ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় ইসলামী ছাত্রসংঘের তৎকালীন নেতা আব্দুল মালেকের ছবি যুক্ত হওয়ার পর তাঁকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রথম আলো। প্রতিবেদনে আব্দুল মালেকের পরিচয়, ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষানীতি নিয়ে একটি আলোচনা সভাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ এবং তাঁর মৃত্যুর ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী ছাত্রসংঘের পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ১৯৭১ সালে সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের ভূমিকার বিষয়ও প্রতিবেদনে এসেছে।
তবে প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। ১৯৬৯ সালের ১৫ আগস্ট আব্দুল মালেকের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁকে প্রাণঘাতী আঘাতটি আসলে কে করেছিল, সেই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর প্রতিবেদনে নেই। বরং প্রতিবেদনের এক জায়গায় সমকালীন সংবাদপত্রে সংঘর্ষ, আহত হওয়া ও মৃত্যুর তথ্য থাকার কথা বলা হলেও একই সঙ্গে স্বীকার করা হয়েছে, তাঁকে কে বা কারা প্রাণঘাতী আঘাত করেছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার মতো তথ্য পাওয়া যায় না।
এই অবস্থায় প্রতিবেদনের মূল অনুসন্ধান হওয়া উচিত ছিল সেই অমীমাংসিত প্রশ্নের দিকে। কিন্তু সেখানে বরং ১৯৬৯ সালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিস্তৃত বর্ণনা এসেছে। ফলে আব্দুল মালেক কে ছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর জন্য কে দায়ী, এই দুটি পৃথক প্রশ্ন একই বয়ানের মধ্যে চলে গেছে।
ঘটনার যে অংশটি নিশ্চিত
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষানীতি নিয়ে একটি মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর তৎকালীন সহসভাপতি তোফায়েল আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেন ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া) সভাপতি সামসুদ্দোহা।
সেদিনের ঘটনা নিয়ে ড. মোহাম্মদ হান্নানের ‘বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস (১৮৩০-১৯৭১)’ বইয়ে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। বইটির বর্ণনা অনুযায়ী, সামসুদ্দোহার বক্তব্যের সময় ইসলামী ছাত্রসংঘের একদল কর্মী সভাকক্ষে প্রবেশ করে হট্টগোল শুরু করেন। একপর্যায়ে মঞ্চে ওঠা, স্লোগান ও চেয়ার ছোড়াছুড়ির পর সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে সভাস্থলের বাইরেও।
অন্যদিকে ১৯৬৯ সালের ১৩ আগস্টের দৈনিক আজাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হন এবং তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আব্দুল মালেকের অবস্থা ছিল সবচেয়ে গুরুতর। তিন দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৫ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স ছিল ২২ বছর। আজাদের প্রতিবেদনে সংঘর্ষের বিস্তারিত বিবরণ থাকলেও আব্দুল মালেককে কে বা কারা আঘাত করেছিলেন, তাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
অর্থাৎ ঘটনাটির কয়েকটি বিষয় নিয়ে সমকালীন রেকর্ড রয়েছে। সংঘর্ষ হয়েছিল, কয়েকজন আহত হয়েছিলেন, আব্দুল মালেক গুরুতর আহত হন এবং তিন দিন পর মারা যান। কিন্তু তাঁর ওপর প্রাণঘাতী আঘাতটি কে করেছিল, সেই জায়গাটি সমকালীন বর্ণনাতেও অনির্দিষ্ট।
‘বিরোধীদের হামলা’ তাহলে কার হামলা
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আব্দুল মালেকের ছবির নিচে ডাকসুর দেওয়া ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘শিক্ষা সেমিনারে বক্তব্য দেওয়া শেষে ফেরার পথে বিরোধীদের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করেন।’ কিন্তু একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁকে কে বা কারা প্রাণঘাতী আঘাত করেছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার মতো তথ্য পাওয়া যায় না।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করা প্রয়োজন। একটি হলো, ওই সভাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়েছিল এবং দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়েছিল। অন্যটি হলো, আব্দুল মালেককে যে আঘাত শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়, সেটি কার হাতে হয়েছিল।
প্রথম বক্তব্যের পক্ষে সমকালীন সংবাদপত্রের তথ্য রয়েছে। দ্বিতীয় বক্তব্যের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় নেই। ফলে ‘বিরোধীদের হামলা’ বলতে যদি পুরো সংঘর্ষকে বোঝানো হয়, তাহলে সেটি একটি সাধারণ বর্ণনা। আর যদি তাঁর প্রাণঘাতী আঘাতের জন্য নির্দিষ্ট পক্ষকে বোঝানো হয়, তাহলে তার পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে, সেটি আলাদা করে দেখানো প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে এই পার্থক্যটি স্পষ্ট করা হয়নি।
একটি বইয়ের বর্ণনা, নাকি একাধিক স্বাধীন সূত্র
আব্দুল মালেকের মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনায় প্রথম আলোর প্রতিবেদনে মোহাম্মদ হান্নানের বইকে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বইয়ে ১২ আগস্টের সংঘর্ষের একটি বিস্তারিত ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে।
কিন্তু একটি ঐতিহাসিক ঘটনার ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে লেখা একটি বইয়ের বর্ণনা এবং ঘটনার সময় প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন একই ধরনের উৎস নয়। সমকালীন সংবাদপত্রে কী বলা হয়েছিল এবং পরে কোনো ইতিহাসগ্রন্থে কীভাবে ঘটনাটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে, সেটি পাশাপাশি দেখানো প্রয়োজন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দৈনিক আজাদের প্রতিবেদনও রয়েছে। কিন্তু হান্নানের বর্ণনা এবং আজাদের সমকালীন বর্ণনার মধ্যে কোথায় মিল, কোথায় পার্থক্য এবং কোন তথ্য কোন উৎস থেকে এসেছে, তা আরও পরিষ্কারভাবে আলাদা করা হয়নি।
এখানে মূল সাংবাদিকতাগত প্রশ্ন হলো, একটি উৎসের বর্ণনাকে অন্য স্বাধীন উৎস দিয়ে কতটা যাচাই করা হয়েছে। কারণ একই বই থেকে কয়েকটি আলাদা অনুচ্ছেদে তথ্য নেওয়া হলেও সেগুলো স্বাধীনভাবে পাওয়া একাধিক প্রমাণে পরিণত হয় না।
হান্নানের অবস্থান নিয়ে উৎস-সমালোচনার প্রশ্ন
মোহাম্মদ হান্নান বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন। তাঁর গবেষণাকর্মকে কোনোভাবেই শুধু রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বাতিল করার প্রশ্ন নেই। তবে তাঁর নিজের প্রকাশিত লেখায় ছাত্রলীগের ইতিহাস ও ভূমিকা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট মূল্যায়ন দেখা যায়।
২০২২ সালে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত এক লেখার শিরোনাম ছিল ‘ছাত্রলীগের ইতিহাসটা বাংলাদেশেরই ইতিহাস’। সেখানে হান্নান ছাত্রলীগকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারার অগ্রগামী শক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন এবং লেখেন, ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড না থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিলম্বিত হতে পারত।
এটি তাঁর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার একটি প্রকাশ্য দৃষ্টিভঙ্গি। এ কারণে তাঁর ১৯৬৯ সালের ছাত্রসংঘর্ষের বর্ণনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভুল হয়ে যায় না। কিন্তু যেহেতু ঘটনাটির এক পক্ষ ছিল ইসলামী ছাত্রসংঘ এবং অন্যদিকে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, তাই এই ধরনের রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ঘটনার ক্ষেত্রে তাঁর বর্ণনাকে আরও স্বাধীন সমকালীন দলিল দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে ইসলামী ছাত্রসংঘের ইতিহাস ও আব্দুল মালেকের জীবনীসংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে ছাত্রশিবিরের ওয়েবসাইট ব্যবহারের সময় সংগঠনটির অবস্থান সম্পর্কে পাঠককে সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু হান্নানের বর্ণনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের উৎস-সমালোচনার প্রয়োজন ছিল কি না, সেই বিষয়টি প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।
অর্থাৎ প্রশ্নটি হান্নানের বক্তব্য গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের নয়। প্রশ্নটি হলো, ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানসম্পন্ন উৎসগুলোর ক্ষেত্রে একই ধরনের যাচাইয়ের মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছে কি না।
সমকালীন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য
১২ আগস্টের সংঘর্ষের কয়েক দিন পর, ১৭ আগস্ট ১৯৬৯ পূর্ব পাকিস্তানের ছয় ছাত্রনেতা আব্দুল মালেকের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের দুই অংশের নেতারা এবং ছাত্রলীগের নেতারা।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মোস্তফা জামাল হায়দার, মাহবুবউল্লাহ, সামসুদ্দোহা, নুরুল ইসলাম, তোফায়েল আহমেদ ও আ স ম আবদুর রব ওই বিবৃতিতে বলেন, একটি বিশেষ মহলের ইঙ্গিতে কিছুসংখ্যক ছাত্র গোলযোগ সৃষ্টি করলে তার দুঃখজনক পরিণতি হিসেবে আব্দুল মালেকের মৃত্যু ঘটে। ডাকসুর পক্ষ থেকেও শোক জানানো হয়েছিল।
এই বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই প্রকাশিত একটি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। এটি হান্নানের পরবর্তী সময়ের ইতিহাসগ্রন্থের বর্ণনার সঙ্গে পাশাপাশি রাখলে ১৯৬৯ সালের ঘটনাটির বিভিন্ন সমকালীন ব্যাখ্যা আরও পরিষ্কার হতে পারে।
একইভাবে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান আব্দুল মালেকের মৃত্যুতে শোকবাণী দিয়েছিলেন এবং আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে একটি শোকসভার আয়োজন করা হয়েছিল।
ফলে সমকালীন রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য, ছাত্রনেতাদের বিবৃতি এবং সংবাদপত্রের প্রতিবেদন একত্রে বিশ্লেষণ করলেই ঘটনাটির পূর্ণ চিত্র পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
মালেক কে ছিলেন এবং তাঁকে কে হত্যা করেছিল, দুটি প্রশ্ন এক নয়
আব্দুল মালেকের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তার বড় অংশই তাঁর সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘকে ঘিরে। ছাত্রশিবিরের ওয়েবসাইটের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালেক বগুড়ার বাসিন্দা ছিলেন, ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগে ভর্তি হন এবং ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগ দেন। তিনি ফজলুল হক মুসলিম হলে থাকতেন।
এরপর প্রতিবেদনে ইসলামী ছাত্রসংঘের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের সম্পর্ক, ১৯৭১ সালে আলবদর গঠনে সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততা এবং স্বাধীনতার পর সংগঠনটির কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ছাত্রশিবিরের আবির্ভাবের কথাও বলা হয়েছে।
এসব তথ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ। কিন্তু এগুলো থেকে আলাদা একটি প্রশ্ন হলো, ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্টের সংঘর্ষে আব্দুল মালেককে কে প্রাণঘাতী আঘাত করেছিল।
একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর পরিচয় বোঝাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর দায় নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। এই দুই প্রশ্নকে এক করে দেখলে পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস দিয়ে আগের একটি ঘটনার চরিত্র নির্ধারণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশেষ করে আব্দুল মালেক মারা যান ১৯৬৯ সালের ১৫ আগস্ট, বাংলাদেশের স্বাধীনতার দুই বছর আগে। তাই ১৯৭১ সালে ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা-কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে যে ঐতিহাসিক দলিল রয়েছে, তা ১৯৬৯ সালে আব্দুল মালেকের ওপর কে প্রাণঘাতী আঘাত করেছিল, তার সরাসরি প্রমাণ নয়। এখানে ১৯৬৯ সালের ঘটনা এবং ১৯৭১ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসকে আলাদা রেখেই বিচার করা প্রয়োজন।
রেসকোর্সের ছবিটি কি অনুসন্ধানের সূত্র হতে পারে?
আব্দুল মালেককে সংঘর্ষের পর আহত অবস্থায় দেখানো একটি পুরোনো ছবি বিভিন্ন সময় প্রচারিত হয়েছে। ছবিটির মূল উৎস, আলোকচিত্রী, ধারণের সময়, স্থান এবং প্রকাশের সময়কার ক্যাপশন নির্ধারণ করা গেলে ঘটনাটি অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
ছবিতে দৃশ্যমান ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা গেলেও শুধু ছবি দেখে কাউকে আব্দুল মালেকের ওপর প্রাণঘাতী হামলাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। তবে ছবিটি কারা কোথায় ছিলেন, ঘটনাটি কোন পর্যায়ে ঘটেছিল এবং প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে কাদের খুঁজে পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে নতুন সূত্র দিতে পারে।
সেই কারণে ছবিটির মূল সংস্করণ, তৎকালীন সংবাদপত্রে প্রকাশিত কপি এবং সংশ্লিষ্ট আর্কাইভ খুঁজে দেখা একটি স্বাভাবিক অনুসন্ধানী পদক্ষেপ হতে পারে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে এমন অনুসন্ধানের কোনো বিস্তারিত বর্ণনা নেই।
চিকিৎসা ও প্রশাসনিক নথির প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ
আব্দুল মালেক তিন দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যান বলে সমকালীন সংবাদপত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তাহলে তাঁর চিকিৎসার নথি, মৃত্যুর চিকিৎসাগত কারণ, সে সময়কার পুলিশি তদন্ত বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রশাসনিক নথি পাওয়া যায় কি না, সেটিও অনুসন্ধানের অংশ হতে পারে।
একইভাবে ১২ আগস্টের সভার আয়োজক, প্রত্যক্ষদর্শী, উপস্থিত ছাত্রনেতা এবং শিক্ষকরা পরে কোথাও ওই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন কি না, তা খুঁজে দেখা যেতে পারে।
এসব নথির কোনোটি পাওয়া গেলে তা ১৯৬৯ সালের ঘটনাটিকে পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বাইরে এনে সমকালীন প্রমাণের ভিত্তিতে পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
পরবর্তী ইতিহাসকে আগের ঘটনার প্রমাণ বানানোর ঝুঁকি
আব্দুল মালেকের মৃত্যুর পর ইসলামী ছাত্রসংঘ তাঁকে ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে আন্দোলনের শহীদ হিসেবে স্মরণ করেছে। পরবর্তী সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরও তাঁর স্মৃতিকে নিজেদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে। ১৫ আগস্টকে ‘ইসলামী শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন করার কথাও প্রথম আলোর প্রতিবেদনে এসেছে।
এটি একটি সংগঠনের স্মৃতিচর্চা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ। একইভাবে ১৯৭১ সালে ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা-কর্মীদের ভূমিকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি পৃথক অধ্যায়। কিন্তু কোনো সংগঠনের পরবর্তী ইতিহাস দিয়ে তার কোনো সাবেক নেতার কয়েক বছর আগের মৃত্যুর ঘটনায় নির্দিষ্ট ব্যক্তির দায় প্রমাণ করা যায় না।
ইতিহাসের কালক্রম এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৯ সালের ঘটনা বোঝার জন্য প্রথমে ১৯৬৯ সালের দলিল দেখতে হবে। ১৯৭১ সালের ঘটনা দিয়ে ১৯৬৯ সালের কোনো অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর তৈরি করা যাবে না।
আসল অনুসন্ধান এখনো বাকি
আব্দুল মালেকের মৃত্যুর বিষয়ে এখন পর্যন্ত যে তথ্য সামনে রয়েছে, তাতে একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে বলা যায়। ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ হয়েছিল, আব্দুল মালেক গুরুতর আহত হয়েছিলেন এবং ১৫ আগস্ট হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। সমকালীন সংবাদপত্রে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
কিন্তু তাঁকে প্রাণঘাতী আঘাতটি কে করেছিল, সেই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর সমকালীন সংবাদপত্রের বর্ণনায় নেই। প্রথম আলোর প্রতিবেদনেও সেই উত্তর পাওয়া যায় না।
তাই এই ঘটনাকে নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধান করতে হলে প্রশ্নগুলো হওয়া উচিত আরও নির্দিষ্ট: ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ঠিক কী ঘটেছিল? আব্দুল মালেক কোন পর্যায়ে আহত হন? তাঁর আঘাতের ধরন ও মৃত্যুর চিকিৎসাগত কারণ কী ছিল? পুলিশ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো তদন্ত হয়েছিল কি না? সে সময়ের প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কি হামলাকারীর পরিচয় দিয়েছিলেন? ১৭ আগস্টের ছয় ছাত্রনেতার বিবৃতিতে যে ‘বিশেষ মহল’ ও ‘কিছুসংখ্যক ছাত্রের’ কথা বলা হয়েছিল, তাঁদের পরিচয় কী ছিল?
এছাড়াও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, রেসকোর্সের ছবিতে থাকা ব্যক্তিরা কারা? সমকালীন আরও কোনো সংবাদপত্র বা নথিতে হামলাকারীর পরিচয় আছে কি না? -এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া আব্দুল মালেকের মৃত্যুর দায় নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
ইতিহাসে যা জানা যায় এবং যা জানা যায় না
আব্দুল মালেকের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে। তাঁর সংগঠনের পরবর্তী ইতিহাস নিয়েও যথেষ্ট নথি রয়েছে। ডাকসুর সংগ্রহশালায় তাঁর ছবি রাখা হবে কি না, সেটি নিয়েও বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও তাঁর ছবি প্রদর্শনকে ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে জানিয়েছে এবং এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি করেছে।
কিন্তু সংগ্রহশালায় তাঁর ছবি রাখা বা না রাখার বিতর্কের বাইরে ১৯৬৯ সালের মৃত্যুর ঘটনাটির নিজস্ব অনুসন্ধান প্রয়োজন। কারণ ইতিহাসের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়, তাঁর সংগঠনের পরবর্তী ভূমিকা এবং তাঁর মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ তিনটি আলাদা বিষয়।
কোনো ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় যত বিতর্কিতই হোক, তাঁর মৃত্যুর দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রমাণের প্রশ্নটি আলাদা থাকে।
আব্দুল মালেকের ক্ষেত্রে সেই প্রমাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে ১৯৬৯ সালের ওই ঘটনার বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভুল অবস্থান হতে পারে, যা প্রমাণিত তা বলা, বিভিন্ন উৎসের বক্তব্য আলাদা করে উপস্থাপন করা এবং যে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি, সেটিকে উত্তরহীন হিসেবেই রাখা।
ইতিহাসের অনুসন্ধানে অজানা জায়গাগুলোকে স্বীকার করাও তথ্যের প্রতি দায়বদ্ধতার অংশ।








