৭২ এর সংবিধান আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার দলিল

১৯৭২ সালের সংবিধানকে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নির্মিত দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কেউ কেউ একে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে দাবি করেন। কিন্তু বাস্তবে এটি রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করার একটি কৌশলগত হাতিয়ারে রূপ নেয়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন আমলে সংবিধানের সংশোধন, পুনর্ব্যাখ্যা এবং প্রয়োগের ধরণ নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সেই সাথে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য দুর্বল হয়ে পড়েছে। যা অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী প্রবণতার সঙ্গে তুলনীয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার পরিচালনার জন্য গঠিত মুজিবনগর সরকারের মূল ভিত্তি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। কিন্তু অনেকটা রহস্যজনক ভাবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংবিধান রচনার সময় এই মূলনীতি পরিবর্তিত হয়ে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতায় পরিণত হয়।
১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ রাষ্ট্রে নতুন সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়। পরের বছরই ১৯৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার, জরুরী অবস্থা জারি ও ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বেশকিছু সংশোধনী আনে আওয়ামী লীগ। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সংবিধান সংস্কার হলেও পরের বছর ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের বড় পরিবর্তন ঘটায় তারা। এর মাধ্যমে মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা চালু করা হয়। সেই সাথে সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত ঘোষণা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করা হয়। এর মাধ্যমে সংবিধানের মূলনীতি গণতন্ত্রের এক প্রকার কবর রচিত হয়। এটি ছিল দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী হওয়ার প্রথম ধাপ। যার সমাপ্তি ঘটে ১৯৭৫ এ শেখ মুজিবের হত্যাকান্ডের মধ্যদিয়ে।
পরবর্তীতে জিয়া ও এরশাদের শাসন আমলে সংবিধানের পরিবর্তনগুলো মূলত বহুদলীয় গণতন্ত্র, রাষ্ট্রকাঠামোতে গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথ উন্মুক্ত করার পাশাপাশি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় চেতনার প্রতিফলন ঘটাতে চেষ্টা করেছে। ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে। ১৯৯১ সালে সংবিধান সংশোধন করে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হয়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। কিন্তু সংবিধান সংশোধনের জন্য দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় তারা সংবিধান সংশোধনের কোন চেষ্টা করেনি। ২০০৮ সালে এক/এগারো পার করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় এসেই তারা সংবিধানে হাত দেয়। এর অংশ হিসেবে ২০১০ সালের ২২ জুলাই আওয়ামী লীগের ১২ জন ও ৩ জন স্বতন্ত্র সাংসদ সদস্য নিয়ে মোট ১৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি বিশেষ সংবিধান সংস্কার কমিটি করে। সৈয়দা সাজেদা চৌধুরিকে চেয়ারম্যান ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে কো-চেয়ারম্যান করা হয় ওই কমিটির।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ওই নবম জাতীয় সংসদ থেকে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোট বিলোপ করা হয়। গণভোট একটি রাষ্ট্রে জনগণের সরাসরি মতামত প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থাটি বাতিল করার ফলে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে যায়। এর ফলে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল সহজেই বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে, যা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে ত্বরান্বিত করে। এই পরিবর্তনকে অনেক বিশ্লেষক গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের পরিসর সংকুচিত করার একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখেন।
এছাড়া ওই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ। এটি ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও বিতর্কিত সংশোধন। এই ব্যবস্থা মূলত নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য প্রবর্তিত হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে এটি একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা বিলোপ করা হলে বিরোধী দলগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। এর মধ্য দিয়ে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ সাংবিধানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
ফলশ্রুতিতে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের দোহাই দিয়ে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে পরবর্তী ২০১৪ এর প্রার্থী বিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালের রাতের ভোট ও ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচন আয়োজন করে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে। এছাড়া এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস এর বদলে ধর্মনিরপেক্ষতা পুন:স্থাপন করে ৭২ এর সংবিধানের মূলনীতি ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়। যদিও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবিধানে উল্লেখ রাখা হয়।
ফলে সংবিধানের মধ্যে একটি মতাদর্শগত দ্বৈততা লক্ষ্য করা যায়, যা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে একদিকে যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখা হয়েছে। সেই সাথে সংবিধানের সূচনায় ধর্মীয় বাক্যাংশও অক্ষুণ্ণ রাখা হয়। আওয়ামী লীগের এই অবস্থানকে অনেকেই একটি সচেতন রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেন, যা ভিন্নমুখী জনমতকে একসঙ্গে ধরে রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু একই সঙ্গে সংবিধানের আদর্শিক সামঞ্জস্যতাকে দুর্বল করে।
এছাড়া এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কঠোর বিধান যুক্ত করা হয়। যার ফলে শেখ হাসিনা সরকার সংবিধানের দালিলিক বৈধতাকে পুঁজি করে আজীবন ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার ব্যবস্থা করে ফেলে। এছাড়া ষোড়স সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অবসারনের ক্ষমতা সংসদের হাতে দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে সংসদীয় কাঠামো ফ্যাসিবাদে রূপান্তরিত হয়।
আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হলো সংবিধানে শেখ মুজিবুর রহমান এর প্রতিকৃতি সংযোজন। সমর্থকদের মতে, এটি জাতির ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের স্বীকৃতি। তবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় দলিলকে দলীয় প্রতীক দ্বারা প্রভাবিত করে। এর মাধ্যমে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি ও প্রতীকী আধিপত্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সংবিধান সংস্কারের এই পর্যায়ে বিরোধী দলগুলো ২০১২ সাল থেকে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলে। কিন্তু আওয়ামী লীগ কৌশলে যুদ্ধাপরাধ ইস্যু এনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ বিতর্ক তৈরি করে। ব্যাপারটা দাড়ায় অনেকটা ডিভাইড এন্ড রুল থিওরির মত। ফলে জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে একপ্রকার অস্বস্তি দেখা দেয়। যার প্রভাব পড়ে এই দুই বড় দলের একক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে। বিভক্তি ছড়িয়ে পড়ে তৃণমূলেও। ফলে বিরোধী দলগুলোর পক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে শক্ত কোন আন্দোলন গড়ে ওঠে নি। কৌশলগত জায়গায় এটা ছিল আওয়ামী লীগের বড় সফলতা।
যাইহোক, এই সংশোধনীগুলোর ফলে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন সাংবিধানিক বৈধতা পায়। ফলে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন গুলোতে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র দলীয় প্রভাব দেখা যায়। ভোটকেন্দ্র দখল, বিরোধী দলের প্রার্থীর প্রচারে বাঁধা, পোলিং এজেন্ট হয়রানি ও গ্রেফতার, জাল ভোট দেওয়া, ভোটকেন্দ্রে যেতে বাঁধা দেওয়া, গ্রেফতার, হয়রানি সহ বিভিন্ন জটিলতায় বিরোধী দলগুলো চরম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। ফলে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এসময়ে দেশের জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনগুলো শুধু নিয়ম রক্ষায় পরিণত হয়।
এদিকে সাংবিধানিক ভাবে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এই কৌশল আওয়ামী লীগকে আরো ভয়ংকর করে তোলে। বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীদের উপর অমানুষিক নির্যাতন, গুম, খুন, মামলা-হামলা নিত্যনৈমত্যিক ঘটনা হয়ে পড়ে। রাজপথের সবথেকে সক্রিয় দল হিসেবে ভূমিকা রাখা জামায়াতের প্রায় সব শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধ নামক বিতর্কিত বিচারের মাধ্যমে ফাঁসি দেওয়া হয়। প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা ও ৩ বারের প্রধান মন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিতর্কিত মামলায় জেলে দেওয়া হয়। বিরোধী দলগুলোর অসংখ্য নেতাকর্মীকে গুম, খুন, নির্যাতন-নিপীড়ন ও হয়রানি মূলক মামলা দিয়ে মূলধারার রাজনীতি থেকে দূরে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালায় আওয়ামী লীগ।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আওয়ামী লীগের সংবিধান সংশোধনের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতার স্থায়িত্ব জারি রাখা। এর একটি ধাপে ছিল ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে আদর্শিক রাজনৈতিক বলয় তৈরী যার বিরুদ্ধে যাতে কখনো প্রশ্নবিদ্ধ করা সম্ভব না হয়। অন্যধাপে ছিল গণভোট ও তত্বাবধায়ক সরকার বিলোপের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতা সংকোচিত করণ ও দলীয় প্রভাব বৃদ্ধি। সব মিলিয়ে সংশোধীত সংবিধান শেষ পর্যন্ত আওয়ামী ক্ষমতার রাজনীতির রক্ষাকবচে পরিণত হয়। যা ফ্যাসিবাদের চুড়ান্ত রূপান্তর।
মোদ্দা কথা, আওয়ামী লীগ তাদের প্রণীত সংবিধানকে যতই ‘অপরিবর্তনীয়’ বা সুরক্ষিত দাবি করুক না কেন, জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে কোনো কাঠামোর বালির বাধের মতো ভঙ্গুর। ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবে ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থান শেখ হাসিনার সাংবিধানিক ফ্যাসিবাদকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। এই পতনের মধ্য দিয়ে সূচিত হয়েছে এক নতুন বাংলাদেশের যাত্রা। আজ এ দেশের সাধারণ মানুষ বিগত আমলের রেখে যাওয়া ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার আমূল বিলোপ ঘটিয়ে একটি বৈষম্যহীন, সফল এবং অর্থবহ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখছে। জুলাইয়ের এই রক্তস্নাত বিজয় কেবল একটি সরকারের পতন নয়, বরং এক নতুন রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বন্দোবস্তের অঙ্গীকার, যেখানে প্রকৃত জনগণই হবে সব ক্ষমতার মূল উৎস।







