দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের দমচাপা অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত ও রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া দল আওয়ামী লীগ এবং তাদের অঙ্গসংগঠনের তৎপরতা সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। দলটি কেবল মাঠপর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, তাদের পলাতক শীর্ষ নেতৃত্ব দেশের বাইরে বসে সরকারবিরোধী ও দেশবিরোধী নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কিন্তু এই অপতৎপরতা রুখতে সরকারের পক্ষ থেকে যে ধরনের কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, সেখানে এক ধরনের ধীরগতি ও উদাসীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ফ্যাসিবাদকে চিরতরে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সরকারের এই ঢিলেঢালা ভাব জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার মধ্যেও দলটির সাংগঠনিক তৎপরতার নানা খবর সামনে আসছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার গুলশানে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি ঝটিকা মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, সেখানে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন জড়ো হয়েছিল এবং পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ। পরে ওই ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয় এবং কয়েক দফায় বহু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর উত্তর শাখাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই মিছিলের দায় স্বীকার করে পোস্ট দিয়েছিল।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেত্রী বর্তমানে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অবস্থান করছেন। সেখানে বসেই তিনি দলের পলাতক ও আত্মগোপনে থাকা নেতাদের নিয়ে নিয়মিত বৈঠক করছেন। সম্প্রতি দিল্লির একটি তিনতলা ভবনে কেন্দ্রীয় কমিটির ২১ জন নেতার সঙ্গে তিনি সরাসরি বৈঠক করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে অবস্থানরত অন্যান্য পলাতক নেতারা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই বৈঠকে যুক্ত হন। বৈঠকে আগামী ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার বিভিন্ন রোডম্যাপ বা কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী আকাশপথ কিংবা স্থলপথে দেশে ফেরার নানামুখী পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এমনকি বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করে সারা দেশে নেতাকর্মীদের নিয়ে মিছিল বা শোডাউনের মতো কর্মসূচির কথা ভাবছে দলটি।

তবে দিল্লির ওই বৈঠকের ধরন নিয়ে প্রতিবেদনভেদে কিছু পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় নেতাদের সরাসরি উপস্থিতিতে বৈঠকের কথা বলা হয়েছে, আবার আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ভার্চুয়াল বৈঠকের কথা জানানো হয়েছে। ফলে বৈঠকের সব অংশ সরাসরি অনুষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যে দিল্লি ও দেশের বাইরে থেকে সাংগঠনিক যোগাযোগ বজায় রাখছে, সেটি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা নিজেই জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।

দিল্লিতে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও শেখ হাসিনা কিন্তু বেশ চিন্তিত। বৈঠকের ভেতরের খবর বাইরে বা গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তিনি দলীয় নেতাদের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং বকাঝকা করেছেন। কারণ, প্রকাশ্যে এসব বৈঠকের তথ্য এলে ভারতের সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। দিল্লি যদি এসব কারণে তাকে সহায়তা করতে না পারে, সেই আশঙ্কা তার মনে জেঁকে বসেছে। দিল্লিতে বসে নিজের নিরাপত্তাকে অক্ষুণ্ন রেখে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাই যেন তার মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। বিদেশে বসে তিনি দেশের অভ্যন্তরে থাকা নেতাকর্মীদের প্ররোচনা দিচ্ছেন, ইন্ধন জোগাচ্ছেন এবং অর্থ ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছেন।

শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরার ঘোষণা অবশ্য শুধু দলীয় সূত্রের দাবি নয়। গত জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরতে চান এবং দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে ডিসেম্বরের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক আলোচনায় যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে দেশে ফিরে কী ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি নেওয়া হবে, বেনাপোল দিয়ে প্রবেশ বা দেশজুড়ে শোডাউনের পরিকল্পনার মতো নির্দিষ্ট বিষয়গুলোর বিষয়ে প্রকাশ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য এখনো সীমিত।

শীর্ষ নেতৃত্বের এমন সবুজ সংকেত ও ইন্ধন পেয়ে দেশে থাকা ঝিমিয়ে পড়া বা আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা হঠাৎ করেই সরব হতে শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় ঝটিকা মিছিল ও নাশকতার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষের নজর এড়াতে ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরপাকড় থেকে বাঁচতে তারা রাতের গভীরে বা ভোরবেলায় মিছিল বের করছে। সম্প্রতি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে গভীর রাতে মোটরসাইকেল নিয়ে মশাল মিছিল করতে দেখা গেছে দলটির অনুসারীদের। রাজধানীতেও একাধিক স্থানে এমন ঘটনা ঘটেছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের আগে কূটনৈতিক এলাকা গুলশানে শতাধিক নেতাকর্মী ঝটিকা মিছিল করে আতঙ্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। পুলিশ ছত্রভঙ্গ করতে গেলে তারা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এ ঘটনায় পুলিশ ১৫০ থেকে ২০০ জনের জমায়েতের কথা জানিয়েছে এবং ঘটনাস্থল থেকে ককটেল উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।

শুধু মিছিলেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, রাজধানীতে নাশকতার নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। কাফরুলে বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ, মহাখালী ও আগারগাঁও এলাকায় ফ্লাইওভারের ওপর থেকে দ্রুতগামী মোটরসাইকেল থেকে ককটেল ছুড়ে মারার মতো ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের হামলায় সাধারণ জনমনে নতুন করে আতঙ্ক ও ভীতি দেখা দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ক্ষমতাচ্যুত এই দলটি ও তাদের সহযোগীরা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে বিশৃঙ্খলা ছড়াতে এসব হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের পেছনে হাত বাড়িয়েছে। অর্থ ছড়িয়ে এসব কাজে লোক ভাড়া করা হচ্ছে বলেও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যাচ্ছে।

১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ, মহাখালী ও আগারগাঁওসহ কয়েকটি এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায় এবং কাফরুলে একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশ এসব ঘটনার তদন্ত করছে। তবে একই দিনে ঘটে যাওয়া সব বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে, এমন তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। এ জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নাশকতার প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকলে তা তদন্তে প্রমাণিত হওয়া দরকার। কিন্তু একই দিনে রাজধানীর একাধিক স্থানে ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা, তাতে সন্দেহ নেই।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আওয়ামী লীগের এই অপতৎপরতার পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে এখনও লুকিয়ে থাকা দলীয় অনুসারী বা সুবিধাবাদীদের ইন্ধন রয়েছে। সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে পুলিশ প্রশাসনকে যেভাবে দলীয়করণ করা হয়েছিল, তার জের এখনও কাটেনি। পুলিশের ভেতরে থাকা এক শ্রেণির কর্মকর্তা ও সদস্য দলটির পুনরুত্থানের আশায় গোপনে কাজ করে যাচ্ছেন। এর প্রমাণ মেলে গুলশানের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায়। কূটনৈতিক অঞ্চলের মতো জায়গায় পুলিশের নজর এড়িয়ে এত মানুষ কীভাবে একত্র হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জানা গেছে, মিছিলের আগে রাতের বেলায় পুলিশের কতিপয় সদস্যের কাছ থেকে অভয় পেয়েই এই মিছিল নামানো হয়েছিল।

গুলশানের ঘটনার পর প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়। ১১ সেপ্টেম্বরের ওই মিছিলের পাঁচ দিন পর গুলশান বিভাগের উপকমিশনার ও গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ডিএমপি সদরদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। ডিএমপি অবশ্য এ সিদ্ধান্তকে প্রশাসনিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুলশানের মিছিলের ঘটনায় দায় স্বীকার করেনি। কিন্তু এত বড় একটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের মিছিল, তাও কূটনৈতিক এলাকার গুরুত্বপূর্ণ অংশে, পুলিশের চোখ এড়িয়ে কীভাবে সংগঠিত হলো—এই প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া দরকার।

একই ধরনের ঘটনা ধরা পড়ে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাকিবুল হাসানের ক্ষেত্রেও। তার একটি বিতর্কিত অডিও রেকর্ড সামনে আসে, যেখানে তাকে বলতে শোনা যায় যে, আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসবে এবং শেখ হাসিনা ফিরলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না। একজন দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তার মুখ থেকে এমন কথা বের হওয়া প্রমাণ করে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে এখনো ফ্যাসিবাদের শিকড় কতটা গভীরে গেঁথে আছে। সাবেক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা, যেমন চাকরিচ্যুত মনিরুল ইসলাম বিদেশে বসে পুলিশের নিচের সারির কর্মচারীদের উসকে দিচ্ছেন। তিনি অপপ্রচার চালাচ্ছেন যে, পুলিশকে শুধু রাজনীতি ঠেকানোর কাজে ব্যবহার করায় ক্রাইম কন্ট্রোল ভেঙে পড়ছে। এই ধরনের কথাবার্তা বাহিনীর ভেতরের অসাধু সদস্যদের আরও বেশি সাহস যোগাচ্ছে।

তবে রাকিবুল হাসানের অডিওর ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা জরুরি। পুলিশ সূত্র প্রাথমিকভাবে কণ্ঠটি তার বলে শনাক্ত করার কথা জানালেও রাকিবুল নিজে অডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেছেন। ডিএমপি তাকে প্রত্যাহার করে সদরদপ্তরে সংযুক্ত করেছে এবং পরে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে অডিওটির বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ফলে অডিওটির কারিগরি সত্যতা তদন্তে নিশ্চিত হওয়ার আগেই সেটিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। কিন্তু একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার নামে এমন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়া এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে প্রত্যাহার ও জিজ্ঞাসাবাদ করা—দুটিই পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার প্রশ্নকে সামনে এনেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা এই অনুসারীরা আওয়ামী নেতাকর্মীদের আগাম তথ্য দিয়ে পার পাইয়ে দিচ্ছে অথবা নীরব ভূমিকা পালন করছে। সরকারের পক্ষ থেকে দেশের নিরাপত্তার জন্য সতর্ক থাকার কথা বলা হলেও বাহিনীর ভেতরটা পরিষ্কার করার ব্যাপারে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে আগুন এবং পুলিশের ভেতরে দলীয় মানসিকতার প্রকাশ পাওয়ার পর সরকারের কিছুটা টনক নড়েছে বলে মনে হয়। সরকার হয়তো এখন কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে, যেমন গুলশানের ঘটনার পর সেখানে যুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের ক্লোজড বা প্রত্যাহার করা হয়েছে, কিন্তু এগুলো কেবলই সাময়িক বা বাহ্যিক পদক্ষেপ। পুলিশ বাহিনীকে পুরোপুরি ফ্যাসিবাদের প্রভাব থেকে মুক্ত বা পুনর্গঠন করার যে মূল কাজ, সেখানে সরকারের কার্যকারিতা একেবারেই শূন্যের কোঠায়।

সরকার অবশ্য বলছে, পুলিশকে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং পুলিশের মনোবল ও সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে কাজ চলছে। এই বক্তব্য এবং গুলশান ও ক্যান্টনমেন্ট থানার ঘটনায় নেওয়া প্রশাসনিক পদক্ষেপকে একেবারে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এসব ব্যবস্থা কি বিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি পুলিশ ও প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাবের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যারও সমাধান করবে?

অন্যদিকে, রাজপথের মূল বিরোধী দল বা সরকারের অংশীদার হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা বিএনপির ভূমিকা নিয়েও জনমনে নানা বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিএনপি নেতাদের মুখে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা সময়ে গরম কথা শোনা গেলেও বাস্তব চিত্র বেশ ভিন্ন। মাঠপর্যায়ে বিএনপির বেশ কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অসাধু লোকজনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমঝোতা বা আঁতাত করার অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের সুবিধাবাদী বা প্রভাবশালী নেতাদের আশ্রয় দেওয়ার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেনের খবর প্রকাশ্যে আসছে। টাকা খেয়ে কিংবা নিজেদের আখের গোছাতে বিএনপির অনেক স্থানীয় নেতা আওয়ামী লীগের লোকজনকে গোপনে মিছিল বের করার বা নিরাপদে থাকার সুযোগ করে দিচ্ছে।

এই অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ এসেছে বিএনপির ভেতর থেকেই। গত আগস্টে ঝালকাঠি-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল প্রকাশ্যে স্থানীয় দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাহারা দেওয়া, তাদের পক্ষে তদবির করা, আওয়ামী লীগের বাড়িঘর পাহারা দেওয়া এবং অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগের সদস্যদের বিএনপিতে যোগ দেওয়ানোর অভিযোগ তোলেন। তিনি স্থানীয় নেতাকর্মীদের এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানান। অর্থাৎ মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আর্থিক ও রাজনৈতিক সমঝোতার অভিযোগ কেবল বাইরে থেকে ওঠেনি; বিএনপির একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যও প্রকাশ্যে এমন অভিযোগ তুলেছেন।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল হলেও নিজেদের এই ধরনের অসাধু নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বা কঠোর কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে না। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে এসব অপকর্ম দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। যা স্পষ্টত এক ধরনের দ্বিমুখী আচরণ। একদিকে জনসম্মুখে ফ্যাসিবাদবিরোধী স্লোগান দেওয়া, অন্যদিকে গোপনে তাদের পুনর্বাসনে সহায়তা করা। এই দ্বিমুখী নীতির কারণে রাজনীতিতে আজ চরম আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।

তবে এখানে একটি পার্থক্যও মনে রাখা দরকার। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের বিরোধিতা করছে। গত জুনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেছিলেন, আওয়ামী লীগ বিদেশে পাচার করা অর্থ ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ঘোষিত রাজনৈতিক অবস্থান এবং মাঠপর্যায়ে ওঠা এসব অভিযোগের মধ্যে একটি স্পষ্ট ফারাকের অভিযোগই সামনে আসছে। এই ফারাক দূর করার দায়িত্বও শেষ পর্যন্ত বিএনপিরই।

সরকার ও প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির এই নিষ্ক্রিয়তা, উদাসীনতা এবং দ্বিমুখী নীতির সুবিধা নিচ্ছে পলাতক আওয়ামী লীগ। তারা দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে নেটওয়ার্ক মজবুত করছে। একদিকে সরকারের পুলিশ বাহিনীকে পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে না পারার চরম ব্যর্থতা, আর অন্যদিকে বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের নীতিহীন আঁতাত। এই দুইয়ের সুযোগ নিয়ে নিষিদ্ধ এই দলটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে যদি পুলিশ ও প্রশাসনে থাকা দলীয় লোকদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের কর্মীদের অপকর্ম না থামায়, তবে সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করবে।

আওয়ামী লীগের তৎপরতা যে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, তারও উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ দলটির ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা এবং গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর মুন্সিগঞ্জে ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতির অভিযোগে ৩১ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে তিনটি মাইক্রোবাস ও রাজনৈতিক প্রচারসামগ্রী উদ্ধারের কথাও বলা হয়েছে। ফলে নিষিদ্ধ দলটির সংগঠন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না।

অস্থিরতা তৈরি করে দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিঘ্নিত করার যে চক্রান্ত চলছে, তা প্রতিরোধ করা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক দ্বিচারিতা বজায় থাকলে নিষিদ্ধ ও বিতর্কিত দলকে ঠেকানো সত্যিই সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে। দিনশেষে সাধারণ মানুষ কেবল একটাই প্রশ্ন করছে, সরকার কি সত্যিই মনে-প্রাণে ফ্যাসিবাদীদের রুখে দিতে চায়, নাকি তাদের নিয়ন্ত্রণ করার সামর্থ্য তারা হারিয়ে ফেলেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের বক্তব্যে নয়, আগামী দিনগুলোর কার্যক্রমেই মিলবে। একই সঙ্গে বিএনপির কাছেও প্রশ্ন থাকবে, তারা কি নিজেদের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের ওপর কার্যকর সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে? আর রাষ্ট্র কি এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে পারবে, যেখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় অপরাধের বিচার থেকে কাউকে রেহাই দেবে না? কারণ ফ্যাসিবাদী বা কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান শুধু একটি দলকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে হয় না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগের মধ্য দিয়েই সেই লড়াইকে অর্থবহ করতে হয়।