আগস্টের সেই বিকেলটা ছিল অন্যরকম। একদিকে বাতাসে বারুদের গন্ধ। অন্যদিকে, মানুষের গলায় বিজয়ের স্লোগান। দীর্ঘ লড়াই আর ত্যাগের পর স্বৈরাচারী হাসিনা শাসনের অবসান হয়েছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়েছে চর্তুদিকে। ঢাকার উত্তরার জসীমউদ্দীন রোডে তখন বাঁধভাঙা মানুষের মিছিল। সেই মিছিলের এক পাশে মা-বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল ছয় বছর বয়সী শিশু জাবির ইব্রাহিম। পরনে ছোট্ট প্যান্ট, চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সে চেয়েছিল বড় হয়ে ‘আর্মি’ হবে। কারণ, তার ভাষায় - ‘পুলিশ আমার ভাই-বোনদের গুলি করে মারছে, আমি আর্মি হয়ে তাদের বাঁচাব।’ কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, সেই পুলিশি বুলেটে সেদিনই নিথর হয়ে গিয়েছিল ছোট্ট জাবিরের দেহ। আজ সেই রক্তস্নাত জুলাই-আগস্টের স্মৃতি বয়ে এনেছেন শহীদ জাবিরের মা রোকেয়া বেগম। তবে এবার তিনি আর বিচার চেয়ে রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে নেই। তিনি যাচ্ছেন দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা - জাতীয় সংসদে। জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাদের পরিবারের আর্তনাদ রাষ্ট্রের কানে পৌঁছে দিতে জামায়াতে ইসলামী তাকে সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত করেছে। শহীদ জাবিরের মা রোকেয়া বেগম পেশায় ছিলেন একজন সাধারণ গৃহিণী। তিন সন্তানের জননী এই নারীর পৃথিবী ছিল তার সন্তানদের ঘিরেই। কিন্তু ৫ আগস্টের সেই রক্তাক্ত বিকেল সব বদলে দেয়। উত্তরা পূর্ব থানা থেকে ছোঁড়া পুলিশের একটি গুলি জাবিরের ঊরুতে বিঁধে যায়। বাবার হাত ধরা অবস্থায় রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে শিশু জাবির। ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্তে ভিজে যায় বাবার পাঞ্জাবি। মা রোকেয়া বেগম ছেলেকে কোলে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটেছেন। কিন্তু রক্ত জোগাড় হলেও ‘ক্রস ম্যাচ’ করার যন্ত্র ছিল না কোনো কোনো হাসপাতালে। চিকিৎসকের অবহেলা আর সময়ের অপচয়ে শেষ পর্যন্ত নিভে যায় জাবিরের প্রাণপ্রদীপ। সেই শোকাতুর মা আজ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। জামায়াত সমর্থিত ১১ দলীয় জোটের ১৩টি নারী আসনের মধ্যে রোকেয়া বেগমকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। একক প্রার্থী হওয়ায় তার সংসদ সদস্য হওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। ব্যক্তিগত পরিচয়ে নয়, বরং শহীদ ও আহতদের পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি নিজেকে এই পবিত্র দায়িত্বের যোগ্য মনে করছেন। ৫ আগস্ট বিকেলে যিনি উত্তরার রাস্তায় সন্তানের লাশ নিয়ে হাহাকার করেছেন, কয়েক মাস পরই সেই নারী সংসদে দাঁড়িয়ে জুলাইয়ের লড়াইয়ের ইতিহাস বলবেন। তার এই যাত্রা কোনো রাজনৈতিক বিলাসিতা নয়, বরং রাজপথের রক্তের দায়বদ্ধতা। রোকেয়া বেগম বলেন, “আমি জাবিরকে সবসময় মিস করি। প্রতিটি মুহূর্তেই তাকে অনুভব করি। ঘরে ঢুকি বা বের হই—সবসময়ই তার কথা মনে পড়ে। এই মনোনয়ন আমার জন্য ব্যক্তিগত কোনো প্রাপ্তি নয়, এটি একটি পবিত্র আমানত। আমার লক্ষ্য থাকবে শহীদ পরিবার ও আহতদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের ন্যায্য চাওয়া-পাওয়াগুলো সংসদে তুলে ধরা।” জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে জামায়াতে ইসলামী শহীদ পরিবারগুলোর পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শহীদ জাবিরের মাকে সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত করা সেই প্রতিশ্রুতিরই একটি বাস্তব প্রতিফলন। সাধারণত সংরক্ষিত নারী আসনগুলোতে দলের সিনিয়র নেত্রীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু জামায়াত তাদের সেই ঐতিহ্যবাহী পথে না হেঁটে সাধারণ এক শহীদের মাকে বেছে নিয়েছে। জামায়াত জোটের ১৩টি আসনের মধ্যে ১২টি তাদের পাওয়ার কথা ছিল। তবে তারা জোট শরিক এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং জাগপাকে একটি করে আসন ছেড়ে দিয়ে রাজনৈতিক উদারতার পরিচয় দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তারা বোঝাতে চেয়েছে যে, ক্ষমতার চেয়ে রাজপথের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জাবিরের মাকে মনোনয়ন দিয়ে তারা জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটকে সংসদের ভেতরে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ সোমবার সন্ধ্যায় যে তালিকা প্রকাশ করেছেন, সেখানে দেখা যায় পেশাদার রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি শহীদ পরিবারের প্রতিনিধি এবং নারী অধিকার কর্মীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মনোনীতদের তালিকায় রয়েছেন প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ, যিনি নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী এবং ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তালিকায় রয়েছে নূরুন্নিসা সিদ্দীকা ও মারজিয়া বেগমের মতো জামায়াতের মহিলা বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের নেত্রী। একই সাথে রয়েছে ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান, যিনি জাগপার চেয়ারম্যান এবং রাশেদ প্রধানের বোন। রয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নারী মজলিসের সদস্য প্রকৌশলী মাহবুবা হাকিম। এই মনোনয়ন তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জামায়াত তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের পাশাপাশি এমন ব্যক্তিদের সুযোগ দিচ্ছে যারা সরাসরি জুলাই আন্দোলনের আবেগের সাথে যুক্ত। এনসিপি’র মাহমুদা আলম মিতু এবং মনিরা শারমিনকেও এই জোটে আসন দেওয়া হয়েছে, যা জোটের ঐক্যকে সুসংহত করার একটি প্রয়াস। মনোনীত হওয়ার পর শহীদ জাবিরের মা রোকেয়া বেগম এক সাক্ষাৎকারে তার ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তার প্রধান লক্ষ্য তিনটি- ১. বিচারের দাবি: জুলাই হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা এবং দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা। ২. আহতদের চিকিৎসা: যারা রাজপথে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন বা চিকিৎসাধীন আছেন, তাদের সুস্বাস্থ্য ও উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। ৩. পুনর্বাসন: শহীদ পরিবারগুলোর স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা এবং জুলাই যোদ্ধাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, “জনগণের রায়কে যারা অস্বীকার করছে, তারা আসলে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনছে। জুলাইয়ের এই অভ্যুত্থান জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন, আর আমি সেই ইচ্ছারই একজন প্রতিনিধি।” শহীদ জাবির ইব্রাহিম আর ফিরে আসবে না। তার পড়ার টেবিল, তার খেলনা গাড়ি আর তার সেই ছোট্ট হেলমেটটি আজও তার স্মৃতি বহন করছে। কিন্তু জাবিরের মা যখন সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন, তখন সেই কণ্ঠস্বর হবে হাজারো জাবিরের মায়ের কণ্ঠস্বর। জুলাইয়ের রাজপথ যে পরিবর্তন এনেছিল, সেই পরিবর্তনের মশাল এখন রোকেয়া বেগমের হাতে। জামায়াতে ইসলামীর এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন নজির স্থাপন করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ কেবল স্মৃতিচারণের বিষয় নয়, বরং তা নীতি নির্ধারণী পর্যায়েও ভূমিকা রাখতে পারে। জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এর চেয়ে বড় উপায় আর কী হতে পারতো? একটি শিশু যে ন্যায়বিচার আর নিরাপত্তা চেয়ে ‘আর্মি’ হতে চেয়েছিল, তার মা আজ সেই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক হয়ে তার স্বপ্ন পূরণের পথে হাঁটছেন। শোক এখন শক্তিতে পরিণত হয়েছে, আর সেই শক্তির কেন্দ্রস্থল হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। টিআই/