জুলাইয়ের ‘ছোট্ট শহীদ’ জাবিরের মাকে সংসদে নিচ্ছে জামায়াত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে। জামায়াতের আট নারী যাচ্ছেন সংসদে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে যাচ্ছেন দুজন। এ ছাড়া জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) একজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের একজন এবং জুলাই শহীদ পরিবারের একজনকে নারী আসনের সংসদ সদস্য করা হচ্ছে এই জোট থেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুলাই শহীদ পরিবারের এই সদস্যের নাম রোকেয়া বেগম। তিনি চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর উত্তরায় সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা। গণমাধ্যমে ১১ দলীয় জোটের নারী সংসদ সদস্যদের তালিকা প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অনেকে এই মনোনয়নকে “প্রতীকী” কিন্তু “তাৎপর্যপূর্ণ” বলে মন্তব্য করছেন। ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ বলছেন, একজন ভুক্তভোগী মায়ের উপস্থিতি সংসদে জনমানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরতে পারে।
মাসুদ আলম নামক একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লেখেন, “জুলায়ের হিরো ছোট্ট সেই জাবির আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার মায়ের কণ্ঠ যদি সংসদে যায়, সেটা অন্তত জুলায়ের পক্ষে একটা শক্তিশালী ভাষা সংসদে কথা বলবে। জামায়াত এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে দারুণ কাজ করেছে। তারা প্রমাণ করেছে জুলাই প্রশ্নে তারা উদার এবং আপোষহীন।”
সাকিবুল হাসান নামের আরেকজন লিখেছেন, “বিরোধীদল হিসাবে জামায়াতের এই কাজের প্রশংসা না করলে অবশ্যই আমি বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকবো। বাংলাদেশে একমাত্র জুলাইকে ধারণ কারী দল হলো বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী কারণ এই পর্যায়ে কেউই জুলাইকে মনে রাখেনি বা ধারণ করেনি জামায়াত ছাড়া তার বাস্তব প্রমাণ শহীদ জাবিরের মা মনোনয়ন।”
টুইটারেও (এক্স) বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। সেখানে একজন মন্তব্য করেন, “এটা ইমোশনাল নয়, এটা রিপ্রেজেন্টেশন। জুলাইয়ের যারা ভুক্তভোগী, তাদের কণ্ঠ সংসদে থাকা দরকার।”
তবে কেউ কেউ বিষয়টিকে সম্পূর্ণভাবে প্রতীকী হিসেবেই দেখছেন। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কিন্তু এর মাধ্যমে একটি মানবিক গল্প সামনে এসেছে -এটাই গুরুত্বপূর্ণ।”
রোকেয়া বেগমকে সংসদে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেখানে বিশ্লেষকদের একটি অংশ বিষয়টিকে শুধু মানবিক প্রতিনিধিত্ব নয়, বরং জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেও দেখছেন। তাঁদের মতে, এই মনোনয়ন একদিকে যেমন একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিকে রাষ্ট্রীয় পরিসরে নিয়ে আসছে, অন্যদিকে তেমনি জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলনও ঘটাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাকারিয়া পলাশ বলেন, “জুলাইয়ের ঘটনাগুলোর পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ওই সময় মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন দলের সক্রিয়তা, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সংগঠিত উপস্থিতি ও জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম রাজনৈতিক পরিসরে একটি প্রভাব তৈরি করেছিল।”
তিনি আরও বলেন, “জুলাই পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান, তাদের জনদাবি এবং মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা তাদের একটি ভিন্ন ইমেজ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। রোকেয়া বেগমের মতো একজন ভুক্তভোগীকে সামনে আনা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে জনআবেগ, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্নগুলোকে তারা রাজনৈতিক আলোচনায় রাখতে চাইছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জহির সাদাত বলেন, “জুলাইয়ের ঘটনাগুলো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল। সেই সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি, বিশেষ করে ইসলামপন্থী দলগুলো মাঠে সক্রিয় ছিল এবং তারা নিরাপত্তা, বিচার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নগুলো সামনে এনেছিল।”
তিনি বলেন, “এখন সংসদে রোকেয়া বেগমের মতো একজন ভুক্তভোগীর সম্ভাব্য উপস্থিতি সেই দাবিগুলোকেই একটি প্রাতিষ্ঠানিত জায়গায় নিয়ে আসার চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি একদিকে প্রতীকী, অন্যদিকে রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে।”
আরেক বিশ্লেষক সামিউল হক বলেন, “জুলাই-পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক কার্যক্রমে একটি পুনর্গঠনের প্রবণতা দেখা গেছে। তারা বিভিন্ন সামাজিক ইস্যু, ভুক্তভোগীদের পরিবার এবং জনদাবিকে সামনে এনে রাজনৈতিক বক্তব্যকে বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এই মনোনয়ন সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে তারা শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং মানবিক ও ন্যায়বিচার সংক্রান্ত দাবিগুলোকে সংসদীয় কাঠামোর ভেতরে আনতে চাইছে।”
প্রসঙ্গত, গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট উত্তরার জসীমউদ্দীন সড়কে মা–বাবার সঙ্গে অবস্থানকালে গুলিবিদ্ধ হয় ছয় বছর বয়সী জাবির। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় এলাকায় সংঘর্ষ চলছিল। তাকে প্রথমে একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়, পরে চিকিৎসা সংকটের কারণে একাধিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রোকেয়া বেগম ঘটনার জন্য যথাযথ তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহির দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা পেলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।
টিআই/







