সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের হুথিদের সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে। হুথিদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রযাত্রা, সৌদি ভূখণ্ড ও তেল স্থাপনায় হামলা এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাড়তে থাকা ঝুঁকির মধ্যে রিয়াদ এখন প্রতিরক্ষা সহায়তার জন্য বিভিন্ন দেশের দিকে তাকাচ্ছে। এরই মধ্যে হুথিদের মোকাবিলায় ইসরায়েলের কাছ থেকে গোয়েন্দা সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের মাধ্যমে যোগাযোগের খবর সামনে এসেছে। সৌদি আরব বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করলেও এই তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। হুথিদের সামরিকভাবে ঠেকাতে ইসরায়েলের প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সক্ষমতা কতটা কাজে আসবে, আর এর ফলে সৌদি আরব নিজেই আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে কি না, সেই প্রশ্ন এখন সামনে।

সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং বাইরের শক্তির সহায়তা নেওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের সামনে আরেকটি পথ খোলা রয়েছে। সেটি হলো ইরান ও হুথিদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর দুই দেশের যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। চলতি সেপ্টেম্বরেও দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ে কথা বলেছেন। ফলে হুথি সংকটকে কেবল সামরিকভাবে মোকাবিলা না করে ইরান ও হুথিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করার সুযোগ এখনো রয়েছে।

প্রশ্ন হলো, হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও বাড়িয়ে এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে সৌদি আরব কতটা স্থায়ী নিরাপত্তা অর্জন করতে পারবে? নাকি যুদ্ধ, অবরোধ ও সামরিক নির্ভরতার বদলে রাজনৈতিক সমঝোতাই শেষ পর্যন্ত রিয়াদের জন্য বেশি কার্যকর পথ হয়ে উঠবে?

যুদ্ধের সঙ্গে বাড়ছে সৌদির ঝুঁকি

সৌদি আরবের সঙ্গে হুথিদের সংঘাত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দীর্ঘ সময় ধরে হুথি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বজায় রেখেছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর। খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি মানবিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে ইয়েমেনের মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্বেগের বিষয়।

সাম্প্রতিক লড়াইয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতে এক লাখ থেকে এক লাখ পঁচিশ হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। অনেকে লোহিত সাগর পেরিয়ে নৌপথে জিবুতিতে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে প্রায় ১৫০ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। দুই পক্ষের সূত্রের বরাতে বৃহস্পতিবারের হিসাব অনুযায়ী, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৬৮ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সরকারি বাহিনীর ২৩ জন এবং হুথি যোদ্ধাদের ৪০ জন রয়েছেন।

সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, এই মানবিক ও সামরিক মূল্যও তত বাড়বে। ফলে সৌদি আরবের জন্য এখন শুধু সামরিক বিজয়ের প্রশ্ন নয়, যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার রাজনৈতিক পথ খোঁজার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, তাঁদের মূল দাবি সৌদি অবরোধ ও সামরিক আগ্রাসন বন্ধ করা। হুথিদের এই অবস্থানকে সৌদি আরবের কাছে একটি সম্ভাব্য আলোচনার ভিত্তি হিসেবেও দেখা যেতে পারে। অবরোধ প্রত্যাহারের বিনিময়ে সীমান্ত নিরাপত্তা ও সৌদি ভূখণ্ডে হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা আদায় করা সম্ভব কি না, সেটিই হতে পারে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি, সৌদির সঙ্গে সংঘাত

হুথিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি এখনো টিকে আছে। ওমানে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর হুথিরা মার্কিন জাহাজে হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়িয়ে চলেছে তারা। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি নতুন সামরিক অভিযান চালাচ্ছে না। এটি বর্তমান পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

কারণ হুথিরা যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ রেখে সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাত চালিয়ে যেতে পারে, তাহলে বোঝা যায় তাদের বর্তমান সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়ানো রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তের ২০ মাইলের মধ্যে নিজেদের কর্মীদের চলাচল নিষিদ্ধ করেছে। অর্থাৎ ওয়াশিংটনও পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে। কিন্তু সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়ার বদলে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

এখানে সৌদি আরবের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। ওয়াশিংটন তার নিরাপত্তা সহযোগী হলেও প্রতিটি আঞ্চলিক সংঘাতে সৌদির হয়ে সরাসরি যুদ্ধে নামবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা

সাম্প্রতিক সময়ে হুথিরা ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ১০ সেপ্টেম্বর তারা কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখলের দাবি করে। পরদিন বাব আল-মানদাব প্রণালীর কাছে মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা জানায় তারা। এরপর হানিশ দ্বীপপুঞ্জ নিয়েও তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি আসে।

এই অগ্রযাত্রার ফলে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বড় একটি অংশ এবং বাব আল-মানদাবের আশপাশের এলাকায় হুথিদের সামরিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে তাদের অবস্থান সৌদি আরবের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতার সময় লোহিত সাগর হয়ে ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠানোর পথ সৌদি আরবের জন্য বিকল্প রপ্তানি রুট হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

হুথিদের দাবি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অভিযানে তারা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী কয়েকটি এলাকায় প্রতিরোধ না করেই পিছু হটেছে বলেও দাবি করা হয়েছে। পিছু হটার সময় বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র, সামরিক যান, ট্যাংক, কামান ও অন্যান্য সরঞ্জাম ফেলে যাওয়ার খবর এসেছে। যদি এই সামরিক অগ্রযাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ইয়েমেনের যুদ্ধের ভারসাম্য আরও পরিবর্তিত হতে পারে।

মারিব ও তাইজের দিকে চাপ

হুথিদের অগ্রযাত্রা শুধু লোহিত সাগরের উপকূলে সীমাবদ্ধ নেই। তারা তেল ও গ্যাসসম্পদসমৃদ্ধ মারিব এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর তাইজের দিকেও চাপ বাড়াচ্ছে। মারিব ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর জন্য উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও অর্থনৈতিক ঘাঁটি। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাসক্ষেত্রগুলোর অবস্থানও এই অঞ্চলে। ফলে মারিবের নিয়ন্ত্রণ হারালে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

এর পর হুথিদের সামনে হাদরামাউত এবং সৌদি সীমান্তের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে মারিবের যুদ্ধ শুধু একটি শহর বা সামরিক ঘাঁটির লড়াই নয়; এটি ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গেও যুক্ত।

এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সামরিক ব্যয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক ঝুঁকিও বাড়ছে।

লোহিত সাগর নিয়ে নতুন উদ্বেগ

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর সৌদি আরবের জন্য লোহিত সাগর হয়ে তেল রপ্তানির গুরুত্ব বেড়েছে। কিন্তু হুথিদের সামরিক অগ্রযাত্রার কারণে সেই পথও এখন ঝুঁকিতে।

হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি-সংযুক্ত নৌ চলাচলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। অন্যদিকে অন্য দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করার কথা তারা বলেনি। এর ফলে সৌদি আরবের ওপর চাপ তৈরি হলেও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে না।

এটি হুথিদের একটি কৌশলগত হিসাবও হতে পারে। তারা যদি শুধু সৌদি-সংযুক্ত জাহাজকে লক্ষ্য করে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক রাখে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার যুক্তি দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে সৌদি আরবের জন্য এর অর্থ হলো, তার তেল রপ্তানির বিকল্প পথও এখন নিরাপত্তার ঝুঁকিতে।

সস্তা ড্রোনের বিপরীতে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা

হুথিদের সবচেয়ে বড় সামরিক সুবিধাগুলোর একটি হচ্ছে তুলনামূলক কম খরচে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে উচ্চমূল্যের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে চাপ তৈরি করা।

সৌদি আরবের বিমানবাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক বেশি উন্নত। কিন্তু একটি সস্তা ড্রোন প্রতিহত করতে ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। তেল স্থাপনা, বিমানঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ শহর রক্ষায় সার্বক্ষণিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখতে হয়।

ফলে আক্রমণকারী ও প্রতিরক্ষাকারীর খরচের হিসাব এক নয়।

হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমানঘাঁটি এবং ইয়ানবুর তেল স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। তায়েফের ওপরও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ার খবর এসেছে। সেখানে একজন ইয়েমেনি বাসিন্দা নিহত হওয়ার কথা জানা গেছে। এটি চলমান সংঘাতে সৌদি ভূখণ্ডে ঘোষিত প্রথম বেসামরিক মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সৌদি জোটের পক্ষ থেকে মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করা হয়েছে। হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি সেই দাবি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ইয়েমেনিদের কাছে মক্কার পবিত্রতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

একই সময়ে হুথিরা মারিবের কাছে একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে এবং ধ্বংসাবশেষের ভিডিও প্রকাশ করেছে। বিবিসি ভিডিওতে থাকা ধ্বংসাবশেষ যাচাই করেছে বলে জানিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ এ দাবি নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি। এই পাল্টাপাল্টি দাবির বাইরে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো সৌদি ভূখণ্ডে হুথিদের হামলার সক্ষমতা এবং সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চাপ দুটোই বেড়েছে।

এফ-৩৫ কিনলেও কি সমস্যার সমাধান হবে?

এই পরিস্থিতিতে ১৮ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে। সৌদি আরবের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দিক থেকে এটি বড় সিদ্ধান্ত।

কিন্তু অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কেনা আর ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করা এক বিষয় নয়। এফ-৩৫ সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বাড়াতে পারে। কিন্তু হুথিদের রাজনৈতিক অবস্থান, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো এবং ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের সমাধান করতে পারে না।

সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো সৌদি আরবের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে। কিন্তু যুদ্ধের মূল কারণ যদি রাজনৈতিক হয়, তাহলে তার সমাধানও রাজনৈতিক পথেই খুঁজতে হবে।

ইসরায়েলের দিকে তাকানোর ঝুঁকি

আঞ্চলিক ও ইসরায়েলি সূত্রের বরাতে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে হুথিদের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় নিয়ে যোগাযোগের খবর প্রকাশিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের মাধ্যমে এই যোগাযোগের বিষয়ে আলোচনা চলছে বলেও কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে সৌদি আরব বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।

সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সক্ষমতা সৌদি আরবের জন্য কার্যকর হতে পারে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ, নজরদারি, স্যাটেলাইট তথ্য এবং আকাশ প্রতিরক্ষায় ইসরায়েলের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু এর রাজনৈতিক মূল্যও রয়েছে।

সৌদি আরব যদি ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ায়, হুথিরা সেটিকে নিজেদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আঞ্চলিক জোটের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। ইসরায়েল তখন হুথিদের কাছে শুধু একটি বাইরের রাষ্ট্র থাকবে না, বরং তাদের সামরিক সংঘাতের প্রত্যক্ষ পক্ষ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এর ফলে হুথিদের হামলার লক্ষ্যও আরও বিস্তৃত হতে পারে।

অর্থাৎ যে সহযোগিতা একটি হামলা প্রতিহত করতে সাহায্য করতে পারে, সেটিই আবার ভবিষ্যতে নতুন হামলার রাজনৈতিক কারণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। সৌদি আরবকে তাই শুধু এই হিসাব করলে চলবে না যে ইসরায়েল কতটা গোয়েন্দা সহায়তা দিতে পারে। হিসাব করতে হবে, সেই সহযোগিতার কারণে হুথিদের আচরণ কতটা বদলাতে পারে।

হারামাইনের দেশ ও ইসরায়েল নির্ভরতার প্রশ্ন

সৌদি আরবের জন্য বিষয়টির আরেকটি রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। মক্কা ও মদিনার পবিত্র দুই মসজিদের কারণে মুসলিম বিশ্বের কাছে সৌদি আরবের অবস্থান অন্য অনেক রাষ্ট্রের চেয়ে আলাদা। ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্য নিরাপত্তা সহযোগিতা কেবল সামরিক বিষয় হিসেবে দেখা হবে না। ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং মুসলিম বিশ্বের জনমতের সঙ্গেও এর সম্পর্ক তৈরি হবে।

সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে কোনো নিরাপত্তা সহযোগিতার আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রভাবও উপেক্ষা করা যায় না।

বিশেষ করে এমন সময়ে যখন হুথিরা নিজেদের ফিলিস্তিন প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে আঞ্চলিক রাজনীতিতে অবস্থান তৈরি করেছে।

ফলে ইসরায়েলের সহায়তা নিয়ে হুথিদের সামরিকভাবে চাপ দেওয়া সৌদি আরবের জন্য একটি কৌশলগত বিকল্প হতে পারে, কিন্তু এটিকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান হিসেবে দেখা কঠিন।

আমেরিকার অবস্থানও বদলেছে

সৌদি আরবের নিরাপত্তা কাঠামোর প্রধান অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের অবস্থানও আগের মতো সরল নয়। যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দিচ্ছে এবং নতুন অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্তও নিয়েছে। কিন্তু হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি নতুন সামরিক অভিযান শুরু করার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন সতর্ক।

ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘনিয়ে এসেছে এবং তাঁর সামনে বড় সিদ্ধান্ত রয়েছে। আগামী মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, হুথি ফ্রন্টে যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি নতুন যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে না।

সৌদি আরবের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কারণ রিয়াদ যদি ধরে নেয় যে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনই সব সামরিক ঝুঁকি সামলে নেবে, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতি সেই ধারণাকে সমর্থন করছে না।

কূটনীতিতে ইরানের দরজা এখনো খোলা

সৌদি আরবের সামনে তাই আরেকটি পথ রয়েছে। সেটি ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগকে আরও সক্রিয় করা। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছিল। বর্তমান আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যেও সেই যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

চলতি সেপ্টেম্বরেই সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি ফোনে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতেও এ যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগের একটি চ্যানেল এখনো রয়েছে।

এই চ্যানেলকে কাজে লাগানো গেলে হুথি সংকট নিয়ে পরোক্ষ হলেও একটি রাজনৈতিক আলোচনা শুরু করা সম্ভব হতে পারে। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। হুথিদের ওপর ইরানের প্রভাব থাকলেও হুথিরা ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রিত একটি বাহিনী, এমন সরলীকরণ যথাযথ নয়। তাদের নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ রয়েছে। তাই শুধু তেহরানের সঙ্গে সমঝোতা করলেই ইয়েমেনের সংকটের সমাধান হবে না। হুথিদের সঙ্গেও কথা বলতে হবে।

সমঝোতা মানে আত্মসমর্পণ নয়

হুথিদের সঙ্গে আলোচনা করা মানে তাদের সব দাবি মেনে নেওয়া নয়। বরং আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থ নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি করা। সৌদি আরব চাইতে পারে, হুথিরা সৌদি ভূখণ্ড ও তেল স্থাপনায় হামলা বন্ধ করবে। সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা কমাবে। লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

এর বিনিময়ে সৌদি আরব ইয়েমেনের ওপর সামরিক চাপ কমাতে পারে। অবরোধ প্রত্যাহারের ধাপ নির্ধারণ করতে পারে। মানবিক সহায়তার পথ খুলে দিতে পারে। ইরান এই প্রক্রিয়ায় একটি পক্ষ হিসেবে থাকতে পারে। ওমানের মতো মধ্যস্থতাকারীও ভূমিকা রাখতে পারে। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।

এখানে লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু কয়েক দিনের যুদ্ধবিরতি নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সমঝোতা, যাতে সীমান্ত নিরাপত্তা, বন্দর, নৌপথ, অস্ত্র ব্যবহার এবং ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা তৈরি হয়। এটি সহজ হবে না। হুথিদের স্বার্থ আছে, ইরানের স্বার্থ আছে, সৌদি আরবের নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থ আছে। ইয়েমেনের অন্য রাজনৈতিক ও সামরিক পক্ষগুলোরও অবস্থান রয়েছে।

কিন্তু যুদ্ধের বিকল্প হিসেবে কূটনীতি তৈরি করার কাজটি শুরু করতে হবে সেখান থেকেই।

অবরোধের রাজনৈতিক মূল্য

সৌদি আরবের বর্তমান কৌশলের আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো অবরোধ। ইয়েমেনের মানুষের ওপর দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ মানবিক সংকটকে গভীর করেছে। নতুন করে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

একটি রাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিন অবরোধ চাপিয়ে রাখলে শুধু তার সামরিক সক্ষমতা কমে না। অনেক সময় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক প্রচারের উপাদান হয়ে ওঠে। হুথিরাও সেই বাস্তবতা ব্যবহার করছে।

তাদের বয়ানে সৌদি আরবকে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সৌদি অবরোধকে তাদের সামরিক প্রতিরোধের অন্যতম যুক্তি হিসেবে দেখানো হয়। সৌদি আরব যদি অবরোধ প্রত্যাহারের মাধ্যমে সেই রাজনৈতিক বয়ানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি সরিয়ে নেয়, তাহলে সেটি শুধু মানবিক পদক্ষেপ হবে না; কৌশলগত পদক্ষেপও হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্য সমস্যাটি শুধু হুথিদের সামরিক সক্ষমতা নয়। সমস্যাটি হলো, সেই সক্ষমতা মোকাবিলায় প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপের সঙ্গে নতুন একটি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। হুথিরা যদি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সৌদি তেল স্থাপনায় হামলা চালায়, সৌদিকে আরও ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়।

হুথিরা যদি লোহিত সাগরে চাপ বাড়ায়, সৌদি আরবের তেল রপ্তানির বিকল্প পথও ঝুঁকিতে পড়ে। সৌদি আরব যদি ইসরায়েলের সঙ্গে গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়ায়, হুথিরা সেই সহযোগিতাকে নতুন হামলার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। সৌদি আরব যদি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরও বেশি নির্ভর করে, ওয়াশিংটনের নিজস্ব আঞ্চলিক অগ্রাধিকার ও সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখতে হবে। অর্থাৎ সামরিক পথ যত এগোচ্ছে, সংকটের পরিধিও তত বড় হচ্ছে।

সবচেয়ে বাস্তব পথ কোনটি?

সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বাস্তব পথ হতে পারে একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ সক্রিয় করা। নিজের আকাশ ও তেল স্থাপনা রক্ষা করা সৌদি আরবের অধিকার। সীমান্তে হামলা ঠেকানোর জন্য সামরিক প্রস্তুতিও প্রয়োজন। কিন্তু এসবের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং হুথিদের সঙ্গে সরাসরি বা মধ্যস্থতার মাধ্যমে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

ইরানের সঙ্গে ২০২৩ সালে যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন হয়েছিল, সেটিকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আঞ্চলিক নিরাপত্তার একটি চ্যানেল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। হুথিদের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রেও সৌদি আরবের সামনে কিছু স্পষ্ট বিনিময় তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। হামলা বন্ধের বিনিময়ে অবরোধ প্রত্যাহার, সীমান্ত নিরাপত্তার বিনিময়ে সামরিক উত্তেজনা কমানো, লোহিত সাগরের নৌ চলাচলের নিরাপত্তার বিনিময়ে সমুদ্রপথে আক্রমণ বন্ধ এবং মানবিক সহায়তার পথ খোলার বিনিময়ে রাজনৈতিক আলোচনায় অংশগ্রহণ। এই ধরনের একটি কাঠামো তৈরি হলে যুদ্ধের পরিবর্তে দরকষাকষির জায়গা তৈরি হতে পারে।

ইসরায়েল নয়, শেষ পর্যন্ত দরকার রাজনৈতিক সমাধান

ইসরায়েলের গোয়েন্দা সহায়তা সৌদি আরবকে কিছু সামরিক সুবিধা দিতে পারে। এফ-৩৫ সৌদি সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, পাকিস্তান কিংবা অন্য দেশগুলো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দিতে পারে। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়।

হুথিদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা গেলেও ইয়েমেনের রাজনৈতিক প্রশ্ন থেকে যাবে। ইরানের আঞ্চলিক ভূমিকার প্রশ্ন থেকে যাবে। ইয়েমেনের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক পক্ষের ক্ষমতার হিসাব থেকে যাবে। তাই সৌদি আরব যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা চায়, তাহলে শুধু হুথিদের সামরিক সক্ষমতা কমানোর চেষ্টা করলে হবে না। যে রাজনৈতিক বাস্তবতা হুথিদের শক্তিশালী করেছে, সেটিকেও মোকাবিলা করতে হবে। এখানেই কূটনীতির প্রয়োজন।

সৌদি আরবের সামনে এখন দুটি সমান্তরাল বাস্তবতা। একদিকে নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো, অন্যদিকে যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা। কিন্তু যদি এই দুইয়ের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য সামরিক বিজয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ হুথিদের সঙ্গে যুদ্ধ করে সৌদি আরব হয়তো আরও কিছু সামরিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। কিন্তু সেই যুদ্ধের মাধ্যমে ইয়েমেনে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

বরং যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সৌদি ভূখণ্ড, তেল স্থাপনা, সমুদ্রপথ ও অর্থনীতির ওপর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

কোন পথে যাবে এই নির্ভরতা?

সৌদি আরব এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিরক্ষার জন্য বাইরের শক্তির সহায়তা নেওয়া স্বাভাবিক হলেও সেই নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হতে পারে না। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সহায়তা যদি নেওয়া হয়, তার সামরিক সুবিধা যেমন বিবেচনায় রাখতে হবে, তেমনি এর আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও ওয়াশিংটন সব সময় রিয়াদের হয়ে সরাসরি যুদ্ধ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সম্পদ শেষ পর্যন্ত তার নিজের আঞ্চলিক কূটনীতি।

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের যে পথ ২০২৩ সালে তৈরি হয়েছিল, সেটিকে আরও কার্যকর করা যেতে পারে। হুথিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। অবরোধ প্রত্যাহার, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং নৌপথের নিরাপত্তাকে একই আলোচনার অংশ করা যেতে পারে। এতে হুথিরা সব দাবি আদায় করবে না। সৌদি আরবও তার সব নিরাপত্তা স্বার্থ বিসর্জন দেবে না। কিন্তু যুদ্ধের বাইরে একটি রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির সুযোগ তৈরি হবে।

সৌদি আরবের জন্য এখন মূল প্রশ্ন তাই এফ-৩৫ কতটি কেনা হবে, ইসরায়েল কতটা গোয়েন্দা সহায়তা দেবে কিংবা যুক্তরাষ্ট্র কত দূর পর্যন্ত পাশে থাকবে, শুধু সেটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো, রিয়াদ কি সামরিক নির্ভরতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সমঝোতার পথও খুলবে? কারণ যুদ্ধের মাধ্যমে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু ইয়েমেনের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সামরিক শক্তি দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

আর সৌদি আরব যদি নিজের নিরাপত্তা, তেল রপ্তানি, সীমান্ত এবং আঞ্চলিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত রাখতে চায়, তাহলে হুথিদের সঙ্গে যুদ্ধের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে আলোচনার পথও খোলা রাখতে হবে। শেষ পর্যন্ত সমাধান হয়তো নতুন কোনো যুদ্ধবিমান, নতুন কোনো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা নতুন কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সহযোগিতার মধ্যে নেই।

সমাধানটি থাকতে পারে সেই জায়গাতেই, যেটিকে যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন বিকল্প বলে মনে হয়। সমঝোতা।