দিনভর সালমান মুক্তাদিরকে নিয়ে যে বাহাস চলেছে, তার সারমর্ম করলে দাঁড়ায়, ছেলে বাসের তলায় পড়ে মরলেও চোখটা অন্তত রক্ষা পেয়েছে। রাজধানীর বুকে রাতের অন্ধকারে অস্ত্রধারীদের হামলা, গুলি, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা নিয়েও যেন স্বস্তির জায়গা খোঁজা হচ্ছে এই বলে যে, ঘটনাটি চাঁদাবাজি ছিল না। কিন্তু চাঁদাবাজি না হলে কি রাষ্ট্রের দায় শেষ হয়ে যায়? নাকি প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে দাঁড়ায়, রাজধানীর বুকে এমন একটি ঘটনা ঘটলই বা কীভাবে?

রাতের বেলায় খোদ রাজধানীতে ২০০ থেকে ২৫০ লোক অস্ত্র নিয়ে গুলি ফুটিয়েছে। একটি আবাসন প্রকল্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেদার ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলি হয়েছে। সেখানে কাজ করা অন্তত ৫০ জন শ্রমিকের মোবাইল, মজুরির টাকা-পয়সাসহ বিভিন্ন জিনিস লুট হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ এসবের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে একটি প্রশ্ন, ঘটনাটি চাঁদাবাজি ছিল কি না।

আর যখন বলা হচ্ছে, এটি চাঁদাবাজি ছিল না, তখন যেন সরকারের ইজ্জতও বেঁচে যাচ্ছে। বরং সালমান মুক্তাদিরের ঘটনাকে বিএনপির চাঁদাবাজি বলে মিথ্যা অভিযোগ করে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে, এমন একটি বয়ানও তৈরি হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চাঁদাবাজি না হলে কি রাষ্ট্রের দায় শেষ হয়ে যায়?

রাজধানীর একটি এলাকায়, তাও আবার সেনানিবাস লাগোয়া জায়গায়, রাতের বেলায় সংঘবদ্ধ অপরাধীরা অস্ত্র নিয়ে গোলাগুলি করে লুটপাট করলে সরকারের ব্যর্থতার প্রশ্ন উঠবেই। তারা গলায় গামছা লাগিয়ে মারছে, নাকি ফুলের মালা দিয়ে মারছে, সেই পার্থক্য করে রাষ্ট্রের দায় এড়ানো যায় না।

রাত ১১টার পর ফেসবুকে আসি বলে দিনের অনেক ঘটনা মিস করি। শেষ ঘণ্টাখানেকের আলোচনায় যা বুঝলাম, তাতে ন্যারেটিভ নির্মাতাদের মূল যুক্তি হলো, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও একজন ভূমিদস্যুর দখল করা জমিতে ছিল। সেই বেদখল জমি প্রকৃত মালিকের ভাড়াটে লোকজন অস্ত্র নিয়ে দখলে নিতে গিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। সুতরাং এতে সরকারের মানহানি হয়নি। বরং চাঁদাবাজির অভিযোগ করায় সরকারের সম্মানহানি হয়েছে।

এই যুক্তি মেনে নিলেও সরকারের দায় কোথায় শেষ হয়?

ধরা যাক, যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুতার অভিযোগ উঠছে, তিনি সত্যিই অন্যের জমি দখল করে রেখেছিলেন। তাহলে সরকার আইন-কানুন থাকা সত্ত্বেও একজন ভূমিদস্যু কীভাবে রাজধানীর বুকে আরেকজনের জমি বেদখল করে রাখলেন? এত দিন তিনি সেখানে দখল করে থাকলেন কীভাবে? এতে কি সরকারের ইজ্জত থাকে?

আইন আছে, প্রশাসন আছে, পুলিশ আছে, ভূমি অফিস আছে। রাজধানীর উন্নয়ন ও নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের জন্য রাজউক আছে। নাগরিক সেবা দেওয়ার জন্য সিটি করপোরেশন আছে। এতগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠান থাকার পর একজন ব্যক্তি কীভাবে অন্যের জমি দখল করে সেখানে স্থাপনা তৈরি করে বছরের পর বছর সেটি ব্যবহার করতে পারেন, সেটিও তো প্রশ্ন।

রাজউক, সিটি করপোরেশনের মতো সরকারি সংস্থা থাকতে সেই দখল করা জমিতে কীভাবে স্থাপনা নির্মাণ করা হলো? সেই স্থাপনা কীভাবে ভাড়া দেওয়া হলো? একজন ব্যক্তি যদি অন্যের জমি দখল করে সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করেন এবং সেই স্থাপনা ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না কেন?

সালমান মুক্তাদির সেখানে অফিস ভাড়া নিয়েছেন, সেটি যদি সত্য হয়, তাহলে তিনি কীভাবে জায়গাটি ভাড়া পেলেন, স্থাপনাটি বৈধ ছিল কি না, জমির মালিকানা নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল কি না, সেসবও তদন্তের বিষয় হতে পারে। কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রাষ্ট্রের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকাতে হবে।

ডিপিডিসি, ওয়াসার মতো সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সেবাদানকারী সংস্থা কীভাবে ওই স্থাপনায় বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দিল? স্থাপনাটি যদি অবৈধভাবে নির্মিত হয়ে থাকে, তাহলে সংযোগ দেওয়ার সময় কী যাচাই হয়েছিল? জমি যদি দখল করা হয়ে থাকে, তাহলে দখলদার সেখানে বৈধ নাগরিক সুবিধা পেলেন কীভাবে? এতে কি সরকারের ইজ্জত থাকে?

অর্থাৎ, একজনকে ভূমিদস্যু বললেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং তখন রাষ্ট্রের সামনে আরও কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়। একজন ভূমিদস্যু যদি সত্যিই বছরের পর বছর রাজধানীর বুকে অন্যের জমি দখল করে রাখতে পারেন, তাহলে তাকে এত দিন ঠেকানো গেল না কেন? আর যদি ঠেকানো না যায়, তাহলে রাষ্ট্রের নজরদারি ব্যবস্থা কোথায় ছিল?

আবার অন্য দিকটিও দেখা দরকার। যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেকে ওই জমির প্রকৃত মালিক বলে দাবি করছে, তারা যদি সত্যিই জমির মালিক হয়ে থাকে, তাহলে আইন-আদালতের পথ বাদ দিয়ে অস্ত্রধারী লোকজন নিয়ে রাতে জমি দখল করতে যাওয়ার কারণ কী?

জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে আদালত আছে। প্রশাসন আছে। পুলিশ আছে। আইন আছে। একজন প্রকৃত মালিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এসব প্রতিষ্ঠানই তো থাকার কথা। তাহলে আইন রেখে অস্ত্রধারী লোকজন নিয়ে জমি দখল করতে গেলে সেটি কীভাবে বৈধ হয়ে যায়?

যিনি জমির প্রকৃত মালিক বলে দাবি করছেন, তিনি যদি সত্যিই মালিক হন, তাহলে তার দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য আইনগত পথই তো সবচেয়ে শক্তিশালী পথ। আদালতকে পাশ কাটিয়ে অস্ত্রের পথ বেছে নেওয়ার অর্থ হলো, আইনের প্রতি আস্থার জায়গায় শক্তির ওপর নির্ভর করা। সেটিও কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য স্বাভাবিক পরিস্থিতি হতে পারে না।

বরং তখন প্রশ্ন আরও গুরুতর হয়। রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা না রেখে একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি নিজের হাতে আইন তুলে নেয়, তাহলে সেটিও সরকারের জন্য স্বস্তির বিষয় হওয়ার কথা নয়।

আর দখল নিতে গিয়ে যদি গুলি করে লোকজন ঢোকে, ভাঙচুর করে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাণ্ডব চালায় এবং সেখানে কাজ করা শ্রমিকদের মোবাইল, মজুরির টাকা-পয়সাসহ বিভিন্ন জিনিস নিয়ে যায়, তাহলে সেটি যে নামেই ডাকা হোক, অপরাধ তো অপরাধই।

চাঁদাবাজি না হলে কি গুলি করা বৈধ হয়ে যায়? জমি দখল করতে গেলে কি ভাঙচুর বৈধ হয়ে যায়? নিজেকে প্রকৃত মালিক দাবি করলেই কি অস্ত্রধারী লোকজন নিয়ে অন্যের স্থাপনায় ঢুকে লুটপাট করার অধিকার তৈরি হয়? অবশ্যই নয়।তাহলে আলোচনার মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, কারা অস্ত্র নিয়ে সেখানে গেল? কারা গুলি করল? কারা ভাঙচুর করল? কারা লুটপাট করল? তাদের পাঠাল কে? তাদের পেছনে কারা আছে? জমির মালিকানা কী? স্থাপনাটি বৈধ না অবৈধ? আর এত দিন ধরে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো কী করেছে?

কিন্তু আমাদের আলোচনার বড় অংশ চলে যাচ্ছে অন্যদিকে। সালমান মুক্তাদির কাকে চেনেন? কার সঙ্গে তার ছবি আছে? তিনি কোথায় অফিস নিয়েছেন? কথিত ভূমিদস্যুর জমিতে কেন অফিস ভাড়া নিয়েছেন? তার স্টুডিওতে মদের বোতল কেন ছিল? অর্থাৎ অপরাধের তদন্তের বদলে যেন চরিত্রের তদন্ত চলছে।

সালমান মুক্তাদিরের ব্যক্তিগত জীবন, তার পরিচিতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ড বা তার অফিস কোথায় ছিল, এসব নিয়ে মানুষের প্রশ্ন থাকতে পারে। এসবের কোনোটি সত্য হলে তার ব্যাখ্যাও তিনি দেবেন। কিন্তু একটি ঘটনার তদন্তের ক্ষেত্রে ব্যক্তির চরিত্রকে সামনে এনে মূল অপরাধের প্রশ্নটিকে আড়াল করা কোনো সমাধান নয়।

একজন ব্যক্তি ভালো না মন্দ, তিনি কাকে চেনেন, কার সঙ্গে ছবি তুলেছেন, কী পান করেছেন, কোথায় অফিস নিয়েছেন, এসব নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু এসব কোনোভাবেই রাজধানীর বুকে অস্ত্র নিয়ে হামলা, গুলি, ভাঙচুর ও লুটপাটের বৈধতা তৈরি করে না।

একইভাবে, কোনো ব্যক্তি ভূমিদস্যু কি না, সেটিও ফেসবুকের পোস্ট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বয়ান দিয়ে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না। জমির কাগজ দেখতে হবে। মালিকানা দেখতে হবে। দখলের ইতিহাস দেখতে হবে। স্থাপনার অনুমোদন দেখতে হবে। বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ কীভাবে দেওয়া হয়েছে, সেটিও দেখতে হবে।

তারপর যার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ সত্য, সেটি তদন্তে বের হয়ে আসবে। এখানেই সরকারের আসল দায়িত্ব।

সমাজে অপরাধ ঘটবেই। পৃথিবীর কোনো সরকারই সব অপরাধ শতভাগ ঠেকাতে পারবে না। অপরাধ একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনা কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব নয়। কিন্তু অপরাধ ঘটলে সরকারের দায়িত্ব হলো ব্যবস্থা নেওয়া, প্রতিকার করা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা। একটি রাষ্ট্রের শক্তি এই জায়গাতেই।

অপরাধ ঘটেনি, এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা সব সময় সম্ভব নয়। কিন্তু অপরাধ ঘটার পর রাষ্ট্র কী করছে, সেটিই মানুষের কাছে সরকারের সক্ষমতার বড় পরীক্ষা। গত রাতের ঘটনায় যদি অস্ত্রধারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হতো, যারা গুলি করেছে তাদের গ্রেপ্তার করা হতো, ভাঙচুর ও লুটপাটে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হতো এবং তাদের পাঠানো বা নির্দেশদাতা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে সরকারের ইজ্জত বাড়ত।

জমিটি যদি অবৈধভাবে দখল করা হয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত করে সেটি উদ্ধার করা হলে সরকারের সম্মান বাড়ত। স্থাপনাটি অবৈধ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে সরকারের সম্মান বাড়ত। কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা সংস্থা অবৈধ দখল বা স্থাপনা নির্মাণে সহযোগিতা করে থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়ত।

অর্থাৎ সরকারের সামনে পথটি খুব কঠিন কিছু ছিল না। অপরাধীদের ধরতে হবে, জমির মালিকানা যাচাই করতে হবে, স্থাপনার বৈধতা দেখতে হবে এবং সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে। তদন্তের ফল যেদিকে যাবে, ব্যবস্থা সেদিকেই যাবে।

আর যদি তদন্তে প্রমাণিত হতো যে সালমান মুক্তাদিরের করা চাঁদাবাজির অভিযোগ মিথ্যা, তাহলে সেটিও স্পষ্ট হয়ে যেত। তখন কাউকে আলাদা করে ন্যারেটিভ বানিয়ে হেয় করার প্রয়োজন পড়ত না।

সালমান মুক্তাদিরের ছবি দেখিয়ে, মদের বোতলের ছবি দেখিয়ে, তিনি কথিত ভূমিদস্যুর জমিতে কেন অফিস ভাড়া নিয়েছেন, সেই প্রশ্ন তুলে তাকে জনমানসে বিতর্কিত করার চেষ্টাও করতে হতো না। বরং সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিলে জনমানসে চাঁদাবাজির অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, সেটি নিয়ে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হতো। অভিযোগ মিথ্যা হলে সালমানের বক্তব্যই দুর্বল হয়ে যেত। তাকে তখন নিজের অবস্থানের ব্যাখ্যা দিতে হতো। জনচাপ তৈরি হলে তার অবস্থান পরিবর্তনও হতে পারত।

এটাই স্বাভাবিকভাবে ন্যারেটিভ তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া। কিন্তু কোনো ঘটনা ঘটার পর অপরাধীদের ধরার বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা গল্প তৈরি করা ন্যারেটিভ বিল্ডিং হতে পারে, রাষ্ট্র পরিচালনা নয়। কারণ রাষ্ট্রের কাজ কোনো ব্যক্তির ভাবমূর্তি রক্ষা করা নয়। আবার কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করাও রাষ্ট্রের কাজ নয়। রাষ্ট্রের কাজ হলো, ঘটনা কীভাবে ঘটেছে তা বের করা এবং আইনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া।

সরকারের ইজ্জত কোনো একটি পক্ষের বক্তব্য জিতে যাওয়ার মধ্যে নেই। সরকারের ইজ্জত হলো, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তার পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান না দেখে তাকে আইনের আওতায় আনা। সরকারের ইজ্জত হলো, রাজধানীর বুকে কেউ অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ালে তাকে আটক করা।

সরকারের ইজ্জত হলো, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে সেটি আদালত ও আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা। সরকারের ইজ্জত হলো, একজন ভূমিদস্যু বছরের পর বছর অন্যের জমি দখল করে বসে থাকতে না পারা। সরকারের ইজ্জত হলো, অবৈধ স্থাপনা সরকারি সেবার সুযোগ না পাওয়া। সরকারের ইজ্জত হলো, কোনো নাগরিকের ওপর হামলা হলে অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা। আর সবচেয়ে বড় কথা, সরকারের ইজ্জত হলো, রাষ্ট্রের চোখের সামনে কেউ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পার পেয়ে না যাওয়া।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। কোনো সরকারই সমাজের সব অপরাধ আগেভাগে ঠেকাতে পারে না। কিন্তু অপরাধের পর রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া যদি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান হয়, তাহলে মানুষের আস্থা তৈরি হয়। অপরাধী যে পক্ষেরই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে সেটিই সরকারের শক্তি হিসেবে দেখা হয়।

অন্যদিকে, অপরাধের পর যদি মূল ঘটনা বাদ দিয়ে কে কার লোক, কে কোথায় অফিস নিয়েছে, কার সঙ্গে কার ছবি আছে, কে কী পান করেছেন, কে কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, এসব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়, তাহলে আসল প্রশ্নটি আড়ালে চলে যায়।

সালমান মুক্তাদির চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন কি না, তিনি সত্য বলেছেন কি না, তিনি কোথায় অফিস নিয়েছেন, কার সঙ্গে তার ছবি আছে, এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে বের হোক।

যে জমি নিয়ে এত কথা হচ্ছে, সেই জমির প্রকৃত মালিক কে, সেটিও তদন্তে বের হোক। কথিত ভূমিদস্যু কে, সেটিও তদন্তে আসুক। জমিটি কখন দখল হয়েছে, কীভাবে স্থাপনা তৈরি হয়েছে, কীভাবে সেখানে ব্যবসা চলেছে, কীভাবে বিদ্যুৎ-পানি সংযোগ দেওয়া হয়েছে, সেসবও খতিয়ে দেখা হোক। ভূমিদস্যু কে, তারও তদন্ত হোক। জমির প্রকৃত মালিক কে, সেটিও বের হোক। কিন্তু গুলি, ভাঙচুর, লুটপাট এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগের বিচারও একই সঙ্গে হতে হবে।রাষ্ট্রের কাজ কোনো পক্ষের ন্যারেটিভ জেতানো নয়। রাষ্ট্রের কাজ সত্য বের করা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

কারণ একটি সরকারের ভাবমূর্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তর্কে কে জিতল, তার ওপর নির্ভর করে না। সরকারের ভাবমূর্তি তৈরি হয় রাষ্ট্রের কার্যকর উপস্থিতিতে। মানুষ যখন দেখে অপরাধীকে ধরা হচ্ছে, অবৈধ দখল উচ্ছেদ হচ্ছে, সরকারি সংস্থার অনিয়মেরও বিচার হচ্ছে এবং রাজনৈতিক পরিচয় দেখে কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না, তখনই রাষ্ট্রের ওপর আস্থা তৈরি হয়।

সুতরাং সালমান মুক্তাদিরের অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, সেটি তদন্তের বিষয়। জমির মালিকানা কার, সেটিও তদন্তের বিষয়। কথিত ভূমিদস্যু কে, সেটিও তদন্তের বিষয়। কিন্তু এই তদন্তের ফল যা-ই হোক, রাজধানীর বুকে অস্ত্রধারীদের তাণ্ডবের প্রশ্নটি তার বাইরে থাকবে।

কারণ চাঁদাবাজি না হলেও অপরাধ অপরাধই।ভূমিদস্যুতা থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বৈধ নয়। জমির মালিকানা থাকলেও অস্ত্র নিয়ে দখল নিতে যাওয়া বৈধ নয়। আর কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হলেও তার বিরু সুতরাং সালমান মুক্তাদিরের অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, সেটি তদন্তের বিষয়। জমির মালিকানা কার, সেটিও তদন্তের বিষয়। কথিত ভূমিদস্যু কে, সেটিও তদন্তের বিষয়। কিন্তু এই তদন্তের ফল যা-ই হোক, রাজধানীর বুকে অস্ত্রধারীদের তাণ্ডবের প্রশ্নটি তার বাইরে থাকবে। শদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে সেটির বিচার আইনেই হতে হবে।

শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটা সালমান মুক্তাদিরের চোখ বাঁচল কি না, সেটি নয়। প্রশ্নটা হলো, রাষ্ট্র তার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনার দিকে তাকাচ্ছে কি না। আর যদি তাকায়, তাহলে অপরাধী যে পক্ষেরই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস ও সক্ষমতা রাষ্ট্র দেখাতে পারছে কি না। কারণ ন্যারেটিভ দিয়ে হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্কে সাময়িকভাবে একটি পক্ষকে জেতানো যায়। কিন্তু রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ঢেকে রাখা যায় না।

চাঁদাবাজি হয়েছিল কি না, তার উত্তর তদন্ত দেবে। জমি কার, সেটিও তদন্ত বলবে। ভূমিদস্যু কে, সেটিও তদন্তে বের হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের সামনে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, রাজধানীর বুকে অস্ত্রধারীরা কীভাবে এমন তাণ্ডব চালানোর সুযোগ পেল এবং তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো। সেখানেই সরকারের আসল পরীক্ষা। সেখানেই রাষ্ট্রের চোখ খোলা আছে কি না, তার উত্তর মিলবে।