বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও বিষয়টি নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ভিন্নমুখী, যা সময় সময় নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বরাবর দাবি করে এসেছে যে, স্বাধীনতার ঘোষণা প্রথম কার্যকরভাবে জাতির সামনে তুলে ধরেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৬ ও ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন, যা সারা দেশে প্রতিরোধ যুদ্ধকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে বিএনপি নেতাদের বিভিন্ন সময়ের অনেক বক্তব্যে এটা উঠে এসেছে যে, জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকেই ঘোষণা পাঠ করেছিলেন। তারপরও রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রায়ই তাকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ দলটির শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সময়ে এ বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু ফ্যাসিবাদের তকমা নিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতারা বরাবরই দাবি করে এসেছেন যে, স্বাধীনতার ঘোষক একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমান। দলটির মতে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর গ্রেফতারের আগমুহূর্তে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং তার আহ্বানেই বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের এই অবস্থানের পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে উল্লেখ করা হয় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল প্রণীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে। এতে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। পাশাপাশি ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকেও দলটি স্বাধীনতার কার্যত ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করে। বর্তমানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় গণহত্যা চালানোর দায়ে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। এদিকে, ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের একটি বড় অংশ তুলনামূলক নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করে থাকেন। তাদের মতে, স্বাধীনতার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ঘোষণার উৎস ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, আর সেই ঘোষণাকে যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকরভাবে প্রচার ও সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন জিয়াউর রহমান। বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিতর্ক মূলত রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ভিন্নতা থেকে উৎসারিত। রাষ্ট্রীয় দলিল ও ঘটনাপ্রবাহের সমন্বিত পাঠে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় উভয় ব্যক্তিত্বই ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। স্বাধীনতার ইতিহাসের এই অধ্যায় নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকলেও, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জাতির সম্মিলিত আত্মত্যাগ ও সংগ্রামই বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি এ বিষয়টিতে সব পক্ষই একমত।