ট্রাম্প ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর অভিযানে গিয়ে যে সংকট তৈরি করেছেন, ইয়েমেনে সেই সংকটের একটি সংস্করণ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়াচ্ছেন। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ, বিমান হামলা, অবরোধ ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও হুথিদের পরাস্ত করা যায়নি। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও এবার নতুন করে সংঘাত ভয়াবহ আকার নিয়েছে।

এবার পরিস্থিতি আরও জটিল। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের মধ্যেই হুথিরা নতুন করে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়েছে। গত সপ্তাহে তারা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় দ্রুত অগ্রসর হয়েছে এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালীর আশপাশের কৌশলগত এলাকা ও কয়েকটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব দিয়ে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা নতুন করে বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এটি শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধ নয়। এটি এখন বিশ্ব জ্বালানি বাজারের যুদ্ধ। হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। সৌদির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার পর পাইপলাইনটি বন্ধ করে দিতে হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ হামলার উৎস হিসেবে ইরাক থেকে আসা ড্রোনের কথা জানিয়েছে। ফলে এই হামলাকে সরাসরি হুথিদের হামলা বলা যায় না। তবে একই সময়ে ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রযাত্রা, সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তাহীনতা পুরো তেল সরবরাহ ব্যবস্থাকে নতুন ঝুঁকিতে ফেলেছে।

সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, যুদ্ধ এখন তার ভূখণ্ডের ভেতরেও আঘাত করছে। ১৯ সেপ্টেম্বর রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে হুথিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বলেছে, হামলাটি প্রতিহত করা হয়েছে। একই সময়ে ইয়ানবু, তাইফ, বিশা ও ফারাসানের মতো এলাকাকেও লক্ষ্য করার চেষ্টা হয়েছে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

এর আগে হুথিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এমনকি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবিও করেছে তারা। তবে এ ধরনের সামরিক দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে যুদ্ধের প্রচারণা আর নিশ্চিত সামরিক বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।

সৌদি আরব পাল্টা ইয়েমেনে বিমান হামলা চালাচ্ছে। সানাসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইয়েমেনকে আরও কতটা ধ্বংস করলে হুথিদের যুদ্ধ করার সক্ষমতা শেষ হবে?

গত এক দশকের অভিজ্ঞতা তো অন্তত বলে, শুধু বিমান হামলা দিয়ে হুথিদের পরাস্ত করা যায়নি। কারণ হুথিদের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের কাছে থাকা আধুনিক অস্ত্র নয়; তাদের শক্তি হলো দীর্ঘদিনের স্থানীয় যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, ভূখণ্ডের সঙ্গে পরিচিতি এবং বিকেন্দ্রীভূত যুদ্ধকৌশল। ইরান তাদের অস্ত্র, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণে সহায়তা করে—এমন প্রমাণ ও মূল্যায়ন রয়েছে। কিন্তু হুথিরা ইরানের এমন কোনো ‘রিমোট কন্ট্রোল’ বাহিনী নয়, যার একটি বোতাম চাপলেই তারা যুদ্ধ বন্ধ করে দেবে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহেও দেখা যাচ্ছে, ইরানের সঙ্গে তাদের কৌশলগত স্বার্থের মিল থাকলেও হুথিরা নিজেদের সিদ্ধান্ত ও নিজস্ব লক্ষ্য নিয়েও পরিচালিত হয়।

এ কারণেই সৌদি আরবের জন্য সমস্যাটি এত কঠিন।

সৌদির কাছে অর্থ আছে, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান আছে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে, বিপুল অস্ত্র আছে। কিন্তু যুদ্ধের মাঠে শুধু অস্ত্রের আধুনিকতা দিয়ে সবসময় জয় পাওয়া যায় না। ইয়েমেনের পাহাড়, মরুভূমি, শহর ও জনপদে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ করে অভ্যস্ত একটি বাহিনীকে আকাশ থেকে ধ্বংস করা সহজ নয়।

আরেকটি বাস্তবতা আরও নির্মম। সৌদি আরবের অর্থনীতির অবকাঠামো যত বড়, তার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলার সম্ভাব্য ক্ষতিও তত বড়। একটি তেল স্থাপনা, পাইপলাইন, বন্দর বা বিমানবন্দরে সামান্য বিঘ্নও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিপরীতে ইয়েমেনের বহু অবকাঠামো এমনিতেই যুদ্ধের কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত। ফলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ভার দুই পক্ষের জন্য সমান নয়।

এই জায়গাতেই সৌদি আরব এখন দিশেহারা হয়ে মিত্রদের সহায়তা চাইছে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা ও আঞ্চলিক মিত্রদের কাছে সহায়তা চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিকভাবে হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধে নামতে এখনো রাজি হয়নি। সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের কাছেও সহায়তা চাওয়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এসেছে। এখন পর্যন্ত কোনো দেশ সরাসরি সামরিকভাবে যুদ্ধে নামার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

পাকিস্তানের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সম্প্রতি যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে, তার কারণে পাকিস্তানের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, সৌদি আরবের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে ওই চুক্তি সক্রিয় হতে পারে। তবে ইসলামাবাদ সরাসরি ইয়েমেনে সেনা পাঠানোর বদলে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও উত্তেজনা কমানোর পথেও সক্রিয় রয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব ইরানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

হুথিদের থামাতে সৌদি আরব শেষ পর্যন্ত চীনের দ্বারস্থ হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব বেইজিংয়ের কাছে সহায়তা চাওয়ার পর চীন ব্যক্তিগতভাবে ইরানকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রভাব প্রয়োগ করতে বলেছে। চীনের এই অবস্থানের পেছনে শুধু কূটনীতি নয়, নিজেদের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক স্বার্থও রয়েছে। কারণ বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ—দুটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিরাপত্তাই চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভাবুন একবার। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রধান গ্যারান্টার ছিল যুক্তরাষ্ট্র। অথচ এখন সৌদি আরবকে চীনের কাছে যেতে হচ্ছে, আর চীনকে ইরানের সঙ্গে কথা বলতে হচ্ছে হুথিদের থামানোর জন্য।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে, এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ইরান কি চাইলেই হুথিদের থামাতে পারবে? সম্ভবত না।ইরানের সঙ্গে হুথিদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। কিন্তু হুথিদের নিজস্ব ইতিহাস আছে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক লড়াইয়ের নিজস্ব ধারাবাহিকতা আছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতেও বলা হচ্ছে, হুথিরা ইরানের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হলেও তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য রয়েছে। ফলে তেহরানের নির্দেশ গেলেই তারা যুদ্ধ বন্ধ করবে—এমন সরল সমীকরণ বাস্তবে কাজ নাও করতে পারে।

এরই মধ্যে ওমানের মধ্যস্থতায় নতুন করে আলোচনার চেষ্টা চলছে। সৌদি আরব হুথিদের সঙ্গে সীমিত সময়ের যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। একটি প্রস্তাবিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির কথাও সামনে এসেছে। তবে হুথিরা শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, সৌদি অবরোধ ও সামরিক তৎপরতা বন্ধের মতো বড় ছাড় চাইছে। ফলে আলোচনার পথ এখনো খুব কঠিন।

এখানে প্রশ্নটা আবারও একই। যে পক্ষ এতদিন ধরে যুদ্ধ করেছে, সে এখন যুদ্ধ থামাতে চাইছে কেন? কারণ যুদ্ধের অর্থনীতি বদলে গেছে।আগে সৌদি আরব ইয়েমেনে যুদ্ধ করত, আর হুথিরা মূলত ইয়েমেনের ভেতরে লড়ত। এখন হুথিদের হামলা সৌদি তেল অবকাঠামো, বন্দর, বিমানবন্দর এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতিও অনিশ্চিত। অর্থাৎ সৌদি আরব এখন একসঙ্গে একাধিক দিক থেকে জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকির মুখে।

আর এই জায়গাটিই বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে এখন শুধু একটি যুদ্ধ চলছে না। একাধিক সংঘাত একে অন্যের ওপর চাপ তৈরি করছে। ইরান, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা। ফলে তেলের দাম শুধু উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে না; পরিবহন, বীমা, জাহাজভাড়া এবং সরবরাহের ঝুঁকিও দামের অংশ হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে ডিজেলের গড় খুচরা দাম গ্যালনপ্রতি ৬ দশমিক ২৮৫ ডলারে উঠেছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় একই সময়ে দাম ছিল আরও বেশি। অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতিতেও জ্বালানি মূল্য এখন বড় চাপ তৈরি করছে। তেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ির জ্বালানি ব্যয় বাড়ে না।পরিবহন ব্যয় বাড়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে। শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। খাদ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে। পণ্যের দাম বাড়ে। মূল্যস্ফীতি বাড়ে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

ফলে তেলের যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত শুধু তেলের যুদ্ধ থাকে না। এটি হয়ে যায় মূল্যস্ফীতির যুদ্ধ। এখন ইউরোপের দিকে তাকান। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ইউরোপে সৌদি অপরিশোধিত তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বরে ইয়ানবু বন্দর থেকে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে এবং ইউরোপের কয়েকটি ক্রেতাকে অক্টোবরে নির্ধারিত সরবরাহ না পাওয়ার বিষয়েও জানানো হয়েছে। সৌদি আরব বিকল্পভাবে ওমানের মাধ্যমে তেল পরিবহনের চেষ্টা করছে। এখন প্রশ্ন, এই সংকট যদি আরও দীর্ঘ হয়, তাহলে কী হবে?

তেলের বাজারে সরবরাহ কমলে দাম বাড়বে। দাম বাড়লে আমদানি-নির্ভর দেশগুলো বেশি ডলার খরচ করবে। বেশি ডলার খরচ করলে তাদের মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে। মুদ্রার ওপর চাপ বাড়লে আমদানি আরও ব্যয়বহুল হবে।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই বিপদ সবচেয়ে বেশি।

কারণ বাংলাদেশ নিজেই জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ জ্বালানি তেল আমদানিতে ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই ব্যয় বেড়ে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে—আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। স্থানীয় মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছরেই জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় আমাদের জন্য রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছে।

এখন যদি আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরও বাড়ে, তাহলে বাংলাদেশের সামনে দুটি পথ থাকবে। এক. বেশি দামে তেল কিনতে হবে। দুই. তেল কম কিনতে হবে। প্রথমটি করলে ডলারের ওপর চাপ বাড়বে। দ্বিতীয়টি করলে পরিবহন, বিদ্যুৎ, শিল্প ও কৃষি খাতে সংকট তৈরি হতে পারে। কোনোটিই সুখকর নয়।

আর এখানেই সরকারের পরিকল্পনার প্রশ্নটি সামনে আসে। কারণ সংকটের শুরুতেই যদি শুধু বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে’, তাহলে সেটি কোনো পরিকল্পনা নয়। সেটি একটি বাস্তবতার বর্ণনা। পরিকল্পনা হলো—এই বাস্তবতার মধ্যে কীভাবে কম ক্ষতি করে দেশ চালানো হবে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি শুধু তেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গ্যাসের সংকটও একই সঙ্গে বাড়ছে।

কাতার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এলএনজি সরবরাহকারী। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অনুযায়ী কাতার থেকে বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এলএনজি কার্গো আসার কথা। ২০২৬ সালে কাতারএনার্জির ৪০টি কার্গো দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালীর সংকটের কারণে সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জুলাইয়ে পেট্রোবাংলা জানিয়েছিল, কাতারের সরবরাহ ২০২৬ সালে প্রায় অর্ধেকে নেমে যেতে পারে। এর মানে কী? বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি কিনতে হবে।আর বিকল্প উৎস মানেই সবসময় সস্তা উৎস নয়।

যুদ্ধের কারণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহ আটকে গেলে স্পট বাজারে যেতে হয়। সেখানে দাম পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত ওঠানামা করে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এই ঘাটতি পূরণে স্পট বাজার থেকে বেশি এলএনজি কেনার চেষ্টা করছে। জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মার্চের পর বাংলাদেশ ৩৫টি স্পট কার্গো আমদানি করেছে। অর্থাৎ জ্বালানি তেলের পাশাপাশি গ্যাসের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ওপর একই ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।

এখানে অবশ্য একটি তথ্য সংশোধন জরুরি। কাতারের গ্যাসক্ষেত্র ‘ইরানের হামলায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে’—এভাবে বলা ঠিক হবে না। মার্চে কাতারের জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরানের হামলায় বড় ধরনের ক্ষতি ও উৎপাদন ব্যাঘাত ঘটেছিল এবং কাতারএনার্জি সরবরাহ নিয়ে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু কাতারের এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, এমন তথ্য নেই।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ আমরা যদি সংকটের মাত্রা বোঝাতে গিয়ে তথ্যকে বাড়িয়ে বলি, তাহলে মূল কথাটিই দুর্বল হয়ে যায়। মূল কথা বরং আরও ভয়ংকর।

বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ওপর নির্ভরশীল। সেই সরবরাহ ব্যাহত হলে বিকল্প বাজারে যেতে হয়। আর যুদ্ধের সময় বিকল্প বাজারের দাম সাধারণত কম থাকে না।

এদিকে বাংলাদেশের তেল আমদানি ব্যয় ইতোমধ্যেই দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। গ্যাসের জন্যও অতিরিক্ত ডলার খরচ হচ্ছে। এর সঙ্গে যদি আন্তর্জাতিক তেলের দাম আরও বাড়ে, তাহলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়বে। কিন্তু বাংলাদেশের ঝুঁকি এখানেই শেষ নয়। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের শুধু জ্বালানি সরবরাহের উৎস নয়; এটি বাংলাদেশের শ্রমবাজারও। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে লাখ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন। ফলে ওই অঞ্চলের অর্থনীতি দুর্বল হলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সেও পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে।

এমনিতেই যদি জ্বালানি আমদানির জন্য বেশি ডলার খরচ হয়, তার সঙ্গে রেমিট্যান্স কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ভারসাম্যে চাপ বাড়বে।

আবার শুধু রেমিট্যান্স নয়, রপ্তানির ক্ষেত্রেও ঝুঁকি আছে।

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি সংকট দীর্ঘ হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। মূল্যস্ফীতি বাড়লে ভোক্তার ব্যয়ক্ষমতা কমতে পারে। ফলে তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের চাহিদায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিটা একমুখী নয়।

একদিকে আমদানি ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে ডলারের চাহিদা বাড়ছে। আবার বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি কমে গেলে রপ্তানি চাপে পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে রেমিট্যান্সেও চাপ আসতে পারে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন হতে পারে, যেখানে একই সময়ে বাংলাদেশের বাইরে টাকা বেশি যাবে এবং ভেতরে ডলার আসার গতি কমে যাবে।

এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ। তবে এখানেও একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। এই সংকটের কোনোটিই বর্তমান সরকারের তৈরি নয়। যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক তেলের দাম, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—এসব বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

কিন্তু সংকট মোকাবিলার দায়িত্ব সরকারেরই।

এখানেই সরকারের পরিকল্পনার পরীক্ষা। তেলের দাম যদি আরও বাড়ে, তাহলে সরকার কী করবে? শুধু ভোক্তার ওপর দাম চাপিয়ে দেবে? নাকি আগেভাগে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করবে?

কোন দেশ থেকে কত দামে তেল পাওয়া যায়, কোন দেশের পরিশোধিত জ্বালানি বাংলাদেশের পরিশোধন অবকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কোন সরবরাহকারী কত দ্রুত জাহাজ পাঠাতে পারে—এসব নিয়ে এখনই বিকল্প পরিকল্পনা করতে হবে।

রাশিয়া বা ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল বাংলাদেশের পরিশোধন সক্ষমতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও বাস্তবতার সঙ্গে বিচার করতে হবে। শুধু কাগজে সস্তা তেল পাওয়া যাচ্ছে বললেই হবে না। বাংলাদেশ সেটি পরিশোধন করতে পারবে কি না, পরিবহন ও নিষেধাজ্ঞাজনিত ঝুঁকি কত, বীমা ও ব্যাংকিং ব্যয় কত—সব হিসাব করতে হবে। প্রয়োজনে পরিশোধিত জ্বালানি সরাসরি আমদানির ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

সরকার ইতোমধ্যে বিকল্প উৎস ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে। কিন্তু এখন প্রয়োজন আরও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কোন দেশ থেকে কতটা তেল, কোন দেশ থেকে গ্যাস, কী মূল্যে, কত দিনের মজুত এবং কোন বিকল্প রুটে সরবরাহ আসবে—এসবের একটি পরিষ্কার পরিকল্পনা থাকা দরকার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাপ্লাই লাইন সচল রাখা। কারণ বাংলাদেশে তেলের দাম ১০ টাকা বা ২০ টাকা বাড়া নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি হবে, সেটি তার চেয়ে অনেক বড়।

সরকারকে একই সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়াতে হবে। ইরান, সৌদি আরব, কাতার, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো এখন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ।

ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্যিক স্বার্থ যতটা, তার চেয়ে বড় বিষয় হলো আঞ্চলিক নৌপথের নিরাপত্তা। সৌদি আরব বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও শ্রমবাজারের অংশীদার। কাতার গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস সরবরাহকারী। ওমান গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প বন্দর ও বাণিজ্যিক রুটের অংশীদার। অর্থাৎ এই দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনীতি এখন সরাসরি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।

বাংলাদেশকে তাই এমন অবস্থান নিতে হবে, যাতে কোনো পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না হয় এবং বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহও নিরাপদ থাকে। একইভাবে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও রপ্তানি সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।কারণ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে বলে বাংলাদেশ যদি নিজের রপ্তানি বাজার হারাতে শুরু করে, তাহলে জ্বালানি আমদানির জন্য যে ডলার দরকার, সেটিই পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।

এখানে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে ডলার ব্যবস্থাপনায়।

জ্বালানি আমদানির জন্য যত বেশি ডলার লাগবে, তত বেশি হিসাব করে খরচ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমাতে হবে। জ্বালানি কেনায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও স্বল্পমেয়াদি বাজার—দুটোর মধ্যে ভারসাম্য করতে হবে। কোথায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সস্তা, কোথায় স্পট বাজার সুবিধাজনক, কোথায় সরবরাহের নিশ্চয়তা বেশি—প্রতিটি বিষয়কে একসঙ্গে দেখতে হবে।

আর একটি বিষয় খুব জরুরি।

জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে স্বচ্ছতা।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ছে—এটি সত্য। কিন্তু সেই আন্তর্জাতিক দাম থেকে বাংলাদেশের পাম্পে ১৬৫ টাকা কীভাবে আসে, তার পূর্ণ হিসাবও জনগণকে জানাতে হবে।

কারণ সামনে যদি তেলের দাম আরও বাড়ে, তখন মানুষ জানতে চাইবে—আন্তর্জাতিক বাজারে কত বেড়েছে, আমদানি ব্যয় কত বেড়েছে, কর কত, পরিবহন ব্যয় কত, বিপিসির লোকসান কত এবং সরকার কতটা সমন্বয় করেছে।

সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সময়ই এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে।

বিপিসি একদিকে বলছে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত তাদের হিসাবে ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। অন্যদিকে সরকার বলছে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য করতেই দাম বাড়ানো হয়েছে। দুই পক্ষের বক্তব্যের মাঝখানে সাধারণ মানুষ যে জিনিসটি চায়, সেটি হলো হিসাব।

এই হিসাব গোপন রাখার কোনো কারণ নেই।

বরং পুরো হিসাব প্রকাশ করলে সরকারের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

এখন প্রশ্নটি শুধু আজকের ১৬৫ টাকা নয়।

প্রশ্ন হলো, আগামী তিন মাসে দাম কোথায় যাবে?

ছয় মাস পরে কোথায় যাবে?

আন্তর্জাতিক বাজার যদি আরও বাড়ে, সরকার কী করবে?

আন্তর্জাতিক বাজার কমলে দাম কত দ্রুত কমাবে?

জ্বালানি আমদানির জন্য কত ডলার আলাদা রাখা হয়েছে?

কত দিনের জ্বালানি মজুত আছে?

কোন বিকল্প উৎস প্রস্তুত আছে?

এলএনজি সরবরাহে কাতারের ঘাটতি কতটা এবং তার বিকল্প কতটা নিশ্চিত?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনই দরকার।

কারণ তেলের দাম বৃদ্ধি তো সবে শুরু হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যদি দীর্ঘ হয়, তাহলে আজকের ১৬৫ টাকা হয়তো আগামী দিনের সবচেয়ে বড় সমস্যা নাও হতে পারে। বড় সমস্যা হতে পারে তেল পাওয়া, গ্যাস পাওয়া এবং সেই তেল-গ্যাস কেনার মতো ডলার থাকা।

বিশ্বের বড় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও বর্তমান পরিস্থিতির পরিণতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা বলছে। কারণ একই সময়ে হরমুজ, বাব আল-মান্দেব, তেল স্থাপনা, গ্যাস সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

এই অবস্থায় মন্দার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা হওয়াটাও স্বাভাবিক। তবে এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে বিশ্ব অর্থনীতি অবশ্যই মন্দায় ঢুকে যাবে। সেটি নির্ভর করবে যুদ্ধ কতদিন চলে, তেলের সরবরাহ কতটা বিঘ্নিত হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজার কত দ্রুত স্থিতিশীল হয় তার ওপর।

কিন্তু বাংলাদেশের জন্য একটি বিষয় এখনই নিশ্চিত। আমরা এই সংকটের বাইরে নই।বাংলাদেশের তেল আমদানি ব্যয় ইতোমধ্যেই রেকর্ডে উঠেছে। গ্যাসের সরবরাহেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অস্থির। রপ্তানি বাজার বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের বিপুল শ্রমবাজারও একই সংঘাতের ঝুঁকিতে।

এখন সরকারের সামনে তাই দুটি পথ। একটি হলো পরিস্থিতি দেখে যাওয়া। অন্যটি হলো পরিস্থিতির আগেই প্রস্তুতি নেওয়া। প্রথম পথটি সহজ। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। শুধু বলা যায়—যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়েছে, আমাদের কিছু করার নেই। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাই হলো যখন নিজের হাতে সবকিছু থাকে না, তখন হাতে থাকা সীমিত সুযোগ দিয়ে ক্ষতি কমানো।

যুদ্ধ বাংলাদেশ শুরু করেনি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত বাংলাদেশ শুরু করেনি। সৌদি-হুথি সংঘাতও বাংলাদেশ শুরু করেনি। হরমুজ বা বাব আল-মান্দেবও বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নয়।কিন্তু বাংলাদেশের তেল কোথা থেকে আসবে, গ্যাস কোথা থেকে আসবে, কত দামে আসবে, কত দিনের মজুত থাকবে, কত ডলার খরচ হবে, কোন বাজারে রপ্তানি ধরে রাখতে হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর কীভাবে চাপ কমাতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সরকারকেই নিতে হবে।

ইরান, সৌদি আরব, হুথি, কাতার, ওমান—যে পক্ষের সঙ্গেই প্রয়োজন, কূটনৈতিক যোগাযোগ রাখতে হবে। সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখতে হবে, যাতে তেল সরবরাহ বন্ধ না হয়।কাতারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে, যাতে এলএনজি সরবরাহ যতটা সম্ভব বজায় থাকে।ওমানের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও কার্যকর করতে হবে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প বাণিজ্যপথ ও কূটনীতিতে দেশটির গুরুত্ব বেড়েছে।

চীনের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াতে হবে, কারণ এই সংকটে বেইজিংয়ের জ্বালানি ও কূটনৈতিক প্রভাব ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, সরকারকে এখনই একটি ‘জ্বালানি সংকট মোকাবিলা পরিকল্পনা’ জনগণের সামনে আনতে হবে।

কত দিনের তেল মজুত আছে? কত দিনের গ্যাস? বিকল্প উৎস কোনগুলো? কত দামে কেনা হবে? কত ডলার লাগবে? আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরও বাড়লে কী করা হবে? দাম কমলে কত দ্রুত দেশে কমানো হবে? বিপিসির লোকসান কীভাবে সামাল দেওয়া হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনই দরকার। কারণ সংকট যখন চরমে পৌঁছে যাবে, তখন পরিকল্পনা করলে সেটি আর পরিকল্পনা থাকে না; সেটি হয়ে যায় জরুরি প্রতিক্রিয়া।

আর জরুরি প্রতিক্রিয়ার খরচ সবসময় বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে থামবে, কেউ জানে না। হরমুজ কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা কখন ফিরবে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত কতদিন চলবে, সৌদি আর হুথিদের সংঘাত কোন দিকে যাবে—কোনোটিরই নিশ্চিত উত্তর নেই।

কিন্তু বাংলাদেশের সামনে একটি বিষয় পরিষ্কার। যুদ্ধ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না। যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের হাতে নেই। কিন্তু যুদ্ধের ক্ষতি কতটা বাংলাদেশের ঘরে ঢুকবে, সেটি অনেকটাই নির্ভর করবে বাংলাদেশের প্রস্তুতির ওপর।

তেল-গ্যাসের বিকল্প উৎস তৈরি করতে হবে। সরবরাহের পথ নিরাপদ রাখতে হবে। ডলার অত্যন্ত হিসাব করে খরচ করতে হবে। রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে হবে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। জ্বালানি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি দরকার, জনগণকে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া। সংকটের সময় সরকারের কাজ শুধু মানুষকে বলা নয় যে ‘সমস্যা আছে’।সরকারের কাজ হলো দেখানো— সমস্যা আছে, কিন্তু সমস্যার মোকাবিলার পরিকল্পনাও আছে।

ভালো সময়ে দেশ চালানো তুলনামূলক সহজ।রাজস্ব আসে, রপ্তানি বাড়ে, জ্বালানির দাম কম থাকে, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কম থাকে—তখন যে কেউ কিছুটা স্বস্তিতে প্রশাসন চালাতে পারে।কিন্তু আসল পরীক্ষা আসে খারাপ সময়ে। যখন তেলের দাম বাড়ে। গ্যাসের সরবরাহ কমে। ডলার কমে। রপ্তানি বাজারে চাপ পড়ে। রেমিট্যান্স নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। আর একই সময়ে চারপাশে যুদ্ধ শুরু হয়। সেই সময় যে সরকার পরিস্থিতির দিকে শুধু তাকিয়ে থাকে, তার সঙ্গে আর যে কেউ রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে—এমন ধারণা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

কিন্তু যে সরকার আগেভাগে হিসাব করে, বিকল্প পথ তৈরি করে, কূটনৈতিক সম্পর্ক কাজে লাগায়, সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং জনগণের ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনে—সেই সরকারই সংকট ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা দেখাতে পারে। আজ বাংলাদেশের সামনে সেই পরীক্ষাই। তেলের দাম বৃদ্ধি হয়তো সবে শুরু। এখন দেখার বিষয়, সরকারের পরিকল্পনাটাও কি শুরু হয়েছে?