জিন্নাহকে “বাংলাদেশের শত্রু” বলা একপ্রকার কালানুক্রমিক ভুল। তিনি ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মারা যান। স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব তখন কেবল অস্তিত্বহীনই নয়, সেই নামে কোনো রাজনৈতিক প্রকল্পও তাঁর জীবদ্দশায় গঠিত হয়নি।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হিসেবে মাত্র ১৩ মাস বেঁচেছিলেন। পূর্ববঙ্গ তখন পাকিস্তানের পূর্ব অংশ; জনসংখ্যায় তা পশ্চিম অংশের চেয়ে বড়। বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র, মুক্তিযুদ্ধ, অপারেশন সার্চলাইট, বা এমনকি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তপাত—এসব তাঁর মৃত্যুর পরের ঘটনা।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে জিন্নাহর কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে পরবর্তী ইতিহাসের সম্পর্ক ছিল না। তাঁর ১৯৪৮ সালের ভাষানীতি বাঙালির রাজনৈতিক চেতনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল এবং সেই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার যথেষ্ট কারণ আছে। কিন্তু তাঁর জীবদ্দশার সিদ্ধান্তের দায় এবং তাঁর মৃত্যুর পর পাকিস্তানি রাষ্ট্রের ধারাবাহিক সিদ্ধান্তের দায় এক করে দেখা ইতিহাসের পদ্ধতি হতে পারে না।
পূর্ববঙ্গের মুসলমান রাজনীতি পাকিস্তান আন্দোলনের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ ছিল। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক। ১৯৪৫-৪৬ সালের নির্বাচনে বঙ্গীয় মুসলিম লীগ তীব্র সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। অর্থাৎ যে রাজনৈতিক স্রোত পূর্ববঙ্গকে পাকিস্তানের অংশে পরিণত করে, তার ভিত্তি বাঙালি মুসলমান নেতৃত্ব ও ভোটারদের সমর্থনেই গড়া। জিন্নাহ সেই স্রোতের সর্বভারতীয় মুখপাত্র ছিলেন, স্থানীয় উদ্যোক্তা নন।
আরও একটি তথ্য প্রকাশ্য আলোচনায় আসে না। ১৯৪৭ সালের এপ্রিল-মেতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎচন্দ্র বসু যুক্ত ও সার্বভৌম বঙ্গের প্রস্তাব তোলেন। জিন্নাহ সেই প্রস্তাবের প্রতি অন্তত নীতিগতভাবে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছিলেন। মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে আলোচনায় তিনি বলেছিলেন, কলকাতা ছাড়া বঙ্গের অর্থ কী—তারা একত্র ও স্বাধীন থাকলেই ভালো; পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে।
প্রস্তাবটি কংগ্রেস হাইকমান্ড ও হিন্দু মহাসভার বিরোধিতায় ভেঙে যায়, এবং বঙ্গ বিভক্ত হয়। অর্থাৎ জিন্নাহ “বাঙালি রাষ্ট্র” ধারণার বিরুদ্ধে ছিলেন—এমন সরল সিদ্ধান্ত ইতিহাসের এই অধ্যায়ের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তিনি একসময় একটি ঐক্যবদ্ধ ও স্বাধীন বাংলার সম্ভাবনাও কল্পনা করতে পেরেছিলেন। তবে ১৯৪৭ সালের যুক্তবঙ্গের সম্ভাবনা এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা একই রাজনৈতিক প্রকল্প ছিল না—এই পার্থক্যটিও মনে রাখা জরুরি।
যে মানুষ বাংলাদেশ দেখেননি, তাঁকে বাংলাদেশের বিপক্ষে দাঁড় করানো তাই ইতিহাসের পূর্বাপর বিচার নয়—পরবর্তী রাজনীতির প্রয়োজনে তৈরি করা দায়িত্বারোপ।
জিন্নাহর বিরুদ্ধে অভিযোগের কেন্দ্র হচ্ছে তাঁর ১৯৪৮ সালের মার্চের ঢাকা সফরের এক বক্তৃতা। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করেন। যেখানে তিনি ইংরেজিতেই বলেছিলেন, “Let me make it very clear to you that the State Language of Pakistan is going to be Urdu and no other language. Anyone who tries to mislead you is really the enemy of Pakistan.” ছাত্ররা তাঁর বক্তব্যের এই অংশের বিরোধিতা করে।
কিন্তু একই ভাষণে তিনি আরও বলেন, প্রদেশের দাপ্তরিক ভাষা কী হবে তা প্রদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই স্থির করবেন; বাংলা ভাষায় মানুষের স্বাভাবিক জীবন স্পর্শ করা হবে না। সমাবর্তন ভাষণে তিনি আবার বলেন, প্রাদেশিক দাপ্তরিক ব্যবহারের জন্য প্রদেশের মানুষ যে ভাষা চান তাই বেছে নিতে পারেন; তবে প্রদেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগের ভাষা—লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা—একটিই হতে পারে, তা উর্দু।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলা নিষিদ্ধ করা এবং বাংলাকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না দেওয়া এক বিষয় নয়। জিন্নাহ বাংলা নিষিদ্ধ করার কথা বলেননি; কিন্তু পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষার সমমর্যাদা না দেওয়ার অবস্থান নিয়েছিলেন। বাঙালির আপত্তির মূল জায়গাটিও এখানেই।
একই ভাষণের এই অংশটুকু মানুষ ইচ্ছা করেই রাজনৈতিক কারণে তুলে ধরে না।
জিন্নাহ উর্দুকে উপমহাদেশের কোটি কোটি মুসলমানের লালিত ভাষা এবং ইসলামি সংস্কৃতির নিকটবর্তী মাধ্যম হিসেবে দেখছিলেন, ঐক্যের প্রতীক হিসেবে। একইসঙ্গে ভাষা আন্দোলনকে তিনি প্রাদেশিকতা, পঞ্চম বাহিনী ও ভারতীয় ষড়যন্ত্রের খাতে ফেলেছিলেন। এই ফ্রেমিং ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল।
জিন্নাহ কিন্তু বাংলা নিষিদ্ধ করেননি; বাংলাকে প্রাদেশিক মর্যাদা দিয়েছিলেন। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষাকে কেবল প্রাদেশিক মর্যাদায় রাখা কেন্দ্রীয় অভিজাতদের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের লক্ষণ হিসেবে বাঙালিরা দেখে তার বিরোধিতা করে।
বর্তমান পাকিস্তানে উর্দু জাতীয় লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা, মানে যোগাযোগের ভাষা; পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতু, সরাইকি, বেলুচি প্রাদেশিক ভাষা। ভারতে হিন্দি ইউনিয়নের দাপ্তরিক ভাষা, ইংরেজি অনির্দিষ্টকালের সহযোগী দাপ্তরিক ভাষা, এবং রাজ্যগুলোর নিজস্ব ভাষা আছে। একটি যোগাযোগ-ভাষা রেখে প্রাদেশিক ভাষা চালু রাখা বহুভাষী রাষ্ট্রে অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। বাংলা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা এবং পাকিস্তানের সামগ্রিক জনসংখ্যারও সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ভাষা। ফলে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবকে বাঙালিরা শুধু যোগাযোগের ভাষার প্রশ্ন হিসেবে দেখেনি; তারা এটিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, প্রতিনিধিত্ব ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবেও দেখেছিল। এখানেই জিন্নাহর ভাষানীতির রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে স্পষ্ট।
তবু এখানে থেমে গেলে ভুল হবে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালায় পূর্ববঙ্গেরই বাঙালি প্রশাসন—মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের সরকার, বাঙালি ম্যাজিস্ট্রেট, বাঙালি পুলিশ। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে ঘটনাটির রাজনৈতিক দায় কেবল স্থানীয় বাঙালি কর্মকর্তাদের; তাঁরা যে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে কাজ করছিলেন, সেই কাঠামোর দায়ও অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।
কিন্তু একটি কালানুক্রমিক সত্য এখানে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় জিন্নাহ জীবিত ছিলেন না। তাঁর ১৯৪৮ সালের অবস্থান ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক পটভূমির অংশ হতে পারে, কিন্তু ১৯৫২ সালের গুলির সরাসরি দায় তাঁর ওপর দেওয়া যায় না।
১৯৪৮ থেকে ১৯৫২-এর মধ্যেও পাকিস্তানি রাষ্ট্রের ভাষানীতি স্থির ছিল না। রাজনৈতিক চাপ, পূর্ববঙ্গের আন্দোলন এবং গণদাবির সঙ্গে সঙ্গে সেই অবস্থানের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ও উর্দু উভয়কেই রাষ্ট্রভাষা করা হয়।
অর্থনৈতিক বৈষম্য, কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় পশ্চিম পাকিস্তানিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা, সামরিক শাসন, ১৯৭০-এর নির্বাচনের ফল অস্বীকার এবং ১৯৭১-এর সেনা অভিযান—এসব জিন্নাহর মৃত্যুর পরের রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজ। লিয়াকত আলী খান, গোলাম মুহাম্মদ, ইস্কান্দার মির্জা, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান—এই ধারাকে ১৯৪৮ সালের এক নেতার ঘাড়ে চাপানো ঐতিহাসিকভাবে ভুল।
আমাদের পাঠ্যপুস্তক আর আলোচনা থেকে উধাও করে দেয়া হয়েছে যে ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি মুসলমানরাই পাকিস্তান আন্দোলনকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। খাজা নাজিমুদ্দিনসহ পূর্ববঙ্গের অনেক নেতাই উর্দুর পক্ষে সক্রিয় ছিলেন; জিন্নাহকে ঢাকায় ডেকেছিলেন তাঁরাই। লাহোর প্রস্তাবের মূল পাঠে ছিল “independent states”—বহুবচন; পরে তা একক পাকিস্তানে সংকুচিত হয়। যুক্তবঙ্গের সম্ভাবনা জিন্নাহ একবার সমর্থনও করেছিলেন।
অর্থাৎ পাকিস্তান আন্দোলনকে কেবল পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃত্বের তৈরি কোনো প্রকল্প হিসেবে দেখলে যেমন ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকে, তেমনি পরবর্তী বাঙালি জাতীয়তাবাদের আলোকে ১৯৪৭ সালের বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক পছন্দকে অস্বীকার করলেও ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকে।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময়ও পূর্ব পাকিস্তান তখন পাকিস্তানের অংশ হিসেবেই রাষ্ট্রীয় অবস্থান বজায় রেখেছিল; তখনও স্বাধীনতার দাবি পূর্ববাংলার মূলধারার রাজনৈতিক দাবি হয়ে ওঠেনি।
ওদিকে আমাদের তথা বাংলাদেশিদের জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠা-আখ্যানে ভাষা আন্দোলনকে দেখানো হয় বাঙালিদের প্রথম প্রতিরোধ হিসাবে; এরপর আসে ছয় দফা, স্বায়ত্তশাসনের সনদ, ৭ই মার্চ ঘোষণা এবং ১৯৭১, যা বাঙালিদের স্বাধিকারের চূড়ান্ত রূপ। এই শৃঙ্খলার “আদি পাপ” হিসেবে এখনও জিন্নাহর উর্দু-ঘোষণাকে গণ্য করা হয়।
কিন্তু ইতিহাস এত সরল নয়।
ভাষা আন্দোলনকে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখার যথেষ্ট কারণ আছে। কিন্তু ভাষা আন্দোলনকে ১৯৭১-এর সরাসরি পূর্বনির্ধারিত পথ হিসেবে দেখলে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বাঙালির রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন, দ্বিধা, সংঘাত ও বিবর্তনের অনেকটাই হারিয়ে যায়।
বাংলাদেশের জন্ম পাকিস্তানি রাষ্ট্রের দীর্ঘ ব্যর্থতার ফল—এবং পরিশেষে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যর্থতার ফল। সেই ব্যর্থতার পুরো দায় ১৯৪৮ সালের এক নেতার ঘাড়ে চাপানো প্রকৃত ইতিহাসকে দরিদ্র করে তোলে।
জিন্নাহকে ভালোবাসা বা ঘৃণা করা রাজনৈতিক পছন্দ হতে পারে। কিন্তু তাঁকে বাংলাদেশের “শত্রু” হিসেবে দাঁড় করানো ঐতিহাসিকভাবে অসংগত। যা সম্ভব, তা হলো তাঁর সিদ্ধান্তের পরিণতি বিচার করা—কোনো পক্ষের ন্যারেটিভের খাতিরে নয়, বরং ইতিহাসের খাতিরে। যদিও পাকিস্তান আমলেই সেই সিদ্ধান্ত বদলে বাংলা এবং উর্দু দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করা হয়।
জিন্নাহর ভুলকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। তাঁর ভাষানীতি বাঙালির রাজনৈতিক ক্ষোভকে তীব্র করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল—এটি ইতিহাসের অংশ। কিন্তু সেই ভুলের সঙ্গে ১৯৫২-এর গুলি, ১৯৫৮-এর সামরিক শাসন, ১৯৬৬-এর ছয় দফার প্রেক্ষাপট, ১৯৭০-এর নির্বাচনের ফল অস্বীকার এবং ১৯৭১-এর সামরিক অভিযানকে এক ব্যক্তির ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখানোও ইতিহাস নয়।
কারণ জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাজনীতি বদলেছে, নেতৃত্ব বদলেছে, প্রতিষ্ঠান বদলেছে এবং বাঙালির রাজনৈতিক দাবিও বদলেছে। বাংলাদেশের জন্ম সেই দীর্ঘ পরিবর্তন ও সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতি।
২০২৬ সালে যে জাতীয়তাবাদ কেবল শত্রু চিহ্নিত করে আনন্দ পায়, সেই জাতীয়তাবাদ ইতিহাস চর্চা করে না; সেখানে অজ্ঞতাই মূল কারণ।
লেখক: সিকিউরিটি এক্সপার্ট এবং ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি স্পেশালিষ্ট, ইউএসএ।








