কুষ্টিয়ায় পীর হত্যাকান্ডের রাজনীতিকরণ, দোষীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে

গত ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় অবস্থিত একটি দরবার শরীফে হামলা চালিয়ে আব্দুর রহমান শামীম নামে একজন পীরকে হত্যা করা হয়। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘কালান্দার বাবা’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কোরআন শরীফ অবমাননার ঘটনায় এই পীরের সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়টি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় কিছু বিক্ষুব্ধ মানুষ তার দরবারে হামলা করে।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার চেয়ে বিষয়টি রাজনৈতিক রূপ লাভ করেছে। কোরআন অবমাননার অভিযোগে উত্তেজিত জনতার হামলায় এই নিহতের ঘটনা ঘটলেও, মামলা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগে পুরো বিষয়টি এখন স্থানীয় রাজনীতির মারপ্যাঁচে আটকা পড়েছে। ফলে দোষীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই ফজলুর রহমান বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। এতে প্রধান ও হুকুমের আসামি করা হয়েছে স্থানীয় জামায়াতের নেতা মুহাম্মদ খাজা আহমেদকে। তিনি কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদের সদস্য। তাঁর বাড়ি ফিলিপনগর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে। মামলার এজাহারে চারজনের নাম ও পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য তিনজন হলেন দৌলতপুর উপজেলার হোসেনাবাদ (বিশ্বাসপাড়া) গ্রামের মৃত এরশাদ আলীর ছেলে মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দৌলতপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি। ৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে পশ্চিম–দক্ষিণ ফিলিপনগর দারোগার মোড় এলাকার গাজী মিস্ত্রীর ছেলে রাজীব মিস্ত্রী। ৪ নম্বর আসামি হলেন ইসলামপুর (পূর্ব পাড়া) গ্রামের বাসিন্দা মো. শিহাব।
যদিও উপজেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে এর তীব্র নিন্দা জানানো হয়। দাবী করা হয় যে, ঘটনাটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক। জামায়াতকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে জড়িয়ে এই হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক রূপ প্রদান করা হয়েছে। ১৫ এপ্রিল কুষ্টিয়া শহর জামায়াতের অফিসে উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা বেলাল হোসাইন এক সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবী করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই হত্যা মামলায় যে মুহাম্মদ খাজা আহমেদকে প্রধান আসামী করা হয় তিনি ঐ ইউনিয়নের জামায়াত ইসলামী কর্তৃক মনোনীত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী। তাকে নির্বাচনসহ সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখতে হামলার প্রধান আসামী করা হয়েছে। অথচ হামলার সময় তিনি ঐ স্থানে ছিলেনই না।
আসলে যা ঘটেছিল
উত্তেজনার শুরু সামাজিক যোগযাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নিয়ে। ভিডিওতে আব্দুর রহমান শামীম ওরফে ‘কালান্দার বাবা’ কে মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরিফ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করতে দেখা যায়। অবশ্য পুলিশের পক্ষ থেকে জানা যায় যে, ভিডিওটি অন্তত তিন বছর আগের, ২০২৩ সালের। এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দারা এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখায়। ঘটনার দিন দুপুর একটার দিকে স্থানীয়রা জড়ো হয়ে ফিলিপনগরে অবস্থিত শামীমের দরবার ঘেরাও করে। এক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতা দরবারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও একাধিক কক্ষে অগ্নিসংযোগ করে। এই ঘটনায় কালান্দার বাবা ওরফে শামীম নিহত হন। এছাড়া তার ২ অনুসারী ঘটনাস্থলে গুরুতর আহত হয়।
কালান্দার বাবা ওরফে শামীম সম্পর্কে স্থানীরা জানান, তিনি (শামীম) জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা নামের পাশাপাশি একাধিক ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। কখনো নিজেকে "শ্রী জাহাঙ্গীর", কখনো "শামীম কৃষ্ণ" বা অন্যান্য নামে পরিচয় দিতেন। তার চিন্তাচেতনা এমন ছিল যে, তিনি বিভিন্ন ধর্মের উপাদান মিশিয়ে একটি মিশ্র ধর্ম প্রচারের চেষ্টা করতেন।
একটি অরাজনৈতিক ঘটনাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা
ঘটনার শুরুতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিবাদ আসতে থাকে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বেশ কিছু ক্যাম্পাসে প্রগতিশীল পরিচয়ে কিছু শিক্ষার্থী প্রতিবাদ জানায়। এছাড়া বামপন্থী বেশকিছু সংগঠন মানববন্ধন, বিবৃতি দিয়ে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের গ্রেফতারের দাবী জানায়। সেই সাথে এধরনের সকল স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবী জানানো হয়।
সবকিছু ঠিক থাকলেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনীতি শুরু হয় একটি মামলাকে কেন্দ্র করে। নিহতের ভাই ফজলুর রহমান দৌলতপুর থানায় একটি হত্যামামলা দায়ের করেন যেখানে প্রধান আসামী করা হয় ওই ইউনিয়নের জামায়াত ইসলামী মনোনীত ইউনিয়ন চেয়ারম্যান প্রার্থী মুহাম্মদ খাজা আহমেদকে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের দৌলতপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানকে এই মামলার ২ নং আসামী করা হয়। এই মামলার ঘটনায় নড়ে-চড়ে বসে স্থানীয় জামায়াত। মুহাম্মদ খাজা আহমেদের সাথে যোগযোগ করা হলে জানা যায় ঘটনার দিন তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেনই না। অন্যান্য বেশকিছু সূত্র থেকে তার এই অবস্থান নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে বলে জানায় স্থানীয় কয়েকটি গণমাধ্যম।
এদিকে দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা বেলাল হোসেন জানান, সম্পুর্ন ইউনিয়ন বিএনপি নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদে এই মামলা করানো হয়েছে। এই হামলার ঘটনায় স্থানীয় জামায়াতের কোন নেতাকর্মী জড়িত নন। এই ঘটনার মাধ্যমে একটি অরাজনৈতিক হত্যাকান্ডকে রাজনৈতিক লেবাস দেওয়া হয়েছে। তাই এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিয়ে আমরা শঙ্কিত। জামায়াত ইসলামী যাতে ঐ ইউনিয়নে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সুষ্ঠুভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে সেজন্য এই মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, তারা হামলাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেফতার অভিযান শুরু করেছেন।







