বাংলাদেশের মানুষের সহস্রাব্দের শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধ। যা কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্রের জন্ম দেয়নি বরং এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিপ্রস্তর। পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হতে না হতেই দেশের রাজনৈতিক কাঠামো অঙ্কুরেই হোঁচট খায়। যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তির কণ্ঠরোধ, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দমনের নামে বামপন্থিদের নির্মূল আর সব শেষে ভিন্নমত ও সকল দলের সমাধি রচনা করে বাকশালীয় একনায়কন্ত্র। এ অবস্থায় যুদ্ধবিদ্ধস্ত এই দেশের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের নিষ্ঠুর পরিণতি হয় পঁচাত্তরে শেখ মুজিব হত্যার মধ্য দিয়ে। তখনই আবির্ভূত হয় এক নতুন ধারার রাজনীতি। যার অগ্রভাগে ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। দলটির জন্মলগ্ন থেকেই এক অদ্ভুত দ্বান্দ্বিকতার আবর্তে ঘুরপাক খেয়েছে এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। একদিকে তারা বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের ভাবমূর্তিকে পুঁজি করে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে, অন্যদিকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দলকে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে উদারনীতির সূচনা করেছিল। একই সাথে কট্টর বামপন্থার বিপরীতে উদার দক্ষিণপন্থার বিকাশের মাধ্যমে দেশের রাজনীতিকে আরো বিকশিত করেছে। যদিও সমালোচকদের মতে এটি ছিল একটি স্ববিরোধী রাজনৈতিক চর্চা যা কেবল ইতিহাসের বিচ্যুতি নয় বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গায়ে এক সুপরিকল্পিত কুঠারাঘাত। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে যখন ছাত্র-জনতার রক্তে এক নতুন মুক্তির স্বাদ পেয়েছে দেশ, তখন বিএনপির সেই পুরাতন ‘মুক্তিযুদ্ধ কার্ড’ নতুন করে ব্যবচ্ছেদের দাবি রাখে। বিএনপি প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সামরিক ফরমান ও ক্ষমতার অলিন্দে জন্ম নেওয়া এই দলটির মূল লক্ষ্য ছিল একটি বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। যাতে করে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার বৈধতা সৃষ্টি ও তৃণমূল জনসাধারনের সমর্থন আদায় করা যায়। এই প্রক্রিয়ায় জেনারেল জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ এর মোড়ক উন্মোচন করেন। যা ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও উদার দক্ষিণপন্থী ভাবধারার মিশ্রণ। ফলে এই দলটি পরিণত হয় অখন্ড পাকিস্তানের দাবিতে সোচ্চার মুসলীম লীগ সহ দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তি ও পঁচাত্তর পূর্ববর্তী রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার কট্টর বামপন্থীদের সমন্বিত প্লাটফর্মে। দালাল আইন বাতিলের মধ্য দিয়ে যে ক্ষমার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছিল, বিএনপি তাকেই রাজকীয় সংবর্ধনায় রূপান্তর করে। এর ফলে মুসলিম লীগের সেই সব নেতারা, যারা একাত্তরে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার নামে স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিল, তারা আবারও সদর্পে রাজনীতির মূলধারায় ফিরে আসার সুযোগ পান। বিএনপির এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল শাহ আজিজুর রহমানের উত্থান। ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানী বাহিনীর গণহত্যা চলাকালীন সময়ে এই শাহ আজিজুর রহমান পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে কোনো গণহত্যা চালাচ্ছে না। অথচ ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস, সেই ব্যাক্তিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রক্তের সাথে যে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছিল, তা ছিল বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। শুধু শাহ আজিজুর রহমানই নন, জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় জয়পুরহাটের শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুল আলিম থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের অন্যতম স্বাধীনতা বিরোধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরি, স্বাধীনতা বিরোধী মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর সহ অনেকে বিএনপিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। এমনকি মশিউর রহমান যদুমিয়ার মতো ব্যক্তিদের বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার ঘটনা বিএনপির মুক্তিযুদ্ধপন্থী হওয়ার চেয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে রাজনৈতিক সমঝোতাকেই অর্থবহ করে তোলে। যদিও বিগত সময়ে এই স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসন বিতর্ক নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী দল বানানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। তবে চব্বিশের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক দিগন্ত আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ’ বিতর্কের চোরাবালিতে আটকে না থেকে দেশের সাধারণ ছাত্র-জনতা নতুন করে স্বপ্ন দেখছে। ঠিক এই সময়ে রাজনৈতিক মাঠ থেকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিদায়ঘণ্টা বাজার পর বিএনপির ‘মুক্তিযুদ্ধ কার্ড’ ব্যবহারের প্রবণতা যেন এক নতুন মাত্রা লাভ করেছে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ফজলুর রহমান, আন্দালিব রহমান পার্থ সহ বিএনপির কিছু সাংসদ রাজনৈতিক শিষ্টাচার ভুলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের বিষয়টি আবার আলোচনায় এনেছেন। যদিও সালাহউদ্দিন আহমেদ সহ বেশ কয়েকজন সাংসদ একতার ফুলঝুঁরি দিয়ে আলোচনায় ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেছেন। তৃণমূল পর্যায়ে স্বাধীনতাবিরোধী মুসলিম লীগের জনবলকে ব্যবহার করে বিএনপির রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত হয়েছিল, এটি প্রায় সবারই জানা। বিএনপি সরকার জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবে একক মহিমায় আসীন করতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর মতো মুক্তিযুদ্ধে বিরোধীতাকারী দলের সঙ্গে দীর্ঘকাল ক্ষমতার অংশীদার হয়ে সুবিধাভোগ করার নৈতিক দায়ভার তারা এড়িয়ে চলতে চান। এই প্রেক্ষাপটে, বিএনপির এই ‘মুক্তিযুদ্ধ কার্ড’ মূলত একটি রাজনৈতিক দ্বিচারিতা হিসেবেই বারবার প্রমাণিত হয়েছে সাধারণ মানুষের কাছে। যখনই কোনো বাস্তব জনমুখী ইস্যুতে দলটির নেতাকর্মীরা দিশেহারা হয়ে পড়ে কিংবা তাদের অতীত দুর্নীতি ও অদক্ষতার বিরুদ্ধে জনমনে ক্ষোভ জন্মায়, তখনই তারা এই কার্ড খেলে প্রতিবাদের কণ্ঠ রোধ করতে চায়। ছাত্র-জনতার যে বিপ্লব সকল প্রকার ফ্যাসিবাদের অবসান চেয়েছিল, সেখানে বিএনপি আবারও সেই পুরাতন বিভাজনের বিষবৃক্ষ রোপণ করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার চেষ্টায় লিপ্ত। স্বাধীনতা বিরোধী মুসলিম লীগের ভিত্তির উপর দাড়িয়ে একদিকে মুক্তিযুদ্ধে কৃতিত্বের দাবি এবং অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের মূলধারার রাজনীতির ক্ষেত্র প্রস্তুত। এই দুই মেরুর অবস্থানের মাঝে যে বিশাল নীতিগত শূন্যতা রয়েছে, তাকে কোনো চাতুর্যপূর্ণ সাহিত্যিক অলঙ্কার দিয়ে ঢেকে রাখা সম্ভব নয়। তবুও শাহ আজিজুর রহমান কিংবা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীদের মতো ব্যক্তিদের যারা রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তাদের মুখে মুক্তিযুদ্ধের একক বন্দনা স্রেফ স্থূল রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো দলের কুক্ষিগত সম্পত্তি নয়, বরং এটি এক অবিভাজ্য ও চিরন্তন আদর্শ, যা সকল প্রকার সংকীর্ণ ও সুবিধাবাদী রাজনীতির ঊর্ধ্বে।