পাক্কা দুই মাস হতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের। এরই মধ্যে নানা ইস্যুতে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক বোঝাপড়ার হিসেব-নিকাশ কতটা এগুলো তা নিয়েও আলোচনা সামনে আনা জরুরি। তারেক রহমান যেদিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন, সেদিন শুভেচ্ছা জানাতে উড়ে এসেছিলেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। ভারতীয় গণমাধ্যমে উচ্ছসিত আবেগ লক্ষ করা গেছে এই দুই মাসে। নানা বয়ানে শোনা গেছে, বরফ গলার আশাবাদ। সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নানা গালভরা কথা। এরই মধ্যে বৈশ্বিক তেল সংকট ও যুদ্ধপরিস্থিতির মধ্যে ভারত থেকে জ্বলানি তেলের চালান আসায় অনেকে উচ্ছসিত, আপ্লুত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত ৯ এপ্রিল-১২ এপ্রিল সময়কালে ভারত সফর করেছেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকর, নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালসহ নানা শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ভারতে বাংলাদেশীদের জন্য যোগাযোগ ও ভিসা প্রক্রিয়া পুনঃরায় সহজ হবে এমন আশ্বাস নিয়ে এসে সরকারের মুখপাত্র দাবি করেছেন ব্যাপক সফল সফরের কথাও। আবার এই দুই মাসেই সামনে এসেছে কয়েকটি হতাশার খবর। যেদিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি গিয়েছেন, সেদিনও লালমনিরহাট সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর গুলিতে বাংলাদেশের এক ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে। কী ভয়ঙ্কর কথা। শুধু তাই নয়, এই সপ্তাহেই, ৬ এপ্রিল ভারতীয় গণমাধ্যমে আলোড়ন করেছে আরেকটি বিষয়: সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়েই। বড্ড গা শিউরে ওঠার মতো সে খবর। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নির্দেশ দিয়েছেন কর্মকর্তাদেরকে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বিষাক্ত ও ভয়ঙ্কর সরীসৃপ ছাড়ার কথা ভাবছে তারা। সাপ ও কুমিরের মতো প্রাণী সীমান্ত অঞ্চলে অবমুক্ত করা যায় কিনা তা নি যাচাই বাছাই করতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশের দুই একজন ইউটিউবার ছাড়া বিষয়টি নিয়ে কোনো আওয়াজ নেই। সবকিছু যেন খুবই শান্ত ও স্বাভাবিক। অথচ বিষয়টি শুনলে যাদের বাড়ি সীমান্তের আশে-পাশে তাদের পিলে চমকে যাওয়ার কথা। ভারতে - বাংলাদেশের মধ্যকার ৪০৯৬ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ৩৩২৬ কিলোমিটার এলাকায় স্থলভূমি। এই সীমান্তে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কাটাতারের বেড়া দিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে ২৯৫৪ কিলোমিটারের বেড়া দেওয়া হয়েছে, ৩১৭ কিলোমিটার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অবশিষ্ট প্রায় ৭০০ কিলোমিটার সীমান্ত আছে যা, নদী, খাল বা জলাশয়ের। কিছু অংশ আছে জঙ্গলের মধ্যে। এসব যায়গা থেকেও ‘অনুপ্রবেশ ও চোরাচালানে’ পথ দেখেন ভারতের পণ্ডিতরা। তাই তারা এই সব জলাশয়ে সাপ ও কুমির ছাড়তে চান। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে আলোচনা কম হলেও, ভারতীয় গণমাধ্যমের এ সংক্রান্ত নিউজের নিচে ব্যাপক সমালোচনা করছেন ভারতীয়রাই। তাদেরই একজনের মন্তব্য, “সাপ বা কুমির না পাঠিয়ে রাজনীতিবিদদেরই পাঠানো হোক, সাপের চেয়েও বেশি বিষ তাদের মুখে।” আরেক জন সোজা বলেছেন, এটা ব্যাক ফায়ার করবে। বিএসএফ সদস্যরাই সবচেয়ে বেশি সাপের দংশন আর কুমিরের আক্রমণের শিকার হবে! আরেকজনের মন্তব্য, সাপ আর কুমির কি বাংলাদেশী বা ভারতীয় নাগরিক দেখে-শুনে কামড়াবে? তবে আরও বড় যে প্রশ্নটি সামনে আনা দরকার তা হলো, যে ব্যক্তির মাথা থেকে এই ভাবনা এসেছে, তিনি এই সীমান্তের দুই প্রান্তের মানুষের জীবন, নিরাপত্তা আর জীব-বৈচিত্র্য সম্পর্কে কোনো অনুধাবনই করেননি। এরই মধ্যে এ বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় পক্ষে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য বলা হয়েছে। নতুন সরকারের দুই মাসের মধ্যেই এটি নতুন করে বিরাট প্রসঙ্গ হিসেবে সামনে রাখা উচিত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরের এই প্রশ্নে চুপ থাকার নীতি বাদ দিয়ে শক্ত প্রতিক্রিয়া জানানো দরকার। মনে রাখা দরকার, ভারতীয় নদী ও জলাশয়গুলোর ভাটিতে অবস্থান বাংলাদেশের। ফলে এসব জলাশয়ের সাপ ও কুমিরের প্রজনন হলে তা বিনা বাধায় বাংলাদেশের নদীবহুল জনবসতিকে নিরাপত্তার ঝুঁকিতে ফেলবে। সবচেয়ে বড় শঙ্কার বিষয় হলো, সীমান্তে গুলি করে কাউকে হত্যা করলে, তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে ভারতকে দায়ী করা যায়। আন্তর্জাতিক মহল, ভারতীয় বাহিনীর এই অভ্যাসের কারণে, ‘ট্রিগার হ্যাপি’ বাহিনী হিসেবে চিহ্নিত করেছে, ভবিষ্যতেও করতে পারে। কিন্তু সাপ-কুমিরের আক্রমণের মাধ্যমে নীরিহ মানুষের মৃত্যু হলে ভারত সেটাকে প্রকৃতির ওপর দায় চাপিয়ে নিজেরা প্রশ্নের উর্ধ্বে থাকতে পারবে। কাজেই এ বিষয়টি নিয়ে আগে থেকেই কূটনৈতিক এবং অন্যান্য চ্যানেলে প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া জানানো জরুরি। সরকারের দুই মাসের কূটনৈতিক বোঝাপড়ায়, পুরোনো ইস্যুগুলো অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তিস্তাসহ পানির হিস্যা ও পলাতক হাসিনার প্রত্যাবাসনের প্রশ্ন নিয়ে সরকারকে এখন অবধি ধীরে চলো নীতিতেই সন্তুষ্ঠ বলে মনে হচ্ছে। সামনে এই তৎপরতা কোন দিকে মোড় নেয়, তার দিনে নজর থাকবে পুরো বাংলাদেশের।