জঙ্গিবাদ ‘নেই’ বলার রাজনীতি: বাস্তবতা না আত্মপ্রবঞ্চনা?

শেখ হাসিনার বিরোধিতা করতে গিয়ে অনেকে বলেন, দেশে জঙ্গিবাদ বলে কিছু নেই। উগ্রবাদের অভিযোগে শেখ হাসিনার আমলে যেসব ধরপাকড় হয়েছিল, সেগুলোকে ‘নাটক’ বলা হয়। তবে প্রকৃত সত্য হচ্ছে, দেশে জঙ্গি এবং উগ্রবাদী—দুটি শক্তিই আছে। জঙ্গি নেই বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আজ যে দাবি করেছেন, তা সঠিক নয়।
বাংলাদেশে দায়েশ ও আল-কায়েদাপন্থি লোকজন রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে ওই সংগঠনগুলো দুর্বল হয়েছে বলে বাংলাদেশেও তাদের প্রভাব কমেছে। তবে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার-সমর্থিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-ঘনিষ্ঠ কিছু উপাদান বাংলাদেশে উদ্বেগজনক সংখ্যায় রয়েছে। বাংলাদেশি কয়েকজন টিটিপির হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গেছেন। ‘অ্যান্টি-শাতিম’সহ উগ্র চিন্তাধারার লোকজনও ফেসবুক ঘাটলেই পাওয়া যায়। তারা বিদেশি কোনো শক্তির সঙ্গে যুক্ত কি না, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন; তবে তাদের চিন্তাভাবনা স্পষ্টতই টক্সিক ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
টিটিপি বর্তমানে কাবুলকেন্দ্রিক প্রভাব বলয়ের মধ্যে থেকে ভারতের এক ধরনের নীরব সমর্থন পাচ্ছে—এমন বিশ্লেষণও সামনে এসেছে। এ কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান-আফগান উত্তেজনা ও সংঘাতের ঘটনাও ঘটেছে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতে ইসলাম ও মুসলিম পরিচয়ের নানা সংগঠন চাপের মধ্যে রয়েছে; ক্ষেত্রবিশেষে নিপীড়নের অভিযোগও আছে। একই সময়ে দিল্লিতে আফগান সরকারের প্রতিনিধিদের লালগালিচা সংবর্ধনা পাওয়া অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। যে রাজনৈতিক শক্তি একসময় ‘আফগান-হিন্দুস্তান ভাই ভাই’ স্লোগান তুলছে, তারাই ২০২১ সালে তালেবান ইস্যু সামনে এনে ভারতের মুসলিমদের একটি বড় অংশকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছিল—এমন সমালোচনাও রয়েছে।
পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে অনেক কিছুই দ্রুত বদলায়। সুতরাং বাংলাদেশি তরুণদের টিটিপিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টিকে যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জঙ্গিবাদ হিসেবে বিবেচনা না করেন, তাহলে তা বিপদকে উপেক্ষা করার শামিল হবে। কয়েক মাস আগেও কিছু সংগঠন ‘গণতন্ত্র মানে যারা, জাহান্নামে যাবে তারা’—এমন স্লোগান দিয়ে মিছিল করেছে। নির্বাচন ও গণতন্ত্রকে ‘কুফরি’ বা ‘তাগুত’ মনে করা কিছু ব্যক্তি এ দেশে আছে—সংখ্যায় কম হলেও তাদের উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না। তাদের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী বলবেন?
আমরা যারা ইসলাম মানি, তারা জানি—মুসলমানদের মধ্যে বহু মত ও পথ রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে দাড়ি, টুপি, পাগড়ি মানেই সবাই এক—এ ধারণা ভুল। যেমন, কিছুদিন ধরে খেলাফতপন্থি কিছু আলেম ও নেতাকে ‘তাগুত’ আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে—কারণ তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, দায়েশের কালো পতাকা বা তালেবানের সাদা পতাকা উড়ানোর বিরোধিতা করছেন, এমনকি দলের একজন নারীকে এমপি করে সংসদে পাঠাচ্ছেন।
বাকি ইসলামী দলগুলোকে ‘গণতন্ত্রপূজারী’ বা ‘তাগুত’ বলা হয়। সুতরাং ইসলামী দলগুলোর উচিত হবে এই পার্থক্য স্পষ্ট করে জনগণের সামনে তুলে ধরা। তাদেরও যে উগ্রবাদের ঘৃণার শিকার হতে হচ্ছে—এটা বোঝাতে হবে। নইলে দাড়ি-টুপি-পাগড়ির মিলের কারণে উগ্রবাদীরা কোনো ঘটনা ঘটালে তার দায়ও এই দলগুলোর ওপর এসে পড়তে পারে। তাই তাদেরও স্বীকার করতে হবে—দেশে একটি সমস্যা আছে; ছোট করে হলেও আছে। কিন্তু স্বীকার না করলে ভবিষ্যতে সমস্যা আরও বড় হয়ে উঠবে।
সরকারকেও এই সমস্যা স্বীকার করতে হবে। আওয়ামী লীগ অস্বীকারের এই ভুলটি করেছিল। দেশে দায়েশ বা আল-কায়েদার অনুসারী রয়েছে—এটা স্বীকার করলে ভাবমূর্তির ক্ষতি হবে বলে মনে করা হতো। তাই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘জঙ্গি’ তকমা দেওয়া হতো, আর প্রকৃত জঙ্গিদের গোপনে নির্মূল করার চেষ্টা চলত। এতে সমাধানের বদলে সমস্যা আরও জটিল হয়েছে।
যেমন, জঙ্গিবাদের অভিযোগে তুলে নেওয়া ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে বিচার না করে গুম করে রাখাকে সমাধান মনে করা হতো। যেহেতু দায়েশ বা আল-কায়েদার অস্তিত্ব স্বীকার করা হতো না, তাই তাদের অনুসারীদের আটক করার পর প্রকাশ্যে বলা হতো না—কী কারণে ধরা হয়েছে। নানা নাম ও তকমা দিয়ে গল্প তৈরি করা হতো। ফলে এসব সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়নি। বরং গুম, ক্রসফায়ার ও নিপীড়নের কারণে অনেক ক্ষেত্রে মানুষ উল্টো সহানুভূতিও দেখিয়েছে। একই ঘটনা বারবার ঘটতে থাকায় পুরো বিষয়টিই সাধারণ মানুষের চোখে ‘নাটক’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব নিয়েই অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
এই অবিশ্বাস এবং ‘নিপীড়িত’ তকমার কারণে অনেকে ৫ আগস্টের পর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে যান। অবশ্যই আইন অনুযায়ী তাদের আটকে রাখার সুযোগ ছিল না। কারণ, আওয়ামী লীগ সরকার সমস্যাকে আড়াল করতে গিয়ে এমন সব মামলা দিয়েছিল, যেগুলোতে কয়েক বছর জেলে থাকার পর জামিন পাওয়াটা তাদের আইনি অধিকার হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, একজনকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাত বছর সাজা দিয়ে জেলে রাখা হয়েছিল। সাজা ভোগ শেষ হলে তাকে আর আটক রাখার কোনো আইনি সুযোগ থাকে না।
এখন সমস্যার সমাধান হলো—লুকোচুরি না করা, সমস্যাকে স্বীকার করা। যারা ভুল পথে বা ভুল চিন্তার মধ্যে পড়েছে, তাদের জন্য পুনঃশিক্ষা (re-education) কর্মসূচি নিতে হবে, যাতে তারা সঠিক পথে ফিরতে পারে। আর যারা ফিরে আসতে রাজি নয়, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এটা না করে গণতন্ত্রপন্থি এবং গণতন্ত্রবিরোধী ইসলামী শক্তিকে এক কাতারে ফেললে যে ক্ষতি হবে, তা রাজনৈতিক লাভের চেয়ে অনেক বেশি। সুতরাং এমন চিন্তা থাকলে তা পরিহার করা উচিত।
গণতন্ত্রে নানা পথ ও মত থাকবেই, এবং তার সহাবস্থানও থাকতে হবে। কিন্তু যারা গণতন্ত্রকে বিশ্বাস করে না, মৌলিক ও মানবাধিকারের মতো বিষয়কে ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে উপস্থাপন করে—তাদের ব্যাপারে রাষ্ট্রকে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
#লেখক: রাজীব আহাম্মদ, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।







