিটি ব্যর্থতা বা অপরাধকে দেশের সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে তুলে ধরা হয়, তখন সেই বয়ানের রাজনৈতিক ফল কী দাঁড়ায়?

এখানেই গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আসে। মিডিয়া সংস্কার কমিশনের অনুসন্ধানে ৪৫ হাজার পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপে ৭৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ উত্তরদাতা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে গণমাধ্যমকে স্বাধীন মনে করেননি। কমিশন আরও বলেছে, বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর একটি অংশ গণমাধ্যমকে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং সম্পাদকীয় নীতিতে প্রভাব ফেলেছে। অর্থাৎ গণমাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব ও মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থ _দুটিই যে বাস্তব সমস্যা, তার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রয়েছে।

সুতরাং প্রশ্নটি শুধু কে আওয়ামী লীগপন্থী, কে বিএনপিপন্থী বা কে জুলাইপন্থী _এত সরল নয়। আসল প্রশ্ন হলো, কার হাতে গণমাধ্যমের ক্ষমতা, সেই ক্ষমতার পেছনে কার অর্থ, কার ব্যবসায়িক স্বার্থ, কার রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং জনগণের সামনে কোন বয়ানটি বারবার হাজির করা হচ্ছে।

৫ আগস্টের পর মিডিয়ায় মুখ বদলেছিল, কাঠামো কি বদলেছিল?

৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছিল। মিডিয়া সংস্কার কমিশনের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২৯টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক রদবদল হয়। আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অনেক সাংবাদিককে সরিয়ে ‘আওয়ামী লীগবিরোধী’ বা বিএনপি-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা হয়। কমিশনের একজন গবেষক বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পরামর্শ করেই করা হয়েছিল বলে তারা জানতে পেরেছেন।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আছে। আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ সাংবাদিকদের সরিয়ে বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের সাংবাদিককে বসালেই কি গণমাধ্যম নিরপেক্ষ হয়ে যায়? যদি এক রাজনৈতিক আনুগত্যের জায়গায় আরেক রাজনৈতিক আনুগত্য বসে, তাহলে সেটি সংস্কার নয়; সেটি কেবল ক্ষমতার কেন্দ্র বদল। সাংবাদিকের রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধ নয়, কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় যদি নিয়োগ, পদোন্নতি, সম্পাদকীয় ক্ষমতা কিংবা সংবাদ নির্বাচনের যোগ্যতা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নটি থেকেই যায়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ৫ আগস্টের পর যারা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা নয়; বরং তাদের নিয়োগের প্রক্রিয়া ও পরবর্তী ভূমিকা পরীক্ষা করা। কে কখন পদ পেলেন? কেন পেলেন? রাজনৈতিক পরিচয় কি সেখানে কোনো ভূমিকা রেখেছিল? নিয়োগের পর সংবাদ নির্বাচন কীভাবে বদলেছে? কোন বিষয় সামনে এসেছে, কোন বিষয় হঠাৎ আড়ালে গেছে? মালিকপক্ষের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে সেই সম্পাদকীয় পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজলে ৫ আগস্ট-পরবর্তী মিডিয়া পরিবর্তনের প্রকৃত চরিত্র বোঝা যাবে না।

কারণ মুখ বদলানো আর কাঠামো বদলানো এক কথা নয়। মালিক একই, ব্যবসায়িক স্বার্থ একই, রাজনৈতিক যোগাযোগের বড় অংশ একই, অথচ শুধু নিউজরুমের কয়েকটি মুখ বদলে গেল—তাহলে সেটিকে কতটা মৌলিক পরিবর্তন বলা যায়?

শফিকের অপসারণ ও পুরোনো মুখের ফেরার প্রশ্ন

একাত্তর টেলিভিশনকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই আলাদা গুরুত্ব পায়। ১৬ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে ডেইলি ওয়াদা জানিয়েছে, চ্যানেলটির সিওও ও হেড অব নিউজ শফিক আহমেদকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে অভিযুক্ত হয়ে যেসব সাংবাদিককে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাদের কয়েকজনকে আবার নিউজরুমের গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে আনার পর প্রতিষ্ঠানের ভেতরে উত্তেজনা তৈরি হয়।

ঘটনাটির সব দিকের স্বাধীন যাচাই অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না, ৫ আগস্টের পর যে সম্পাদকীয় পরিবর্তনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তির একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেটি কি আবার ধীরে ধীরে উল্টো দিকে যাচ্ছে? যদি পুরোনো বিতর্কিত মুখগুলো আবার ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন, সেটি কি নিছক কর্মী পুনর্বিন্যাস, নাকি বৃহত্তর সম্পাদকীয় পরিবর্তনের অংশ?

একাত্তর টেলিভিশনের অতীতও এখানে প্রাসঙ্গিক। মিডিয়া সংস্কার কমিশনের অনুসন্ধানভিত্তিক প্রতিবেদনে ডেইলি স্টার লিখেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে সমালোচিত মোজাম্মেল বাবুকে সরিয়ে শফিক আহমেদকে সিওও ও হেড অব নিউজ করা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ আগস্টের পর একাত্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যাপক রদবদল হয়েছিল।

তাই একাত্তরের ঘটনাকে একক কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে মূল প্রশ্নটি হারিয়ে যাবে। এটিকে বরং বড় একটি প্রশ্নের কেস স্টাডি হিসেবে দেখতে হবে: ৫ আগস্টের পর গণমাধ্যমে যে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস ঘটেছিল, তার পরবর্তী ধাপ কী?

আওয়ামী লীগকে ফেরাতে মিডিয়ার যত আয়োজন

রাজনৈতিক পুনর্বাসন সব সময় সরাসরি হয় না। অনেক সময় তার আগে পুনর্বাসিত হয় বয়ান। প্রথমে অতীতের অপরাধকে ধীরে ধীরে আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর বর্তমানের কোনো পক্ষের ভুলকে বড় করে তোলা হয়। তারপর সেই পক্ষকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তারাই দেশের প্রধান বিপদ। একসময় তুলনাটা দাঁড়ায়—‘ওদের চেয়ে আগের শাসনই ভালো ছিল।’

এই প্রক্রিয়ায় কেউ আওয়ামী লীগের পক্ষে একটি শব্দও না বলেও আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিক জায়গা তৈরি করে দিতে পারেন। বরং সরাসরি আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলার চেয়ে এই পদ্ধতি অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। কারণ এখানে দর্শক বা পাঠককে আওয়ামী লীগকে গ্রহণ করতে বলা হয় না; শুধু বর্তমান বিকল্পকে এতটাই অগ্রহণযোগ্য করে তোলা হয় যে পুরোনো ব্যবস্থার প্রতি অনুশোচনা তৈরি হতে পারে।

তাই ‘জুলাইপন্থীরা কী করেছে’—এই প্রশ্নের পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন করতে হবে: তাদের ব্যর্থতা ও অপরাধের প্রচার কি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ফল তৈরি করছে? একইভাবে আওয়ামী লীগের অতীত অপরাধ, জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ড, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কতটা অনুসন্ধান হচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে।

এখানে কোনো পক্ষকে সমালোচনার বাইরে রাখা হচ্ছে না। বরং ঠিক উল্টোটা বলা হচ্ছে—সব পক্ষের জন্য একই মাপকাঠি চাই। জুলাইপন্থীদের অপরাধ থাকলে বিচার হবে। আওয়ামী লীগের অপরাধের বিচারও হবে। বিএনপি, জামায়াত বা অন্য কোনো পক্ষের অপরাধ থাকলেও বিচার হবে। কিন্তু এক পক্ষের অপরাধকে অন্য পক্ষের অপরাধ মুছে ফেলার হাতিয়ার বানানো যাবে না।

মালিকের স্বার্থ যেখানে, নিউজরুমের স্বাধীনতা সেখানেই পরীক্ষায়

বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি সাংবাদিককে নিয়ে নয়, মালিককে নিয়ে। মিডিয়া সংস্কার কমিশন বলেছে, বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর একটি অংশ গণমাধ্যমকে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক অনুযায়ী সম্পাদকীয় নীতিকে প্রভাবিত করেছে। ২০২৬ সালের একটি সাংবাদিকতা সম্মেলনেও মিডিয়া মালিকদের ব্যবসায়িক স্বার্থকে সম্পাদকীয় স্বাধীনতার বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে একজন বড় মিডিয়া মালিক নিজেই স্বীকার করেছেন, নিজের অন্যান্য ব্যবসার কর্মীদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব কখনো কখনো সংবাদ প্রকাশে বাধা তৈরির পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।

তাহলে আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধা পাওয়া কোনো মালিক ৫ আগস্টের পর অবস্থান বদলেছেন কি না, সেটি দেখা কি অন্যায়? তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক কোথায় ছিল? কোন সরকারের সময়ে কী সুবিধা পেয়েছেন? তার মিডিয়ায় ৫ আগস্টের আগে কারা ক্ষমতাশালী ছিলেন? পরে কারা এলেন? সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তার ব্যবসায়িক স্বার্থের কোনো সম্পর্ক আছে কি না? এগুলো রাজনৈতিক অপবাদ নয়; এগুলো মালিকানা ও স্বার্থের সংঘাত যাচাইয়ের প্রশ্ন।

আরও কঠিন প্রশ্ন হলো, কোনো মালিক যদি প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন, কিন্তু তার মিডিয়ার সম্পাদকীয় কাঠামো এমনভাবে পরিচালিত হয় যাতে আওয়ামী লীগের পুরোনো স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তাহলে সেটি কীভাবে শনাক্ত হবে? এর উত্তর সাংবাদিকের রাজনৈতিক পরিচয় তাহলে আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধা পাওয়া কোনো মালিক ৫ আগস্টের পর অবস্থান বদলেছেন কি না, সেটি দেখা কি অন্যায়? তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক কোথায় ছিল? কোন সরকারের সময়ে কী সুবিধা পেয়েছেন? তার মিডিয়ায় ৫ আগস্টের আগে কারা ক্ষমতাশালী ছিলেন? পরে কারা এলেন? সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তার ব্যবসায়িক স্বার্থের কোনো সম্পর্ক আছে কি না? এগুলো রাজনৈতিক অপবাদ নয়; এগুলো মালিকানা ও স্বার্থের সংঘাত যাচাইয়ের প্রশ্ন। দিয়ে পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন হবে মালিকানা, অর্থ, নিয়োগ, সংবাদ নির্বাচন এবং সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করা।

মিডিয়া সংস্কার কমিশনও মালিকানার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন কমানো, মালিকের ব্যবসা ও সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করা এবং স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সুপারিশ করেছে। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কমিশনের প্রধান জানিয়েছিলেন, তাদের শতাধিক সুপারিশের একটিও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। অর্থাৎ সমস্যাটি চিহ্নিত হয়েছে, কিন্তু কাঠামোগত সমাধান এখনো অসম্পূর্ণ।

‘বিএনপিপন্থী’ পরিচয় কি নতুন ঢাল হয়ে উঠছে?

এখানে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি আসে তাদের নিয়ে, যারা ৫ আগস্টের পর নিজেদের বিএনপিপন্থী, বিএনপি-ঘনিষ্ঠ কিংবা আওয়ামী লীগবিরোধী পরিচয়ের কারণে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় উঠে এসেছেন বলে অভিযোগ আছে। মিডিয়া সংস্কার কমিশনের অনুসন্ধানে এমন বহু পরিবর্তনের কথা এসেছে। কালের কণ্ঠ, নিউজ২৪, বাংলানিউজ২৪, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন, ডিবিসি, বৈশাখী টেলিভিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তনের উদাহরণ প্রতিবেদনে এসেছে।

এখানে কাউকে শুধু বিএনপিপন্থী হওয়ার কারণে অভিযুক্ত করার প্রশ্ন নেই। রাজনৈতিক মত থাকা সাংবাদিকের অপরাধ নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক পরিচয় কি পদ পাওয়ার সিঁড়ি হয়েছিল? আর যদি হয়ে থাকে, সেই পদ পাওয়ার পর তিনি কার স্বার্থে কাজ করেছেন?

আরও একটি বিষয় পরীক্ষা করা দরকার। কোনো সাংবাদিক গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার পর তার রিপোর্টিংয়ে কী পরিবর্তন এসেছে? আওয়ামী লীগ আমলের ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তার অবস্থান কী? মালিকপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্বার্থের বিরুদ্ধে তিনি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করেছেন? কোন বিষয় নিয়ে তিনি উচ্চকণ্ঠ এবং কোন বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে নীরব—এই তুলনাটিও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ শুধু প্রকাশিত খবর নয়, নিয়মিতভাবে যে খবরগুলো প্রকাশিত হয় না, সেগুলোও কখনো কখনো সম্পাদকীয় নীতির ইঙ্গিত দেয়। অবশ্যই একটি খবর না থাকা মানেই ষড়যন্ত্র নয়। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে ধারাবাহিক নীরবতা যদি অন্য অনেক ঘটনার নির্বাচিত কভারেজের সঙ্গে মিলে যায়, তখন সেটি অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে।

সাংবাদিকের মুখ সামনে, কলকাঠি কার হাতে?

গণমাধ্যমের রাজনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই সাংবাদিকের নাম বলি। কিন্তু তার পেছনের কাঠামো দেখি না। অথচ একজন সাংবাদিককে নিয়োগ দেন কেউ, পদ দেন কেউ, সম্পাদকীয় ক্ষমতা দেন কেউ, বেতন দেন কেউ এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা থাকে কারও হাতে। ফলে একজন সাংবাদিক কোনো বয়ান তৈরি করছেন কি না, সেটি বোঝার জন্য তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি পুরো কাঠামোটিও দেখা দরকার।

এখানেই ‘মিডিয়ার ভেতরে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের এজেন্ডা চলছে’—এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পথ তৈরি হয়। অভিযোগ সত্য হলে তার প্রমাণ থাকতে হবে। কার সঙ্গে কার যোগাযোগ, কার নিয়োগের পেছনে কার ভূমিকা, কার ব্যবসায়িক স্বার্থ কোথায়, কোন সময়ে সম্পাদকীয় নীতি বদলেছে এবং সেই পরিবর্তনের পর কোন রাজনৈতিক বয়ান শক্তিশালী হয়েছে—এসব তথ্য পাশাপাশি বসাতে হবে। অর্থাৎ তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত মানুষ নয়, নেটওয়ার্ক; পরিচয় নয়, সম্পর্ক; অভিযোগ নয়, প্রমাণ।

কারণ কোনো সাংবাদিককে বিএনপিপন্থী বললেই তিনি মালিকের স্বার্থ রক্ষা করছেন—এমন সিদ্ধান্ত যেমন ভুল, তেমনি কোনো সাংবাদিক নিজেকে বিএনপিপন্থী বা আওয়ামী লীগবিরোধী বললেই তিনি নিরপেক্ষ—এমন ধারণাও সমানভাবে ভুল। একইভাবে আওয়ামী লীগবিরোধী অবস্থানও কাউকে সাংবাদিকতার নৈতিকতার সার্টিফিকেট দেয় না।

সরকারকে এখন কী খুঁজতে হবে?

সরকার যদি সত্যিই গণমাধ্যমকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে চায়, তাহলে সাংবাদিকের দলীয় পরিচয়ের তালিকা করার চেয়ে অনেক গভীরে যেতে হবে।

প্রথমত, ৫ আগস্টের পর কোন কোন গণমাধ্যমে কারা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন, তার পূর্ণ তালিকা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সেই নিয়োগের পেছনে রাজনৈতিক যোগাযোগ বা কোনো পক্ষের সুপারিশ ছিল কি না, তা যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, সংশ্লিষ্ট মিডিয়ার মালিকেরা আওয়ামী লীগ আমলে কী ধরনের ব্যবসায়িক সুবিধা পেয়েছেন এবং তাদের বর্তমান রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক কী, তা খতিয়ে দেখতে হবে। চতুর্থত, মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের কোনো সংঘাত আছে কি না, তা পরীক্ষা করতে হবে। পঞ্চমত, কোনো সাংবাদিক, সম্পাদক বা মালিক যদি কোনো অপরাধে জড়িত থাকেন, তাহলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ ধরনের তদন্তের উদ্দেশ্য কোনো নতুন রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান হওয়া উচিত নয়। কারণ আওয়ামী লীগ আমলে যে ভুল হয়েছে, একই ভুলের নতুন সংস্করণ তৈরি করলে ৫ আগস্টের পরিবর্তনের অর্থই নষ্ট হবে। সাংবাদিককে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শাস্তি দেওয়া যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে রাজনৈতিক বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও থাকা উচিত নয়।

রাষ্ট্রের কাজ তাই হবে একই মানদণ্ডে সবাইকে দেখা। আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ হোক, বিএনপিঘনিষ্ঠ হোক, জামায়াতঘনিষ্ঠ হোক কিংবা জুলাইপন্থী হোক—অপরাধের প্রমাণ থাকলে বিচার হবে, না থাকলে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে হয়রানি করা হবে না।

আসল লড়াই এখন বয়ানের

আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হয়তো আওয়ামী লীগের পক্ষে সরাসরি কথা বলা নয়। বরং এমন একটি বয়ান তৈরি করা, যেখানে আওয়ামী লীগের অতীত ক্রমে ফিকে হয়ে যাবে আর জুলাইপন্থীরাই দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

প্রথমে বলা হবে, জুলাইপন্থীরা অযোগ্য। তারপর বলা হবে, তারা বিপজ্জনক। এরপর তাদের প্রতিটি ভুলকে রাষ্ট্রীয় সংকট হিসেবে হাজির করা হবে। আর একসময় তুলনাটা নিজে থেকেই মানুষের মাথায় ঢুকে যাবে—তাহলে আওয়ামী লীগই কি ভালো ছিল?

এই জায়গাটিই সবচেয়ে সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হবে। কারণ এখানে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার কথা কেউ বলছে না। শুধু আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে থাকা শক্তিকে ধীরে ধীরে অবিশ্বাস্য করে তোলা হচ্ছে। রাজনৈতিক পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে এর চেয়ে কার্যকর কৌশল আর কী হতে পারে?

তাই এখন শুধু সাংবাদিকের মুখ দেখতে হবে না। দেখতে হবে তার পেছনে মালিক কে, মালিকের ব্যবসা কোথায়, রাজনৈতিক যোগাযোগ কোথায়, নিয়োগের ইতিহাস কী, সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত কীভাবে বদলেছে এবং জনগণের সামনে প্রতিদিন কোন বয়ানটি ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ ফিরে আসার আগে হয়তো তার বয়ানই ফিরে আসে। আর সেই বয়ান যদি এমনভাবে ফিরে আসে যে আওয়ামী লীগের চেয়েও ‘বড় শত্রু’ হয়ে ওঠে জুলাইপন্থীরা, তাহলে প্রশ্ন করতেই হবে—এটা কি কেবল সাংবাদিকতা, নাকি আড়ালে চলছে পুরোনো রাজনৈতিক পুনর্বাসনের নতুন আয়োজন?