আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোই ছিল হাসিনা পতনের সূচনা
রংপুরের ছয় শহীদের বিচার ঝুলে আছে

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ ১৬ জুলাই পুলিশের গুলির সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই দৃশ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। এরপর রংপুরের আন্দোলন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সাধারণ মানুষের ঢল নামে রাজপথে। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং ৫ আগস্ট ঘটে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। কিন্তু সেই রক্তাক্ত আন্দোলনে রংপুরে নিহত ছয়জনের কোনো হত্যা মামলাতেই দুই বছরেও চার্জশিট দিতে পারেনি পুলিশ। শহীদ পরিবার, আহত আন্দোলনকারী ও সমন্বয়কদের অভিযোগ, ক্ষমতার পালাবদল হলেও বিচারপ্রক্রিয়ার গতি আশানুরূপ হয়নি। অন্যদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েকটি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের পর অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
আবু সাঈদের মৃত্যুর পর বদলে যায় আন্দোলনের গতি
১৬ জুলাই রংপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তার মৃত্যুর পর রংপুরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শিক্ষক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ বহুগুণ বেড়ে যায়। পর্যবেক্ষকদের মতে, রংপুর থেকেই আন্দোলনের নতুন গতি তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
৩ আগস্টে গণজোয়ার, ৪ আগস্টে রক্তক্ষয়
৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে সরকার পতনের এক দফা দাবি ও অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণার পর রংপুরেও রাজপথে নামে হাজারো মানুষ। বৃষ্টিমুখর দিনেও নগরজুড়ে তৈরি হয় গণজোয়ার। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময়ের ঘটনাও আলোচনায় আসে।
তবে পরদিন ৪ আগস্ট পরিস্থিতি পাল্টে যায়। বিভিন্ন এলাকা থেকে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা নগরীতে জড়ো হন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়েও তারা অবস্থান নেন। টাউন হল, জাহাজ কোম্পানি মোড়, সিটি বাজার, সুপার মার্কেট ও পায়রা চত্বর এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শেষে বিভিন্ন এলাকা আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে আসে।
সেদিন সংঘর্ষে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের পাঁচ নেতাকর্মী নিহত হন। আহত হন সাংবাদিকসহ অন্তত অর্ধশত মানুষ।
১৬ থেকে ১৯ জুলাই: ছয় প্রাণ হারায় রংপুর
রংপুরে জুলাই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ছয়জন। তাদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষার্থী আবু সাঈদ, অটোরিকশাচালক মানিক মিয়া, সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন, স্বর্ণশ্রমিক মোসলেম উদ্দিন মিলন, ফল বিক্রেতা মেরাজুল ইসলাম এবং শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল তাহির।
১৮ ও ১৯ জুলাই নগরজুড়ে সংঘর্ষে পুলিশের রাবার বুলেট, টিয়ারশেল ও গুলিতে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বিভিন্ন এলাকা। পুলিশের সামনে ইটপাটকেল নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন আন্দোলনকারীরা। ওই সময় একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় আন্দোলন আরও বেগ পায়।
কেউ হারিয়েছেন পা, কেউ হারিয়েছেন চোখ
সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ আহত হন। অনেকেই চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। গুলিতে চোখ হারান আবেদ আলী। পা হারান মমদেল হোসেন ও পল্লী চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আন্দোলনের সময় কোনো কারণ ছাড়াই তার চেম্বারের শাটার ভেঙে গুলি চালানো হয়। সেই গুলিতেই তার বাম পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, এমন দিন আর যেন দেশে ফিরে না আসে।
‘আবু সাঈদের দুই হাতই মানুষকে রাজপথে ডেকেছিল’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক ইমরান আহমেদ বলেন, পুলিশের বন্দুকের সামনে আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছিল দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। তার ভাষায়, সেই আত্মত্যাগই দেশের মানুষকে রাজপথে নামতে অনুপ্রাণিত করেছিল এবং আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ দিয়েছিল।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আন্দোলনে গুলি চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত অনেকেই এখনো আইনের আওতার বাইরে রয়েছেন।
শহীদ পরিবারের প্রশ্ন: বিচার কবে?
শহীদ সাজ্জাদ হোসেনের মা ময়না বেগম বলেন, দুই বছর পার হলেও মামলার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। তার প্রত্যাশা, ছেলে হত্যার বিচার তিনি জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারবেন।
শহীদ মেরাজুল ইসলামের স্ত্রী নাজমিন বলেন, স্বামীকে হারিয়ে সন্তানদের নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। তার দাবি, শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, হত্যাকাণ্ডের বিচারও নিশ্চিত করতে হবে।
দুই বছরেও নেই চার্জশিট
জুলাই আন্দোলনে রংপুরে নিহত ছয়জনের ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলাগুলোর কোনোটিতেই দুই বছরেও চার্জশিট আদালতে জমা পড়েনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলায় সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ কয়েক হাজার মানুষকে আসামি করা হয়। তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, গুলি চালানোর অভিযোগ থাকা কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি।
অন্যদিকে রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী জানিয়েছেন, তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কয়েকটি মামলার চার্জশিট প্রস্তুত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদনের পর আদালতে দাখিল করা হবে।









