মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে একটি বিষয় নিয়ে। তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, সৌদি আরব, তুরস্ক বা পাকিস্তানের যেকোনো একটি আক্রান্ত হলেই অন্য দুই দেশকে সরাসরি যুদ্ধে নামতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে নানা আলোচনায় বিষয়টিকে অনেকটা এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেন চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে তিন দেশের মধ্যে একটি যৌথ বাহিনী তৈরি হয়েছে এবং এখন থেকে যেকোনো এক দেশের বিরুদ্ধে হামলা হলেই বাকি দুই দেশ যুদ্ধ শুরু করবে। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা এত সহজ নয়।

চুক্তি স্বাক্ষরের এক মাস না যেতেই ইয়েমেনের হুতিদের হামলায় সৌদি আরব নতুন করে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই হামলার পরই মক্কা চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ প্রথমে বলেছিলেন, সৌদি আরবের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে চুক্তিটি সক্রিয় হতে পারে। তাঁর বক্তব্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয় যে, পরিস্থিতি সামরিক প্রতিক্রিয়ার দিকে যেতে পারে। কিন্তু পরদিনই পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিষ্কার করে জানায়, মক্কা চুক্তির আওতায় কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে এখন পর্যন্ত আলোচনা হয়নি। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ জানায়, প্রয়োজন হলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তারা ভূমিকা রাখবে।

এই দুই বক্তব্যকে পরস্পরবিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে এখানে বরং চুক্তিটির প্রকৃত চরিত্র বোঝার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে কোনো দেশ আক্রান্ত হলেই যে অন্য দেশকে একই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতে হবে, বিষয়টি সব সময় এমন নয়। সামরিক সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আকাশ প্রতিরক্ষা, অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ, প্রশিক্ষণ, কূটনৈতিক সমর্থন কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি সেনা মোতায়েন, সবই প্রতিরক্ষার অংশ হতে পারে। কোন পরিস্থিতিতে কোন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিই আসল প্রশ্ন। মক্কা চুক্তির প্রথম বড় পরীক্ষা তাই যুদ্ধ শুরু করা নয়, বরং সংকটের সময় তিন দেশ নিজেদের প্রতিশ্রুতিকে কীভাবে বাস্তবে রূপ দেয়, সেটি।

এখানে একটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে আলাদা করে দেখা দরকার। প্রতিরক্ষা চুক্তি আর যুদ্ধের চুক্তি এক জিনিস নয়। কোনো দেশের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা তৈরি করা এবং সেই দেশের হয়ে প্রতিটি যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়া এক কথা নয়। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতেও পাকিস্তান একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে, অন্যদিকে সরাসরি সামরিক অভিযানের কোনো সিদ্ধান্তের কথা বলেনি। ফলে মক্কা চুক্তিকে শুধু ‘এক দেশ আক্রান্ত হলে সবাই যুদ্ধে যাবে’ এই সরল সমীকরণে বিচার করলে চুক্তিটির রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব দুটোই আড়ালে পড়ে যাবে।

পাকিস্তানের জন্য সৌদি আরবকে রক্ষা করা আর ইয়েমেনে যুদ্ধ করা এক বিষয় নয়

পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের সামরিক সম্পর্ক বহু পুরোনো। সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনারা দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কাজে যুক্ত। ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পাকিস্তানের জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের প্রতিটি হামলার জবাবে পাকিস্তানি সেনাদের ইয়েমেনে গিয়ে সরাসরি যুদ্ধ করতে হবে। পাকিস্তানের নিজের নিরাপত্তা বাস্তবতা এখানে বড় একটি বিষয়। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, আফগানিস্তান সীমান্তের নিরাপত্তা, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বাস্তবতা এবং অর্থনৈতিক চাপ, সবকিছুর হিসাব ইসলামাবাদকে করতে হবে।

বিশেষ করে ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়া পাকিস্তানের জন্য একটি আলাদা সিদ্ধান্ত। সৌদি আরবকে তার ভূখণ্ড রক্ষায় সহায়তা করা এক বিষয়, আর ইয়েমেনের মাটিতে গিয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা আরেক বিষয়। দুটি বিষয়কে এক করে দেখলে পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থান বোঝা যাবে না। সাম্প্রতিক ঘটনাতেও সেটিই দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তান সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলার নিন্দা করেছে এবং প্রয়োজনে চুক্তি অনুযায়ী ভূমিকা রাখার কথা বলেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরাসরি সামরিক অভিযানের কোনো আলোচনা হয়নি।

তুরস্কের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে দেখা দরকার। গত সপ্তাহেই তুরস্কের সমরবিশারদ মুরাত আসলানের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তাঁর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। তুরস্ক উপসাগরীয় অঞ্চল এবং সৌদি উপকূলে নিজেদের নিরাপত্তা উপস্থিতি বাড়াতে আগ্রহী। কিন্তু রিয়াদ এখনো আঙ্কারাকে সেখানে সেনা পাঠাতে বা হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে যেতে বলছে না। তুরস্ক তার প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সক্ষমতা কিংবা সামরিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সৌদি আরবকে সহায়তা করতে পারে। প্রয়োজন হলে সামরিক উপস্থিতিও বাড়াতে পারে। কিন্তু সেটি কখন, কোথায় এবং কী মাত্রায় হবে, তার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

এর সঙ্গে সৌদি আরব ও তুরস্কের সম্পর্কের আরেকটি মাত্রাও রয়েছে। দুই দেশই মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী। ইতিহাসের নানা পর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার ছাপও রয়েছে। তুরস্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে তার রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বাড়িয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবও নিজেকে আরব ও মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। ফলে সৌদি আরবের মাটিতে তুরস্কের বড় ধরনের স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি রিয়াদের জন্য সবসময় স্বস্তিদায়ক হবে, এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। বরং সৌদি আরবের প্রয়োজন হতে পারে এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামো, যেখানে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সক্ষমতা তার নিরাপত্তার পেছনে থাকবে, কিন্তু তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাটিও অক্ষুণ্ন থাকবে।

সৌদি আরব কেন এই চুক্তি করল?

এখানে সৌদি আরবের দৃষ্টিকোণটিও গুরুত্বপূর্ণ। মক্কা চুক্তিকে শুধু পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সৌদির সামরিক সম্পর্ক হিসেবে দেখলে এর বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সৌদি আরবের বড় ধরনের নির্ভরতা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিয়াদ নিজের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও বহুমুখী করতে চাইছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সরাসরি নিরাপত্তা সম্পর্ক বাড়ানো সেই কৌশলেরই অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা এবং তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সৌদি আরবের জন্য আলাদা মূল্য বহন করে।

সৌদি আরবের জন্য আরেকটি বিষয় হলো প্রতিরোধ সক্ষমতা। একটি সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ যদি জানে যে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা হলে শুধু সৌদি বাহিনীর সঙ্গে নয়, পাকিস্তান ও তুরস্কের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াও হিসাব করতে হবে, তাহলে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাকে নতুন করে ভাবতে হবে। এটাই প্রতিরোধের মূল ধারণা। একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির সাফল্য সবসময় যুদ্ধক্ষেত্রে কতজন সৈন্য পাঠানো হলো, তা দিয়ে মাপা হয় না। অনেক সময় যুদ্ধ না হওয়ার পেছনে যে ভয় বা অনিশ্চয়তা কাজ করে, সেটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য।

এ কারণে মক্কা চুক্তির শক্তি হয়তো তার সামরিক ব্যবহারের চেয়ে রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানে বেশি। তিন দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সামরিক পরিকল্পনা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং সংকটের সময় সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হলে সেটিই ধীরে ধীরে একটি নিরাপত্তা কাঠামোয় রূপ নিতে পারে। ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে মক্কা চুক্তির অধীনে প্রথম কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির বৈঠক হয়েছে। সেখানে সম্মিলিত প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করার বিষয়টি সামনে এসেছে। চুক্তির অধীনে সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু ঘোষণার মধ্যে আটকে নেই, এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও তৈরি হচ্ছে।

তবে এখানেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। সৌদি আরব কি সত্যিই পাকিস্তানি ও তুর্কি সেনাদের বড় আকারে নিজের ভূখণ্ডে দেখতে চায়, নাকি তাদের সামরিক সক্ষমতার রাজনৈতিক ও কৌশলগত ছাতাটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ? বাস্তব পরিস্থিতি হয়তো দ্বিতীয় দিকেই বেশি ইঙ্গিত করছে। কারণ একটি দেশের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য সবসময় সেই দেশের মাটিতে মিত্র দেশের বড় বাহিনী মোতায়েন করতে হয় না। প্রতিপক্ষকে বোঝানো যে প্রয়োজনে একাধিক শক্তি পাশে দাঁড়াবে, সেটিও বড় ধরনের প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক হুতিদের হামলার পর মক্কা চুক্তি নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটিকে তাই এই বৃহত্তর বাস্তবতার মধ্যেই দেখা প্রয়োজন।

চুক্তির আসল পরীক্ষা যুদ্ধ নয়, যুদ্ধ ঠেকানো

মক্কা চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই। একটি প্রতিরক্ষা জোটের সাফল্য কত দ্রুত যুদ্ধ শুরু হলো, সেটি দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। বরং কোনো সম্ভাব্য হামলাকারীকে কতটা নিরুৎসাহিত করা গেল, সংকটের সময় তিন দেশ কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারল এবং নিজেদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে কতটা কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারল, সেটিই বড় বিষয়। মক্কা চুক্তির প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে হুতিদের হামলা তাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে বোঝা যাবে, ‘এক দেশ আক্রান্ত হলে সবাই আক্রান্ত’ কথাটি বাস্তবে কতটা এবং কীভাবে কার্যকর হয়।

এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার। তিনটি দেশের জাতীয় স্বার্থ এক নয়। পাকিস্তানের কাছে ইরান, আফগানিস্তান ও ভারত গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বাস্তবতা। তুরস্কের কাছে সিরিয়া, কুর্দি প্রশ্ন, পূর্ব ভূমধ্যসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার নিজস্ব প্রভাব বিস্তার গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের কাছে উপসাগরীয় নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো, রাজপরিবারের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক নেতৃত্ব বড় বিষয়। ফলে একই চুক্তির অংশ হলেও সংকটের সময় তিন দেশের সিদ্ধান্ত একই হবে, এমনটা ধরে নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।

বরং চুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করবে এই ভিন্ন স্বার্থগুলোকে কতটা সমন্বয় করা যায় তার ওপর। কোনো পরিস্থিতিতে একটি দেশ সামরিক পদক্ষেপ চাইতে পারে, অন্য দেশ কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। কোথাও গোয়েন্দা তথ্যই সবচেয়ে বড় সহায়তা হতে পারে, কোথাও আকাশ প্রতিরক্ষা বা নৌ নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আবার কোনো পরিস্থিতিতে সরাসরি সেনা পাঠানোর প্রয়োজনই নাও হতে পারে। তাই মক্কা চুক্তির অর্থ যদি কেউ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য পাঠানোর হিসাব দিয়ে করেন, তাহলে তিনি আসলে আধুনিক নিরাপত্তা সহযোগিতার বড় একটি অংশকে বাদ দিয়ে ফেলবেন।

হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার পর পাকিস্তানের বক্তব্যও সেই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে। প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর রয়েছে, পাকিস্তান তার প্রতিশ্রুতিতে অটল, কিন্তু তাৎক্ষণিক সামরিক প্রতিক্রিয়ার কোনো আলোচনা হয়নি। এর অর্থ চুক্তিটি অকার্যকর, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার কারণ নেই। বরং এটিই দেখাচ্ছে যে, চুক্তির আওতায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সামরিক প্রস্তুতি এবং বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে একাধিক স্তর থাকতে পারে। ভবিষ্যতে বড় কোনো হামলা হলে সেই স্তরগুলো কীভাবে কাজ করবে, সেটিই হবে প্রকৃত পরীক্ষা।

বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি আরও বড়

বাংলাদেশের জন্য মক্কা চুক্তির বিষয়টি অন্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু ধর্মীয় বা শ্রমবাজারকেন্দ্রিক নয়। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ সৌদি আরবে কাজ করেন। সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। একই সঙ্গে বাণিজ্য, জ্বালানি, বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের দিক থেকেও রিয়াদ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তুরস্কের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে বেড়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক নতুন বাস্তবতায় পুনর্গঠনের আলোচনা রয়েছে। ফলে এই তিন দেশের নিরাপত্তা কাঠামোতে বাংলাদেশকে ঘিরে আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সৌদি নেতৃত্বাধীন একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগের অংশ হয়েছে, যেখানে হুতিদের কার্যক্রমের কারণে লোহিত সাগর, বাব আল মান্দাব ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এই উদ্যোগে বাংলাদেশসহ একাধিক দেশ যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে এক করে দেখা যাবে না। একটি মূলত আন্তর্জাতিক নৌপথ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত, অন্যটি তিন দেশের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কাঠামো। ফলে বাংলাদেশ কোনো একটি উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে বলেই অন্যটির সব ধরনের সামরিক দায়বদ্ধতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের ওপর বর্তাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়।

তবে বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে মক্কা চুক্তির মতো কোনো নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার কথা বিবেচনা করে, তাহলে আবেগের জায়গা থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। প্রথমেই জানতে হবে, বাংলাদেশের দায়িত্ব ঠিক কী হবে। কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে বাংলাদেশকে কী ধরনের সহায়তা দিতে হবে? সামরিক সহায়তা কি বাধ্যতামূলক হবে? নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনী পাঠানোর প্রশ্ন আসবে কি না? গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া, লজিস্টিক সহায়তা কিংবা কূটনৈতিক সমর্থনের বাধ্যবাধকতা থাকবে কি না? কোন ধরনের হামলাকে চুক্তির আওতায় ‘সশস্ত্র হামলা’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে? কোনো পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরাসরি যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানাতে পারবে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট না করে কোনো নিরাপত্তা চুক্তিতে যাওয়া উচিত নয়।

কারণ বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সৌদি আরব, তুরস্ক কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়। বাংলাদেশের প্রধান স্বার্থ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, বৈদেশিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক রয়েছে। তাই কোনো একটি নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ যেন অজান্তেই অন্য কোনো দেশের সংঘাতের অংশ হয়ে না যায়, সেটি নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশের নিজস্ব কৌশলগত স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হবে।

বাংলাদেশের প্রয়োজন যুদ্ধের জোট নয়, নিরাপত্তার অংশীদারত্ব

বাংলাদেশের সামনে তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কোনো জোটে যাচ্ছি কি না, সেটি নয়। বরং সেই জোটে গিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হবে, সেটি। একটি নিরাপত্তা সহযোগিতা যদি বাংলাদেশের কৌশলগত পরিসর বাড়ায়, সমুদ্র ও বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা বাড়ায়, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়ায় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ায়, তাহলে সেটি বিবেচনার মতো বিষয়। কিন্তু কোনো চুক্তি যদি বাংলাদেশকে এমন একটি সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত করে, যার সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি জাতীয় স্বার্থের সম্পর্ক নেই, তাহলে সেখানে অনেক বেশি সতর্কতা প্রয়োজন।

বিশেষ করে মক্কা চুক্তির মতো কোনো কাঠামোতে যুক্ত হওয়ার আগে বাংলাদেশকে বুঝতে হবে, এর রাজনৈতিক এবং সামরিক দায়বদ্ধতা কোথায় গিয়ে শেষ হবে। শুধু বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণে কোনো চুক্তিতে সই করা যায় না। চুক্তির প্রতিটি শব্দ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, সামরিক বাধ্যবাধকতা এবং প্রয়োজনে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ বুঝে নিতে হয়। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আজকের বন্ধুত্ব আগামী দিনের সব পরিস্থিতিতে একই থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। জাতীয় স্বার্থই শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির প্রধান ভিত্তি।

মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এর সাফল্য তখনই হবে, যখন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের ভিন্ন স্বার্থকে সমন্বয় করে একটি বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে পারবে। এমন একটি কাঠামো, যার কারণে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হামলার আগে একাধিকবার হিসাব করবে। যে কাঠামো সংকটের সময় তিন দেশকে দ্রুত যোগাযোগ ও সমন্বয়ের সুযোগ দেবে। আবার একই সঙ্গে কোনো একটি দেশের আঞ্চলিক সংঘাতকে অন্য দুই দেশের ওপর অযথা চাপিয়ে দেবে না। যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু যুদ্ধ ঠেকানোই একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় সাফল্য।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই একই নীতি অনুসরণ করা উচিত। সৌদি আরবের নিরাপত্তা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সৌদি আরবের প্রতিটি যুদ্ধ বাংলাদেশের যুদ্ধ নয়। তুরস্কের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু তুরস্কের প্রতিটি আঞ্চলিক সংঘাত বাংলাদেশের সংঘাত নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হতে পারে, কিন্তু পাকিস্তানের প্রতিটি নিরাপত্তা সংকটেও বাংলাদেশের সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়ার প্রয়োজন নেই। বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও নিরাপত্তা অংশীদারত্বের অর্থ একে অপরের সব যুদ্ধ নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া নয়।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রয়োজন যুদ্ধের জোট নয়, নিরাপত্তার অংশীদারত্ব।

আর মক্কা চুক্তির সবচেয়ে বড় সাফল্যও হবে তখনই, যখন এর কারণে যুদ্ধ শুরু হবে না, বরং যুদ্ধের সম্ভাবনাই কমে আসবে। কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে বাকি দেশগুলো কীভাবে পাশে দাঁড়াবে, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে। একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রকৃত শক্তি কতগুলো যুদ্ধ করেছে, তার মধ্যে নয়; বরং কতগুলো যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই ঠেকাতে পেরেছে, তার মধ্যে।