বাংলাদেশকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ নতুন কিছু নয়। নতুন যেটি, তা হলো সেই আগ্রহের মাত্রা ও ধরন। আজ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় শক্তির গোয়েন্দা ও কৌশলগত মূল্যায়নের তালিকায় বাংলাদেশ আছে। কেউ সীমান্ত, নদী ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সংযোগ দেখছে, কেউ বন্দর ও বিনিয়োগ, কেউ বঙ্গোপসাগরের নৌপথ ও ইন্দো-প্যাসিফিকের ভারসাম্য দেখছে। এটি আতঙ্কের খবর নয়, এটি অবস্থানের মূল্য। প্রশ্নটা তাই আবেগের নয়, হিসাবের। কেন বাংলাদেশ এত গুরুত্বপূর্ণ, আর সেই গুরুত্বের বিপরীতে আমাদের প্রস্তুতি কতটা?
একদিকে বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্ত। চট্টগ্রাম, মোংলা ও মাতারবাড়ীর মতো বন্দর আছে। আর সামনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজার এবং ইন্দো-প্যাসিফিকের কৌশলগত বাস্তবতা রয়েছে।
হিসাবটা কাগজেও আছে। ২০১২ সালের ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ট্রাইব্যুনাল মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধে বাংলাদেশকে ১ লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার অধিকার দেয়। ২০১৪ সালের ৭ জুলাই হেগের স্থায়ী সালিসি আদালত ভারতের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশকে দেয়। সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা পাওয়া গেছে। এটি দেশের স্থলভাগের প্রায় সমান একটি ভূখণ্ড, যার নিচে জ্বালানি এবং ওপরে বাণিজ্যপথ রয়েছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশ শুধু একটি জনবহুল দেশ নয়, বাংলাদেশ একটি ভূরাজনৈতিক অবস্থান। আর যেখানে ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বেশি, সেখানে শুধু বন্ধু থাকে না, সেখানে স্বার্থ, প্রতিযোগিতা এবং প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা থাকে।
ষড়যন্ত্রের গল্প বনাম প্রমাণের দায়
এখানেই সবচেয়ে জরুরি কথাটি বলে নেওয়া দরকার। প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনা বিদেশি ষড়যন্ত্র নয়। কোনো অভিযোগকে সত্য বলতে হলে প্রমাণ লাগে।
বরং উল্টোটাই বেশি ঘটে। অপতথ্যের বাজারে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ এখন একটি জনপ্রিয় ফরম্যাট। কারণ এটি সস্তা, আবেগপ্রবণ এবং যাচাই করা কঠিন। ফ্যাক্টচেক সংস্থা ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে প্রকাশিত রাজনৈতিক অপতথ্যের ৬৬ শতাংশই ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সেগুলোর মধ্যে ছিল বানানো উক্তি, ভুয়া দুর্নীতির অভিযোগ, গ্রেপ্তার বা হামলার মিথ্যা খবর।
আবার ঝুঁকিকে অস্বীকার করাও কোনো কৌশল নয়। গোয়েন্দা তৎপরতার বাস্তবতা নিয়ে সম্প্রতি লিখেছেন মেজর জেনারেল (অব.) এইচ আর এম রোকন উদ্দিন। তাঁর মূল্যায়ন অনুযায়ী, কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় শক্তিগুলোর তথ্য সংগ্রহের আগ্রহও বেড়েছে। ভারতের আগ্রহ মূলত শিলিগুড়ি করিডোর, সীমান্ত, নদী ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগ ঘিরে। চীনের আগ্রহ বিআরআই বিনিয়োগ, বন্দর ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তায়। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ইন্দো-প্যাসিফিক ভারসাম্য, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতায়। কিন্তু একই লেখায় তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রতিটি রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচন বা অর্থনৈতিক সংকটকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার অভ্যন্তরীণ কারণ আড়ালে পড়ে এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি দুর্বল হয়।
দুটি সতর্কতা একসঙ্গে ধরে রাখাই আসল কাজ। রাষ্ট্র যদি সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আগেই প্রস্তুত না থাকে, তাহলে সংকট তৈরি হওয়ার পর করার মতো অনেক কিছু আর থাকে না। আবার প্রমাণ ছাড়া অভিযোগে ভর করে নীতি বানালে ভুল জায়গায় শক্তি খরচ হয়।
তাই প্রশ্নটা শুধু ‘কে আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে’ তা নয়। প্রশ্নটা আরও বড়। আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি এমন কোনো দুর্বলতা তৈরি করে রাখছে, যা অন্য কেউ ব্যবহার করতে পারে?
পাহাড়: শুধু ভূখণ্ড নয়, কৌশলগত সীমান্ত
রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান বাংলাদেশের মানচিত্রের একটি অংশ মাত্র নয়। এটি একইসঙ্গে ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্ত, আর এর কাছেই চট্টগ্রাম ও বঙ্গোপসাগরের অর্থনৈতিক অঞ্চল অবস্থিত।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি দুই দশকের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটিয়েছিল। কিন্তু চুক্তির সব ধারা বাস্তবায়িত হয়নি, আর সহিংসতাও পুরোপুরি থামেনি। ২০২২ সালে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) উত্থান এবং ২০২৪ সালে ব্যাংক ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনাগুলো পাহাড়ে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি করে। বিশ্বাসযোগ্য হিসাব অনুযায়ী, এখনো তিন পার্বত্য জেলায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার সেনাসদস্য মোতায়েন আছেন। অন্যদিকে ২০২৬ সালের এপ্রিলে সরকারের শান্তি কমিটি ও কেএনএফের মধ্যে বান্দরবানে সংলাপ হয়েছে, যাকে অংশগ্রহণকারীরা সৌহার্দ্যপূর্ণ বলেছেন।
সাম্প্রতিক উদ্বেগটি সীমান্তের ওপার থেকে আসা। নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে দেশীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে, মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্য হয়ে অবৈধ অস্ত্র পাহাড়ে ঢুকছে এবং আরাকান আর্মি, ইউপিডিএফ ও কেএনএফের মধ্যে সমন্বয়ের অভিযোগ রয়েছে। এখানে সতর্কতা জরুরি। এগুলো নিরাপত্তা সংস্থার মূল্যায়ন ও অভিযোগ, কিন্তু আদালতে প্রমাণিত তথ্য নয়। রাষ্ট্রের কাজ প্রমাণ সংগ্রহ করা, আর সাংবাদিকের কাজ অভিযোগ ও প্রমাণের পার্থক্য পাঠককে বুঝিয়ে দেওয়া।
নীতিটা তাই স্পষ্ট হওয়া উচিত। পাহাড়ের সাধারণ মানুষের অধিকার, মর্যাদা, ভূমি-বিরোধের নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আর কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী যদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। এই দুটি কাজ পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একটি ছাড়া অন্যটি টেকে না। কারণ অবিচার যত বাড়ে, বাইরের শক্তির ব্যবহারযোগ্য অসন্তোষও তত বাড়ে।
রোহিঙ্গা ও রাখাইন: সীমান্তের ওপারে যুদ্ধ, এপারে চাপ
রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক সংকট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক, অস্ত্র, মানবপাচার এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আরাকান আর্মি মংডু দখলের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের প্রায় পুরোটার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে। সে সময় নাফ নদে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এরপর থেকে জেলে অপহরণ, পণ্যবাহী জাহাজ আটকে রেখে ‘কর’ আদায় এবং বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার ঘটনা নিয়মিত হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে নাফ নদ থেকে প্রায় দুই শ জেলে অপহৃত হয়েছেন, আর একই বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে সীমান্তে জব্দ হয়েছে প্রায় ২৮ লাখ ইয়াবা। ধারণা করা হয়, দেশে আসা মাদকের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে সমুদ্রপথে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধান বলছে, নগদ অর্থের বদলে এখন বাংলাদেশি পণ্যের বিনিময়ে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে টেকনাফ স্থলবন্দরের বাণিজ্য কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমছে। ২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের জন্য চাওয়া হয়েছে ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলার, যা ২০২৫ সালের চাহিদার চেয়ে ২৬ শতাংশ কম। এটি ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী সহায়তার হিসাব মাত্র।
অর্থাৎ বোঝা বাড়ছে এবং অর্থ কমছে। মানবিক দায়িত্ব বাংলাদেশ পালন করবে, কিন্তু প্রত্যাবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক দায়-বণ্টনের প্রশ্নে অবস্থান হতে হবে কঠিন এবং ধারাবাহিক। নিজের মানুষের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলে অন্যের সংঘাতের স্থায়ী বোঝা বহন করা সম্ভব নয়।
যুদ্ধটা এখন মোবাইলের পর্দাতেও
আজকের সবচেয়ে সস্তা অস্ত্রটির নাম তথ্য। একটি বিকৃত ভিডিও, একটি সাজানো ছবি কিংবা একটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট কয়েক ঘণ্টায় লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
সংখ্যাগুলো দেখলে তা স্পষ্ট হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে নয়টি ফ্যাক্টচেক সংস্থা ৬৯০টি আলাদা ভুয়া ‘ফটোকার্ড’ শনাক্ত করেছে। অর্থাৎ মূলধারার গণমাধ্যমের লোগো ও নকশা নকল করে এসব মিথ্যা কার্ড বানানো হয়েছিল। ওই সময়ের প্রায় অর্ধেক রাজনৈতিক অপতথ্যের উৎসই ছিল এগুলো। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগের রাতে ভোট শুরুর আগেই ডিসমিসল্যাব ৩০টি এবং রিউমর স্ক্যানার ১২ ঘণ্টায় ২৭টি অপতথ্য যাচাই করে ভুল প্রমাণ করে। এআই দিয়ে বানানো ভিডিও ও কণ্ঠ নকল করে ছড়ানো বার্তাও এখন নিয়মিত ঘটনা।
লক্ষ করার বিষয়, এই অপতথ্যের বড় অংশই বিদেশি নয়, বরং দেশীয়। কিন্তু ফল একই দাঁড়ায়। সমাজ বিভক্ত হলে বাইরের শক্তির কাজ সহজ হয়ে যায়। ধর্ম, দল, অঞ্চল, পাহাড়-বাঙালি কিংবা ‘ভারতপন্থী-চীনপন্থী’ লেবেল, যে বিভাজনই জাতীয় স্বার্থকে দুর্বল করে, সেটিই ঝুঁকি বাড়ায়।
তাই শেয়ার করার আগে তিনটি প্রশ্ন করা উচিত: উৎস কী, প্রমাণ কী এবং কার লাভ হচ্ছে?
অর্থনীতি ও জ্বালানিও এখন জাতীয় নিরাপত্তা
জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখন সম্ভবত জ্বালানিতে দেখা যাচ্ছে। গবেষণা সংস্থা আইইইএফএর হিসাবে, বায়োমাস বাদ দিলে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে আমদানি-নির্ভরতা দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যা ছিল ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ। বিদ্যুতের প্রায় ৬৪ শতাংশ আসে গ্যাস থেকে, আর ২০২৫ সালে আমদানি করা এলএনজির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এসেছে হরমুজ প্রণালি হয়ে। এই পথটি ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ শুরু হওয়া যুদ্ধের পর কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলস্বরূপ, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্টে এলএনজি আমদানি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে এবং জুলাই থেকে আগস্টে পতন ঘটেছে প্রায় ৮৩ শতাংশ। ১১ আগস্ট বিদ্যুতের ঘাটতি পৌঁছায় ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটে, যা মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ। চলতি বছরে বাড়তি জ্বালানি আমদানি ব্যয় ২৮০ কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা দেশের বাণিজ্য ঘাটতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ মিশ্রণে ভারত থেকে আমদানির অংশ রেকর্ড ১৫ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে, আগের বছর যা ছিল ১২ শতাংশ। সরকার এখন ২০৫০ সাল পর্যন্ত সমন্বিত জ্বালানি-নিরাপত্তা পরিকল্পনার কথা বলছে, যার জন্য প্রয়োজন ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ।
নির্ভরতা মাত্রই ঝুঁকি নয়, তবে বিকল্পহীন নির্ভরতাই ঝুঁকি। একটি রুট, একটি সরবরাহকারী কিংবা একটি প্রতিবেশীর ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থায় যুদ্ধ ছাড়াই একটি দেশকে চাপে ফেলা যায়।
সাইবার: ব্যাংক সুরক্ষিত হচ্ছে, বাকিরা?
২০১৬ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ চুরির পর আর্থিক খাতে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৯ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন সাইবার সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক জারি করেছে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পেমেন্ট অপারেটরদের ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে তা মানতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে চিফ ইনফরমেশন সিকিউরিটি অফিসার নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং যেকোনো ঘটনা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এই কাঠামো মূলত ব্যাংকিং খাতের জন্য প্রযোজ্য। বিদ্যুৎ গ্রিড, টেলিকম নেটওয়ার্ক, বন্দর, হাসপাতাল, ভোটার ডেটাবেজ ও সাবমেরিন ক্যাবল এখনো পুরোনো ও খণ্ডিত বিধিবিধানের ভরসায় চলছে। আইনি দিক থেকে ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল সাইবার নিরাপত্তা আইন কার্যকর হয়েছে এবং গঠিত হয়েছে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা। সরকার একে আধুনিকায়ন বলছে, আর মানবাধিকার সংগঠন ও সাংবাদিক সংগঠনগুলো বলছে, আগের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু দমনমূলক বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে। এই বিতর্কের নিষ্পত্তি জরুরি, কারণ নাগরিকের আস্থা ছাড়া সাইবার প্রতিরক্ষা দাঁড়ায় না।
বন্দর: বিনিয়োগ আসুক, নিয়ন্ত্রণের শর্ত থাকুক স্পষ্ট
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দেশের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ৪০ শতাংশের বেশি সামলায়। এই টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার আলোচনা দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চূড়ান্ত পর্যায়ে বলে সরকার জানিয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বে টার্মিনাল এবং জাইকার অর্থায়নে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ চলছে। মাতারবাড়ীতে ৭৬০ মিটার টার্মিনাল নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৯ সাল।
এখানে ভারসাম্যটা জরুরি। বিদেশি অপারেটর মানেই সার্বভৌমত্ব বিক্রি নয়, বিশ্বের বহু দেশেই বন্দর পরিচালনা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে। কিন্তু চুক্তির মেয়াদ, ট্যারিফ নির্ধারণের ক্ষমতা, তথ্য ও ডেটার নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত শর্ত এবং প্রস্থানের পথ যদি জনসমক্ষে স্পষ্ট না থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। সমালোচকেরা আরও বলছেন, মাতারবাড়ী, বে টার্মিনাল ও চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় মহাপরিকল্পনা ছাড়া সমান্তরাল মেগাপ্রকল্প শেষ পর্যন্ত অপচয় ডেকে আনতে পারে।
তাহলে বাংলাদেশ কী করবে
প্রথমত, জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের জন্য একটি পেশাদার সচিবালয় গঠন করতে হবে, যা বিভিন্ন সংস্থার মূল্যায়ন একত্র করে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের সামনে একক ও সমন্বিত বিশ্লেষণ দেবে। দ্বিতীয়ত, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আইনি ম্যান্ডেট সুনির্দিষ্ট করা এবং সংসদীয় তদারকি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনও ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের সংস্কারের সুপারিশ করেছে। কারণ রাজনৈতিক নজরদারিতে ব্যস্ত সংস্থা কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্সে দুর্বল হতে বাধ্য।
তৃতীয়ত, সাইবার নিরাপত্তাকে ব্যাংকের গণ্ডি থেকে বের করে বিদ্যুৎ, টেলিকম, বন্দর, স্বাস্থ্য, ভোটার ডেটাবেজ ও সাবমেরিন ক্যাবল পর্যন্ত সম্প্রসারণ করতে হবে।
চতুর্থত, জ্বালানিতে সময়সীমাবদ্ধ রোডম্যাপ তৈরি করা জরুরি। এর মধ্যে থাকবে দেশীয় অনুসন্ধান, সরবরাহের উৎস ও রুটের বহুমুখীকরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ। পঞ্চমত, বন্দর ও কৌশলগত অবকাঠামোর ছাড় দেওয়ার একটি স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করতে হবে। যার মধ্যে থাকবে উন্মুক্ত দরপত্র, প্রকাশিত চুক্তি এবং সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনা।
ষষ্ঠত, বিদেশি অর্থায়ন ও প্রভাবের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও লবিং তৎপরতার তহবিলের উৎস প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। সপ্তমত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও রোহিঙ্গা কূটনীতিতে বহুবর্ষী তহবিল গঠন করতে হবে। আসিয়ান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ওআইসিকে যুক্ত করে দায়-বণ্টনের চেষ্টা চালাতে হবে।
অষ্টমত, পাহাড়ে নিরাপত্তার পাশাপাশি ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে শান্তিচুক্তির অবাস্তবায়িত ধারাগুলোর সময়সূচিভিত্তিক বাস্তবায়ন করতে হবে।
আর সবার ওপরে রাখতে হবে পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য। নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে ‘বাংলাদেশ ও তার জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে’, এবং বিআরআইয়ের মতো উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত হবে লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখে। ঘোষণাটি ঠিক আছে, এখন দরকার একে লিখিত নীতিতে, প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে এবং যাচাইযোগ্য সিদ্ধান্তে রূপান্তর করা।
বন্ধুত্ব থাকবে সবার সঙ্গে, কিন্তু নির্ভরতা কারও ওপর থাকবে না।
সাধারণ মানুষের কী করার আছে
সাধারণ মানুষেরও অনেক কিছু করার আছে। গুজব না ছড়ানো, অপ্রমাণিত তথ্যকে সত্য হিসেবে প্রচার না করা এবং কোনো বিদেশি শক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে অন্ধ অবস্থান না নিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থকে আগে রাখা উচিত।
কোনো দল ভুল করলে প্রশ্ন করুন, সরকার ব্যর্থ হলে জবাবদিহি দাবি করুন। কোনো বিদেশি শক্তি বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে সেটিও প্রশ্ন করুন। শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে শুধু শক্তিশালী সরকার নয়; শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সচেতন নাগরিক এবং জবাবদিহিমূলক রাজনীতি।
শেষ কথা
বাংলাদেশকে ভয় দেখানোর দরকার নেই, আবার চোখ বন্ধ করে থাকারও সুযোগ নেই। আমাদের চারপাশে বড় শক্তিগুলোর স্বার্থ আছে। বঙ্গোপসাগরে, পাহাড়ে, সীমান্তে, বন্দরে, রোহিঙ্গা সংকটে, তথ্যের জগতে এবং অর্থনীতিতে তাদের নজর রয়েছে। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্তটা বাংলাদেশেরই হতে হবে। এই দেশ রক্ষা করবে শুধু সেনাবাহিনী নয়, পুলিশ নয়, গোয়েন্দা সংস্থা নয়, এমনকি কেবল সরকারও নয়।
রাজনৈতিক মতভেদ থাকুক, সমালোচনা থাকুক, বিরোধিতা থাকুক, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে একটি জায়গায় সবাইকে এক থাকতে হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা যদি হয় বিভাজন, তাহলে সেটাই অন্যের সবচেয়ে বড় সুযোগ হবে। সচেতন থাকুন, বিভক্ত হবেন না, প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করবেন না। আর বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের অধিকার বাংলাদেশের হাতেই রাখুন। কারণ দেশ হারানোর আগেই দেশকে রক্ষা করতে হয়, আর সেই দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, আমাদের সবার।








