উপদেষ্টা-সচিবদের ছত্রছায়ায় যুব উন্নয়নে ৪ কোটির পদোন্নতি-বদলি বাণিজ্য!
পদোন্নতি ১ লাখ, পছন্দের পোস্টিং ২ লাখ

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে পদোন্নতি পেতে দিতে হতো ১ লাখ টাকা। আর পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য গুনতে হতো আরও ২ লাখ। এভাবেই ১৮৮ জন কর্মকর্তার পদোন্নতি ও বদলিকে কেন্দ্র করে প্রায় ৪ কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতাও পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, তৎকালীন সচিব মাহবুব-উল-আলম, যুগ্মসচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন, উপসচিব মাসুম আহমেদসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগ অনুযায়ী, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে নতুন পদে পদায়নের আদেশের ক্ষেত্রে প্রায় ৭৬ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির নামে আদায় করা হয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এরপর পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য নেওয়া হয়েছে আরও প্রায় ২ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এসব পদোন্নতি ও বদলি ঘিরে লেনদেনের পরিমাণ ৪ কোটি টাকার বেশি বলে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর কমিশন অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অভিযোগ অনুসন্ধানে চার সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়েছে। অনুসন্ধান শেষে টিমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১৮৮ কর্মকর্তাকে ঘিরে কোটি টাকার লেনদেন
দুদকের নথি ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, দায়িত্ব বাতিল, নতুন পদে পদায়ন এবং পছন্দের কর্মস্থলে বদলিকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এই চক্রের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা এবং অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে নতুন পদে পদায়নের ক্ষেত্রে জনপ্রতি প্রায় ২ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। এতে মোট ৭৬ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার নামে জনপ্রতি ১ লাখ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ খাতে মোট ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর পদোন্নতিপ্রাপ্তদের পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য জনপ্রতি আরও প্রায় ২ লাখ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ খাতে লেনদেন হয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা।
উপদেষ্টা-সচিবদের ছত্রছায়ায় সিন্ডিকেট
দুদকের নথিতে অভিযোগের তীর সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, তৎকালীন সচিব মাহবুব-উল-আলম, যুগ্মসচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন ও উপসচিব মাসুম আহমেদের দিকে। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, শুধু পদোন্নতি ও বদলি নয়, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন কেনাকাটা ও টেন্ডার নিয়েও অনিয়ম করা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অভিযুক্তরা বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো দুদকের অনুসন্ধানে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
অভিযোগে মাঠপর্যায়ের যেসব কর্মকর্তার নাম এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা, মামুন, জাহিদ, আমীর (ঢাকা), আনিচ, জাহিদ, ইব্রাহিম (বগুড়া), জুলহাস (বরিশাল), নাকিমউদ্দিন, আলী হোসেন, আবু সাঈদ (পাবনা), কোরবান আলী (ধামরাই, ঢাকা) এবং আলী হোসেন (নরসিংদী)। তাদের সমন্বয়ে পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্য পরিচালিত হতো বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে চার সদস্যের টিম
দুদকের উপপরিচালক জাহিদ কালামের নেতৃত্বে গঠিত অনুসন্ধান টিমে রয়েছেন সহকারী পরিচালক নাছরুল্লাহ হোসাইন, উপসহকারী পরিচালক ইমরান আকন ও রোমান উদ্দিন।
অনুসন্ধান টিম অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথিপত্র সংগ্রহে সরকারি দপ্তরগুলোতে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য জানতে তাদের দুদকে তলব করা হতে পারে।
পদোন্নতি ও বদলির আদেশ, সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বের করার চেষ্টা করবে অনুসন্ধান টিম।
দুদককে প্রমাণ প্রকাশের আহ্বান আসিফের
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সঙ্গে মোবাইল ফোন ও মেসেজের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার ঘনিষ্ঠ একজন জানিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হতে পারে।
এরই মধ্যে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে দুদকের প্রতি অভিযোগের প্রমাণ প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন আসিফ মাহমুদ। সন্ধ্যা ৫টা ৫৬ মিনিটে দেওয়া ওই স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, ১৮৮ জন উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার কাছ থেকে ১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা করে ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা দুর্নীতির অভিযোগ করা হয়েছে একজন উপদেষ্টা, একজন সচিব, একজন যুগ্মসচিব ও একজন উপসচিবসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে। দুদক বলছে, প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেই প্রমাণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
স্ট্যাটাসে আসিফ মাহমুদ আরও উল্লেখ করেন, এ বিষয়ে তিনি রাতে বিস্তারিত কথা বলবেন।
এখন দুদকের অনুসন্ধানে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, পদোন্নতি ও পছন্দের পোস্টিংয়ের নামে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা লেনদেন হয়েছে, কারা এই অর্থ সংগ্রহ করেছে এবং মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কোন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাইয়ের পরই এসব অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।









