ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় এবার স্পষ্টভাবে ‘পরিবারতন্ত্র’ থেকে সরে এসে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের বর্তমান সংসদ সদস্যদের স্ত্রী, কন্যা বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মনোনয়ন না দেওয়ার নীতিতে অনড় থেকে তুলনামূলক নতুন, সাংগঠনিকভাবে পরীক্ষিত এবং পেশাগতভাবে সক্ষম নারীদের সামনে আনার কৌশল নিয়েছে দলটি। ইতোমধ্যে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে। আগামী ১২ মে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট মোট ১৩টি আসন পাচ্ছে। প্রাথমিক সমঝোতা অনুযায়ী জামায়াত নিজে ১২টি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১টি আসন পেতে পারে। তবে এই বণ্টন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। জোটের ভেতরে এ নিয়ে একাধিক দফা আলোচনা চলছে এবং শেষ পর্যন্ত সমঝোতার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বলে জানা গেছে। দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে আলাদা প্রস্তুতি শুরু করে জামায়াত। মার্চজুড়ে দলীয়ভাবে একটি বিস্তৃত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। এতে কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগ থেকে একটি প্রাথমিক তালিকা নেওয়া হয়, পাশাপাশি বিভাগ, জেলা ও থানা পর্যায় থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে মতামত সংগ্রহ করা হয়। এক ধরনের ‘মাল্টি-লেভেল স্ক্রিনিং’ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য নামগুলো যাচাই করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের কেন্দ্রীয় এক নেতা বলেন, “এবার আমরা সচেতনভাবে একটি বিষয় এড়াতে চেয়েছি, তা হলো পরিবারকেন্দ্রিক প্রভাব। অনেক সময় দেখা যায়, নির্বাচিত এমপিদের পরিবার থেকেই আবার মনোনয়ন আসে। এতে দলের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয় এবং বাইরেও একটি নেতিবাচক বার্তা যায়। সেই জায়গা থেকে বের হয়ে আসার জন্যই এবার কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা পারিবারিক প্রভাব নয়, আমরা খুঁজেছি কারা বাস্তবে দলের জন্য কাজ করেছেন, কারা মাঠে সক্রিয় ছিলেন, কারা জনগণের সঙ্গে সংযোগ রাখতে পারেন। সেই বিবেচনায় তালিকাটা তৈরি হয়েছে। ফলে এবার অনেক নতুন মুখ সামনে আসবে, যারা আগে জাতীয় পর্যায়ে খুব বেশি আলোচনায় ছিলেন না।” দলের আরেকটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মনোনয়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- দল পরিচালনার অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, ব্যক্তিগত সততা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং জাতীয় সংসদে কার্যকরভাবে কথা বলার যোগ্যতা। পাশাপাশি আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া বোঝার সক্ষমতা এবং জনগণের অধিকার আদায়ে ভূমিকা রাখার সামর্থ্যকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহিলা বিভাগের এক দায়িত্বশীল নেতা বলেন, “আমরা শুধু ‘নারী প্রতিনিধি’ হিসেবে কাউকে পাঠাতে চাই না; আমরা চাই এমন প্রতিনিধিত্ব, যারা সংসদে গিয়ে বাস্তবিক অর্থে ভূমিকা রাখতে পারবেন। আইন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি —এসব বিষয়ে যাদের ধারণা আছে, যারা যুক্তি দিয়ে কথা বলতে পারেন, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।” জানা গেছে, দলীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো- যেসব কেন্দ্রীয় নেতা এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের কাউকে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়া হবে না। অর্থাৎ, এক পরিবার থেকে একাধিক সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ থাকছে না। তবে যেসব কেন্দ্রীয় নেতা নির্বাচিত হতে পারেননি, তাঁদের পরিবার থেকে কেউ কেউ বিবেচনায় থাকতে পারেন _এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এ বিষয়ে বলেন, “দলের একটি সুস্পষ্ট নীতি আছে। যাঁরা সংসদ সদস্য হবেন, তাঁদের পরিবারের কেউ সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পাবেন না। আমরা সেই নীতির বাইরে যাচ্ছি না। এটি নতুন কিছু নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবস্থান।” তবে দলীয় ভেতরের একটি সূত্র বলছে, এই নীতির ফলে অভ্যন্তরীণভাবে একটি ‘ব্যালান্স’ তৈরি হয়েছে। কারণ, এতে একদিকে যেমন পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ এড়ানো যাচ্ছে, অন্যদিকে তৃণমূল ও মধ্যম পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে উঠে আসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা নিয়েও দলীয় অন্দরে আলোচনা চলছে। মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নেসা সিদ্দীকা, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মারদিয়া মমতাজ এবং আইনজীবী সাবিকুন্নাহার মুন্নীর নাম ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। তবে শেষ মুহূর্তে তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। মহিলা বিভাগের পক্ষ থেকে ১২ জনের একটি প্রস্তাবিত তালিকা ইতোমধ্যে দলের প্রচার বিভাগে পাঠানো হয়েছে। দলীয় একটি সূত্র জানায়, “তালিকাটি মূলত অনুমোদনের অপেক্ষায় নেই, বরং এটি কার্যত ফাইনাল স্টেজে আছে। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জোটের সমীকরণ বিবেচনায় কিছু নাম অদলবদল হতে পারে।” এদিকে সংরক্ষিত নারী আসন ঘিরে জোট রাজনীতির হিসাব-নিকাশও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এনসিপি প্রাথমিকভাবে একটি আসন পেলেও তারা আরও একটি আসনের দাবি জানিয়েছে। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নারী নেত্রীকে সংসদে দেখতে চাওয়ার বিষয়টি জোট আলোচনায় উঠে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির এক নেতা বলেন, “আমরা মনে করি, আমাদের রাজনৈতিক অবদান ও প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে আরও একটি আসন পাওয়ার যৌক্তিকতা আছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে, এখনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি।” অন্যদিকে, জোটের আরও এক-দুটি শরিক দল সংরক্ষিত নারী আসনে অংশগ্রহণের আগ্রহ দেখালেও জামায়াতের একটি সূত্র বলছে, এবার জামায়াত ও এনসিপির বাইরের দলগুলোকে বিবেচনায় নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “জোটের ১৩টি আসনের মধ্যে কারা কতটি পাবে, তা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। যে দলের যতটুকু প্রাপ্য, সেটি নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জোটের শীর্ষ নেতৃত্বই নেবে।” টিআই/