একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে সবচেয়ে বড় হতাশা আসে যখন দেখি, বাংলাদেশে তথ্যের স্বচ্ছতা এবং সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তথ্যের অবাধ প্রবাহ, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এসবের কোনোটিই এখনো শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়নি। বরং তথ্যকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার, সংবাদকে দলীয় বয়ানে রূপান্তর এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবণতা বারবার ফিরে আসছে। সরকার পরিবর্তন হচ্ছে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার পুরোনো সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসছে না।
ইসরায়েলের নির্বাচনে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ভোট গণনার সূক্ষ্ম হিসাব, আসনভিত্তিক ভোটার উপস্থিতি, প্রার্থীদের মধ্যে ভোটের ব্যবধান এবং নির্বাচনী প্রবণতার বিস্তারিত তথ্য সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা কানাডার নির্বাচনেও ভোটের পরিসংখ্যান, এক্সিট পোল এবং আনুষ্ঠানিক ফলাফল গণনার তথ্য এমনভাবে প্রকাশ করা হয়, যা থেকে গভীর ও বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়। এসব দেশেও গণমাধ্যমের পক্ষপাত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যের বিস্তার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে মৌলিক পার্থক্যটি মূলত তথ্যের সূক্ষ্মতা, প্রকাশের গতি এবং যাচাইযোগ্যতার ক্ষেত্রে। কানাডার মতো দেশে নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল, ভোটার উপস্থিতি, প্রার্থীদের পৃথক ভোটের হিসাব এবং নির্বাচনী এলাকার পরিসংখ্যান ডাউনলোডযোগ্য ডেটাসেট আকারেও পাওয়া যায়। অর্থাৎ সেখানে তথ্য শুধু প্রকাশ করাই শেষ কথা নয়, বরং নাগরিক, গবেষক ও সাংবাদিকদের জন্য সেই তথ্য ব্যবহার এবং স্বাধীনভাবে বিশ্লেষণের সুযোগও তৈরি করা হয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আট মাস পেরিয়ে গেলেও আসনভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ, সহজলভ্য, যাচাইযোগ্য ও বিশ্লেষণযোগ্য তথ্যভান্ডার নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন ৪ মার্চ ২০২৬ তারিখে ২৯৭টি আসনের কেন্দ্রভিত্তিক ফল প্রকাশ করেছে। ৫ মার্চ প্রকাশ করা হয়েছে দলভিত্তিক প্রাপ্ত ভোটের হিসাবও। কিন্তু তথ্য প্রকাশ এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। তথ্যগুলো কতটা সহজে পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণের সুযোগ কতটা রয়েছে, স্বাধীন গবেষক ও সাংবাদিকেরা কতটা সহজে যাচাই করতে পারছেন এবং নির্বাচনী ফলাফলের প্রতিটি স্তর নিয়ে নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ কতটা সম্ভব হচ্ছে—এসব প্রশ্নের সমাধান এখনো জরুরি। যেটুকু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তার উপস্থাপন, ব্যবহারযোগ্যতা ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা অনেক ক্ষেত্রেই দলীয় ফ্রেমিংয়ের মধ্যে আটকে থাকছে। ফলে বিদেশি নির্বাচন নিয়ে বিশ্লেষণ করা যতটা সহজ, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তথ্যনির্ভর ও গভীর বিশ্লেষণ করা ততটাই সীমিত।
সমস্যাটি শুধু একটি নির্দিষ্ট নির্বাচন কিংবা তার ফলাফল প্রকাশের সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে নেই। বাংলাদেশে তথ্য, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখার কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি কখনোই গড়ে ওঠেনি। এখানে প্রায় প্রতিটি তথ্যকেই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান বা ন্যারেটিভে রূপান্তর করা হয়। আর যে তথ্য প্রচলিত বয়ানের সঙ্গে মেলে না, সেটিকে হয় আড়াল করা হয়, নয়তো সন্দেহের আবর্তে ফেলে দেওয়া হয়। সাধারণ নাগরিকদের একটি অংশও ধীরে ধীরে এই বাস্তবতাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিয়েছে। অথচ এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও জনআস্থার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। যখন তথ্যের উৎসই দলীয় স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হয়, তখন কোনো সংবাদ বা পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করা কঠিন হয়ে পড়ে। একদিকে থাকে রাজনৈতিক স্পিন, অন্যদিকে তথ্যের অস্বচ্ছতা। এই দুইয়ের মধ্যে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতা ক্রমেই চাপা পড়ে যায়।
এখানে গণমাধ্যমের নিজস্ব কাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সংবাদমাধ্যমের মালিকানা, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রভাব, সরকারি বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বণ্টনে স্বচ্ছতার অভাব এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। একটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু তার সম্পাদকীয় নীতির ওপর নির্ভর করে না; এর আর্থিক স্বাধীনতা, মালিকানার কাঠামো এবং রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিক যদি তথ্য প্রকাশের কারণে চাকরি হারানো, হয়রানি কিংবা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় থাকেন, তাহলে তাঁর পক্ষে নিরপেক্ষ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করা কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তথ্য প্রদানে স্বচ্ছ ও সহযোগিতামূলক না হয়, তাহলে সাংবাদিকতার মান ও গভীরতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন রয়েছে। কিন্তু আইন থাকা এবং নাগরিকের হাতে কার্যকরভাবে তথ্য পৌঁছানো এক বিষয় নয়। সরকারি দপ্তরগুলো নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করবে, তথ্যের উৎস ও পদ্ধতি জানাবে, তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করবে এবং ভুল বা অসংগত তথ্য সংশোধনের সুযোগ রাখবে—এমন একটি সংস্কৃতি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই তথ্য পেতে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, বিশেষ তদবির কিংবা দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়। অথচ রাষ্ট্রীয় তথ্য কোনো ব্যক্তি বা সরকারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানার অধিকার জনগণেরই। তথ্যের স্বাধীনতা তাই শুধু সাংবাদিকদের পেশাগত সুবিধা নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান উপায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১৯৭১-পরবর্তী সময়ে একটি স্বাধীন, স্বচ্ছ ও প্রতিষ্ঠাননির্ভর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিবর্তে রাষ্ট্র পরিচালনা ক্রমেই ব্যক্তি ও দলীয় আধিপত্যের দিকে ধাবিত হয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আবারও একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা হবে, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে এবং গণমাধ্যমকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করার পরিবেশ দেওয়া হবে। কিন্তু বর্তমান সরকারের অধীনে সেই সম্ভাবনাও দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: সরকার পরিবর্তন হলেই কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চরিত্র বদলে যায়? অতীতের রাজনৈতিক দলীয়করণের জায়গায় নতুন দলীয়করণ প্রতিষ্ঠিত হলে সেটিকে সংস্কার বলা যায় না। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে পেশাগত দক্ষতা, আইনি বাধ্যবাধকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে। অন্যথায় ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রের পরিবর্তন হবে না। গণতান্ত্রিক সংস্কারের অর্থ শুধু নতুন নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া নয়; বরং এমন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ক্ষমতাসীন ব্যক্তির ইচ্ছার ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠান ও আইন কার্যকর থাকবে। যে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির অনুগত হয়ে পড়ে, সেখানে সরকার পরিবর্তন হলেও নাগরিকের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সংকট থেকে যায়।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই মূলত অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বৃত্তে আটকে রয়েছে। তাদের সমর্থনভিত্তি (শিক্ষিত, অর্ধ-শিক্ষিত ও অশিক্ষিত জনগণ) সেই সংস্কৃতিকে পুরোপুরি সমর্থন করে। ফলে দলগুলোর রাজনৈতিক আচরণ ও সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা এখনো সীমিত। জামায়াতে ইসলামীও অনেকাংশে নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যেই আবর্তিত হচ্ছে। সেখানেও কাঠামোগত পরিবর্তন কিংবা প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার উল্লেখযোগ্য লক্ষণ খুব একটা দৃশ্যমান নয়।
এনসিপির ক্ষেত্রে অবশ্য কিছুটা পর্যবেক্ষণের অবকাশ রয়েছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দলটি যদি প্রকৃত অর্থে জনস্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক চর্চার পথে এগোতে পারে, তাহলে সেটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তবে কেবল নতুন রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেই সম্ভাবনা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান, কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই এর প্রমাণ দিতে হবে। অন্যথায় এনসিপিকেও আপাতত পর্যবেক্ষণের মধ্যেই রাখা যুক্তিযুক্ত।
প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের একটি বড় অংশ হলো ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার প্রবণতা। কে কোন দলের সমর্থক, কে কোন সরকারের ঘনিষ্ঠ, কে কোন রাজনৈতিক বয়ান প্রচার করছেন—এসব বিবেচনা অনেক সময় সত্য, তথ্য ও পেশাগত যোগ্যতার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায়। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে নতুন রাজনৈতিক দল, নতুন সরকার কিংবা নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বও শেষ পর্যন্ত পুরোনো ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রকৃত সাফল্য তাই শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনে নয়, বরং রাজনৈতিক আচরণ, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে কতটা পরিবর্তন আসছে, তার ওপর নির্ভর করবে।
একটি রাষ্ট্রে তথ্যের অবাধ ও স্বাধীন প্রবাহ নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্রের কার্যকারিতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। কারণ গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন, রাজনৈতিক দল কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর ভিত্তি হচ্ছে সত্য তথ্যের অধিকার, স্বাধীন সাংবাদিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি। জনগণ যদি জানতে না পারে রাষ্ট্র কী করছে, কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সরকারি অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাহলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অর্থই হারিয়ে যায়। তথ্যের স্বাধীনতা ছাড়া নাগরিকের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব নয়, স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার উন্মোচন কঠিন এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ছাড়া রাষ্ট্রের প্রতি জনআস্থা প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।
সবচেয়ে বড় কথা, গণতন্ত্রের মুখোশ পরে তথ্যকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রাখার সংস্কৃতি কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া, সরকার পরিবর্তন কিংবা নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান—কোনোটিই গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ সাফল্যের প্রমাণ নয়। একটি দেশের গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী, তা বিচার করতে হয় সেই দেশে সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা কতটুকু, রাষ্ট্রীয় তথ্য নাগরিকের নাগালে কতটা, গণমাধ্যম কতটা নির্ভয়ে কাজ করতে পারছে এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো প্রতিষ্ঠান কতটা কার্যকর, তার ভিত্তিতে।
বাংলাদেশের সামনে ১৯৭১-এর পর যেমন সুযোগ এসেছিল, ২০২৪-এর পরও তেমন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণে হারিয়ে গেলে জনগণের হতাশা বাড়ে, আর পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি নতুন নামে ফিরে আসে। সরকার বদলালেই রাষ্ট্রের অসুখ সারে না। তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং ক্ষমতার ঊর্ধ্বে আইনের শাসন। বাংলাদেশকে যদি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, তাহলে সবার আগে তথ্যের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্তির প্রশ্নে আপস করার সুযোগ নেই।








