কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নিরিবিলি জঙ্গলটা সাধারণত অন্যরকম শান্ত থাকে। সেখানে লাল মাটির সোঁদা গন্ধ ভেসে বেড়ায় বাতাসে। কিন্তু সেই জঙ্গলে ১৩ বছরের শিশু অপ্রতিমের লাশ যখন পড়ে রইল, তখন চারপাশের বাতাসটাও যেন ভারী হয়ে উঠল। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। হাতে বই কিংবা খেলার ব্যাট থাকার বয়সে, মায়ের আইফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টার প্রতিবাদ করায় তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে সেই ফোনও নিয়ে যায় হত্যায় জড়িতরা। পুলিশের তদন্তে আরও উঠে এসেছে, অপ্রতিমের সঙ্গে তার চেয়ে বয়সে বড় কয়েকজন তরুণের যোগাযোগ ছিল এবং টিকটক ভিডিও বানানোর কথা বলেও তাকে বাইরে ডেকে নেওয়া হয়েছিল।
অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উঠতি বয়সী বখাটেদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁর ছিল। অথচ শেষ পর্যন্ত সেই কিশোর অপরাধেরই নির্মম শিকার হতে হলো তাঁর নিজের সন্তানকে। অপ্রতিমের এই করুণ মৃত্যু পুরো দেশকে থমকে দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই জেগেছি, নাকি আগের মতোই ক্ষণিক সময়ের জন্য চমকে উঠে আবার অতল ঘুমে তলিয়ে যাব?
আমাদের সমাজের স্মৃতিশক্তি ভারী অদ্ভুত। এটাকে একটা রোগ বলা যায়, এক ধরনের যৌথ ডিমেনশিয়া। কোনো নির্মম ঘটনা ঘটলে আমরা কয়েক দিন ফেসবুকের দেয়াল ভাসিয়ে ফেলি, টকশো আর চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা কাপ হাতে ঝড় তুলি। তারপর নতুন কোনো খবর এলে পুরনো রক্ত শুকিয়ে যায়, আমরাও সব ভুলে যাই। কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব তো আজকের নয়। এটা হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়েনি। বহু দিন ধরে পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে এই বিষবৃক্ষ শিকড় চালিয়েছে। কুমিল্লাতেই সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে অন্তত ২০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে এসব চক্রের সদস্যদের নাম অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধের ঘটনায় এসেছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম অন্তত ১২টি হত্যা মামলায় এসেছে।
যখন কোনো অপ্রতিম খুন হয়, তখন চারদিকে হাঁকডাক ওঠে। কিন্তু কিছুদিন বাদে আলোচনার পারদ যেই নামতে শুরু করে, অমনি সবকিছু আগের মতোই ঢিলেঢালা হয়ে যায়। অপরাধীরাও সেটা ভালো করেই জানে। তাই রক্তপাতের পর তারা খানিকটা রূপ লুকিয়ে থাকে, তারপর ঝড়ের বেগ কমলে আবার দ্বিগুণ উৎসাহে রাস্তায় নেমে পড়ে। আমরা আবার নতুন কোনো নৃশংসতার অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকি।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লার পুলিশ ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করল। কড়া বার্তার ডঙ্কা বাজানো হলো সর্বত্র। কিন্তু অভিযানের ভেতরের দৃশ্যটা একটু খতিয়ে দেখলেই আরেকটি বাস্তবতা সামনে আসে। আটক ৬২৪ জনের মধ্যে ৪৫১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৭৩ জনকে মাদক ও অন্যান্য অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ অভিযান হয়েছে, আটকও হয়েছে, কিন্তু কিশোর অপরাধের মূল কাঠামো ভেঙে ফেলার প্রশ্নটি সেখানেই শেষ হয়ে যায় না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুলিশের নিজেদের বক্তব্যেই দীর্ঘদিনের সমস্যার চিত্র ফুটে উঠছে। কুমিল্লার পুলিশ সুপার বলেছেন, গত বছরের ৩০ নভেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ২৫০-এর বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের অনেকেই দ্রুত ছাড়া পেয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ডেকে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে। জেলা পাবলিক প্রসিকিউটরও বলেছেন, মামলার এজাহারে অপরাধের সুনির্দিষ্ট বিবরণ বা আসামির আগের অভিযোগের তথ্য না থাকলে গুরুতর অপরাধে জড়িত ব্যক্তিও আইনি প্রক্রিয়ায় দ্রুত বেরিয়ে আসার সুযোগ পেতে পারে।
এখানেই প্রশ্নটা আরও গভীর। পুলিশ যদি কেবল মাঠপর্যায়ের কিশোরদের ধরে, তাদের কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন জিজ্ঞাসাবাদ করে, তারপর অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেয়, তাহলে গ্যাংয়ের ওপরের স্তরটা কোথায়? যারা এসব কিশোরকে সংগঠিত করে, ব্যবহার করে, মাদক বা অস্ত্রের জোগান দেয়, কিংবা স্থানীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি ধরে রাখতে তাদের কাজে লাগায়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কোথায়?
ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধী গ্যাংয়ের তালিকাও উদ্বেগজনক একটি চিত্র দেখায়। পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজধানীতে সক্রিয় ১২২টি অপরাধী চক্রের তালিকায় থাকা ৮৯৩ জনের মধ্যে ১৫২ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। অর্থাৎ ১৭ শতাংশ সদস্যই অপ্রাপ্তবয়স্ক। আরও ৩২২ জনের বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। সব মিলিয়ে ২০ বছর বা তার কম বয়সী সদস্যের সংখ্যা ৪৭৪, অর্থাৎ ৫৩ শতাংশ।
অর্থাৎ সমস্যাটা কেবল ‘কিশোর’দের নয়। এটি এমন এক অপরাধী কাঠামো, যেখানে কিশোর বয়সী সদস্যরা সংখ্যায় বড় অংশ এবং তাদের ওপরের স্তরে থাকে অপেক্ষাকৃত বয়স্ক সদস্যরা। ফলে কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে শুধু কিশোরদের ধরলেই হবে না; তাদের সংগঠিত করার কাঠামো, অর্থের উৎস, অস্ত্রের উৎস এবং পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্কও চিহ্নিত করতে হবে।
এখানেই রাজনীতির প্রসঙ্গটি সামনে আসে। কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগাযোগের অভিযোগ নতুন নয়। রাজধানী ও চট্টগ্রাম নিয়ে পুলিশের তথ্য এবং বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্থানীয় ‘বড় ভাই’দের পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি উঠে এসেছে। চট্টগ্রামে পুলিশ একাধিকবার কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগের কথা জানিয়েছে। রাজধানী নিয়েও বিভিন্ন প্রতিবেদনে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধী চক্র বেড়ে ওঠার তথ্য এসেছে।
কুমিল্লার সাম্প্রতিক চিত্রও একই ধরনের প্রশ্ন তুলছে। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম অন্তত ১২টি হত্যা মামলায় এসেছে। এলাকাভিত্তিক দখল ও পাল্টাপাল্টি শক্তি প্রদর্শনেও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার তথ্য সেখানে উঠে এসেছে। স্থানীয় বিএনপির এক নেতা অবশ্য দাবি করেছেন, অতীতে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে এবং তাঁদের দলের কেউ পৃষ্ঠপোষকতা করেন এমন তথ্য তাঁর জানা নেই। অর্থাৎ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগের সঙ্গে রাজনৈতিক অস্বীকৃতিও পাশাপাশি রয়েছে।
এখানেই আসল সমস্যাটা। সরকার বদলায়, ক্ষমতার পট পরিবর্তন ঘটে, দলের নাম পাল্টায়। কিন্তু পাড়া-মহল্লায় ক্ষমতার দাপট বজায় রাখতে উঠতি বয়সী ছেলেদের ব্যবহার করার সংস্কৃতি যদি থেকে যায়, তাহলে কেবল রাজনৈতিক ব্যানার বদলালেই সমস্যার সমাধান হবে না। রাজনৈতিক মিছিলের ভিড় বাড়ানো, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, এলাকায় প্রভাব বিস্তার কিংবা স্থানীয় বিরোধে শক্তি প্রদর্শনের জন্য কিশোরদের ব্যবহার করা হলে তাদের অপরাধের দিকে ঠেলে দেওয়ার পথটাও তৈরি হয়। আর যে কিশোর আজ মিছিলের পেছনে হাঁটছে, কাল সে হয়তো সেই পরিচয়কে নিজের সামাজিক ক্ষমতার উৎস হিসেবে ব্যবহার করবে।
এই বড় ভাইদের প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন ১৫ বা ১৬ বছরের কিশোরের হাতে অস্ত্র আসা শুধু তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়। তার পেছনে অস্ত্রের উৎস থাকে, অর্থের উৎস থাকে, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক থাকে, কখনো কখনো প্রভাবশালী পরিচয়ও থাকে। অথচ আলোচনায় বারবার সামনে আসে কেবল কিশোরটির মুখ। পেছনে থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের মুখ অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়।
রাজনীতিবিদেরা যখন এই কিশোরদের ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ ওঠে, তখন ঘরে বসে থাকা অভিভাবকদের দায়ও কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। সন্তানের হাতে আমরা আলতো করে একটা দামি স্মার্টফোন তুলে দিয়ে ভেবে নিই, দায়িত্ব শেষ হলো। আজকাল অনেক শিশু-কিশোর বাবা-মায়ের পর্যাপ্ত নজরদারির বাইরে এক অচেনা জগতে সময় কাটায়। যে বয়সে মাঠে গিয়ে ধুলোবালি মেখে আসার কথা, সেই বয়সে তারা দিনের পর দিন চার দেয়ালের মাঝে আটকে থেকে স্ক্রিনের নীল আলোয় বুঁদ হয়ে থাকে।
তবে এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। স্মার্টফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কিশোর অপরাধের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষণা বরং বলছে, বিষয়টি বহুস্তরীয়। বাংলাদেশি কিশোরদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দীর্ঘ সময়ের বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পাওয়া গিয়েছিল। সাম্প্রতিক বাংলাদেশের গবেষণাতেও অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার, অভিভাবকের নজরদারির ঘাটতি, একাকিত্ব, বুলিং, মাদক ব্যবহার ও দুর্বল পারিবারিক সম্পর্কের সঙ্গে সমস্যাজনক গেমিং আচরণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
ঢাকার ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ শিশুকে নিয়ে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ শিশু অভিভাবকের তত্ত্বাবধান ছাড়া ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করত। গবেষণাটি স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যের সম্পর্কও পরীক্ষা করেছে।
আর গ্রামীণ বাংলাদেশের কিশোরদের নিয়ে সাম্প্রতিক একটি ছোট পরিসরের গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের ৪৩.৩৩ শতাংশ প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা এবং ২১.৬৭ শতাংশ ৫ ঘণ্টার বেশি স্মার্টফোন ব্যবহার করত। বিনোদন ছিল ব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর একটি, আর টিকটক ও অনলাইন গেমও ছিল জনপ্রিয়। তবে গবেষণাটি ছোট নমুনার হওয়ায় এটিকে সারাদেশের শিশুদের প্রতিনিধিত্বকারী তথ্য হিসেবে দেখা যাবে না।
তাই সমস্যাটা স্মার্টফোন নয়, বরং অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল জগৎ, অভিভাবকের নজরদারির ঘাটতি, বাস্তব সামাজিক যোগাযোগের সংকট এবং অনলাইন ও অফলাইনের অপরাধী নেটওয়ার্কের যোগসূত্র। টিকটকে ‘কুল’ বা বীর সাজতে গিয়ে কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দল বাঁধে, মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ খোলে, অস্ত্র হাতে ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কার সঙ্গে রাত জাগছে, কোন ধরনের কনটেন্ট দেখছে, অনলাইনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, এই খবরটুকু রাখার ফুরসত অনেক বাবা-মায়েরই নেই। ফলে আদরের সন্তান কখন যে অপরাধী চক্রের অংশ হয়ে উঠছে, তা টেরও পান না তারা।
অপরাধ থেকে তরুণদের দূরে সরাতে আজকাল অনেকেই বিকল্পের কথা বলছেন। বলা হচ্ছে খেলার মাঠের কথা, পাঠাগারের কথা, সাংস্কৃতিক ক্লাবের কথা। এগুলো অত্যন্ত জরুরি। আমাদের শহরগুলো ইট-কাঠের জঙ্গল হয়ে উঠেছে, যেখানে বাচ্চাদের দৌড়ানোর জায়গা কমে যাচ্ছে। নগর পরিকল্পনার আলোচনায় শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার জায়গা, হাঁটার জায়গা, সামাজিক মেলামেশার জায়গা কতটা রাখা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তাই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু একটা প্রশ্ন খুব নীরবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। শিশুকাল থেকে যে নীতি-নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, আত্মসংযম ও মূল্যবোধের শিক্ষা প্রয়োজন, সে কথাটি কেন যেন অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়। এর মধ্যে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাও রয়েছে। একটি শিশুকে কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত করলেই তো মানুষ হিসেবে তার শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজ মিলে তাকে শেখাতে হয় অন্যের অধিকার, জীবনের মূল্য, অপরাধের পরিণতি, আত্মসংযম এবং দায়িত্ববোধ।
এই জায়গায় ধর্মীয় শিক্ষার কথাও অস্বস্তি ছাড়া বলা দরকার। ধর্মীয় শিক্ষা মানেই কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া নয়। পরিবারে নৈতিকতা, সহমর্মিতা, অন্যের প্রতি সম্মান, আত্মসংযম ও দায়িত্ববোধের চর্চা কীভাবে শিশুর আচরণকে প্রভাবিত করে, সেটি নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। বাংলাদেশের কিশোর গ্যাং নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় পরিবারকে তরুণ অপরাধ প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা-উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং পারিবারিক সম্পর্ক ও মূল্যবোধের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
মালয়েশিয়াতেও কিশোর অপরাধ নিয়ে গবেষণায় অভিভাবকের অনুপস্থিতি, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, সমবয়সীদের চাপ, অপরাধী গ্যাংয়ের সদস্যপদ এবং পরিবারের অপরাধমূলক সম্পৃক্ততার মতো বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে। অর্থাৎ কোনো একটি ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক উপাদানকে একক কারণ হিসেবে দেখার বদলে পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের শক্তিকে গুরুত্ব দেওয়াই বেশি যুক্তিসংগত।
আমাদের প্রগতিশীল আলোচনার টেবিলে তাই ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার কথা বললেই তাকে কোনো রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক পরিচয়ের মধ্যে আটকে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। একইভাবে ধর্মীয় শিক্ষা থাকলেই একটি শিশু অপরাধ করবে না, এমন সরল সিদ্ধান্তও টানা যায় না। আসল কথা হলো, শিশুর চরিত্র গঠনে পরিবার, শিক্ষা, নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, খেলাধুলা, বন্ধুত্ব এবং সামাজিক পরিবেশ সবকিছুরই ভূমিকা রয়েছে।
সব কথার শেষ কথা হলো, সবচেয়ে বড় দায়টা কিন্তু দিনশেষে সরকারের ঘাড়েই এসে পড়ে। একটি সমাজ যখন ভেতর থেকে পচতে শুরু করে, তখন পুলিশ পাঠিয়ে সাময়িক ধরপাকড় দিয়ে সেই পচন আটকানো যায় না। সরকারের কাজ কেবল অপরাধ ঘটার পর ধরপাকড় করা নয়। সরকারের আসল কাজ হলো শিক্ষা ব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা সামাল দেওয়া, শিশুদের জন্য নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, খেলার মাঠ রক্ষা করা, মাদক ঢোকার পথ বন্ধ করা এবং অপরাধী চক্রের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
কোভিড মহামারির সময় বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছিল। ইউনিসেফ ও ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ স্কুল বন্ধের কারণে এই বিপুলসংখ্যক শিশু শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থাকা বা শিক্ষায় ব্যাঘাতের ঝুঁকিতে পড়েছিল। পরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপে দেখা যায়, কোভিডের সময় দূরশিক্ষায় অংশ নিয়েছিল ১৮.৭ শতাংশ শিশু। অর্থাৎ স্কুল বন্ধ থাকার সময়ে বিপুলসংখ্যক শিশু নিয়মিত বিকল্প শিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছিল।
এই জায়গায় রাষ্ট্রের আরও একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া দরকার। স্কুল বন্ধের সেই দীর্ঘ সময়ের পর যেসব শিশু পড়াশোনা থেকে ছিটকে গেল, তাদের কতজন ফিরেছে? যারা ফেরেনি, তারা এখন কোথায়? তারা কী করছে? তাদের মধ্যে কতজন শ্রমবাজারে ঢুকেছে, কতজন মাদকের ঝুঁকিতে পড়েছে, কতজন অপরাধী চক্রের সংস্পর্শে এসেছে? রাষ্ট্রের কাছে যদি এসব প্রশ্নের হালনাগাদ উত্তর না থাকে, তাহলে কিশোর গ্যাং সমস্যাকে আমরা কতটা গভীরভাবে মোকাবিলা করছি, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
মাদকও এই সমস্যার একটি বড় অংশ। কিশোর অপরাধের সঙ্গে মাদক, অর্থ, অস্ত্র এবং স্থানীয় প্রভাবের যোগসূত্র থাকলে শুধু কিশোরদের আটক করে সমস্যার সমাধান হবে না। মাদক সরবরাহের চেইনে কারা আছে, অস্ত্র কোথা থেকে আসছে, অপরাধের অর্থ কোথা থেকে আসছে এবং কারা এসব কিশোরকে ব্যবহার করছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইন জুয়া, সহিংস কনটেন্ট ও অপরাধকে মহিমান্বিত করে এমন ডিজিটাল সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে কাজ করতে হবে।
কিশোর গ্যাং সমস্যার সমাধান তাই কেবল থানার হাতে তুলে দিলে হবে না। প্রতিটি থানায় কিশোর অপরাধের ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্তকরণ, স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের খোঁজ, পরিবারভিত্তিক কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন, মনোসামাজিক সহায়তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করে, তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। কিশোরকে ধরে অভিভাবকের জিম্মায় দিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; তাকে আবার একই পরিবেশে ফিরে যেতে হবে কি না, সেটিও দেখতে হবে।
আজ কুমিল্লার অপ্রতিম নিহত হয়েছে। তার মায়ের কোল খালি হয়েছে। আমরা হয়তো দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুই লাইন লিখে দায় সারব। কয়েক দিন ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করব, টকশোতে তর্ক করব, পুলিশি অভিযানের ছবি দেখব। তারপর নতুন কোনো ঘটনা এসে অপ্রতিমকে আমাদের স্মৃতি থেকে সরিয়ে দেবে।
কিন্তু এবার অন্তত প্রশ্নটা ভুলে যাওয়া উচিত নয়। অপ্রতিমকে যে কিশোরেরা হত্যা করেছে, তারা একদিনে অপরাধী হয়ে ওঠেনি। তাদের পেছনে ছিল পরিবার, বন্ধুত্ব, সামাজিক পরিবেশ, ডিজিটাল জগৎ, স্থানীয় ক্ষমতার সম্পর্ক এবং সম্ভবত আরও কিছু অদৃশ্য নেটওয়ার্ক। তাই শুধু হত্যাকারীর হাতকেই দেখলে হবে না; সেই হাতকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেওয়া পরিবেশটাকেও দেখতে হবে।
সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো যদি এবারও কেবল লোক দেখানো কয়েকটা পুলিশি অভিযান চালিয়ে ঘটনা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে সমস্যার শিকড় অক্ষতই থেকে যাবে। একই সঙ্গে পরিবার যদি সন্তানের আচরণ সম্পর্কে উদাসীন থাকে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি শুধু পরীক্ষার ফল নিয়ে ব্যস্ত থাকে এবং সমাজ যদি মাঠ, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক পরিসর হারাতে থাকে, তাহলে রাষ্ট্র একা এই সংকট সামাল দিতে পারবে না।
এই ব্যাধি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে আটকে থাকবে না। আজ যে বিষাক্ত ছায়া কোনো নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের ঘরে হানা দিয়েছে, কাল তা সমাজের উচ্চবিত্ত কিংবা রাজনীতির বড় বড় এলিট পরিবারের দরজাতেও কড়া নাড়তে পারে। অপরাধের কোনো শ্রেণিচেতনা নেই। অস্ত্র যখন হাতে আসে, গ্যাং যখন তৈরি হয়, তখন সে কার সন্তান তা দেখে না।
অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের শোক নয়। এটি আমাদের সামনে রাখা একটি আয়না। সেখানে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আছে, রাজনীতির অন্ধকার দিক আছে, পরিবারের উদাসীনতা আছে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আছে, মূল্যবোধের সংকট আছে। আর আছে আমাদের সেই পুরোনো অভ্যাস, নির্মম কোনো ঘটনার পর কয়েক দিনের জন্য জেগে ওঠা, তারপর সব ভুলে যাওয়া।
সমস্যার লাগাম হাতছাড়া হওয়ার আগেই যদি রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার নিজেদের মধ্যকার এই আত্মঘাতী উদাসীনতা না ভাঙে, তবে পুরো সমাজকাঠামো ধসে পড়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। অপ্রতিমের রক্ত যেন আরেকটি খবর হয়ে আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে না যায়। কারণ কোনো সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর রোগ শুধু তার অপরাধ নয়, অপরাধের পরও তার কিছুদিনের মধ্যে সব ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা।








