মানবাধিকার কমিশনকে ঘিরে আইনি কাঠামোর পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে জাতীয় সংসদে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন সাময়িকভাবে পুনঃপ্রচলনের উদ্যোগকে সরকার যেখানে বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনীয় বলছে, সেখানে বিরোধীদল একে দেখছে ‘পশ্চাৎমুখী’ পদক্ষেপ হিসেবে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে মানবাধিকার সুরক্ষায় বাংলাদেশ কোন পথে এগোচ্ছে: পুরোনো কাঠামোর স্থিতিশীলতা, নাকি নতুন আইনের অনিশ্চিত সংস্কার? বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬’ উত্থাপন ঘিরে একধরণের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আর এ বিতর্ক কেবল একটি আইনের গ্রহণ-বর্জনের প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্রের মানবাধিকার দর্শন, অগ্রাধিকার এবং রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন। সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি চূড়ান্ত কোনো সমাধান নয়; বরং এতে একাধিক কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষ করে অধ্যাদেশের ১৬ নম্বর ধারাকে তিনি ভিকটিমদের জন্য ‘আরেকটি মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যা দেন, যেখানে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুপস্থিত। তার যুক্তি অনুযায়ী, এমন অস্পষ্ট আইনি কাঠামো কার্যকর বিচার নিশ্চিত করার বদলে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। এখানে সরকারের অবস্থানটা স্পষ্ট। সরকারের চাওয়া একটি দুর্বল ও বিতর্কিত অধ্যাদেশের পরিবর্তে একটি পরীক্ষিত আইনি কাঠামোতে (২০০৯ সালের আইন) সাময়িকভাবে ফিরে যাওয়া, যাতে করে মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম বন্ধ না হয়ে যায়। আইনমন্ত্রীর ভাষায়, “কেউ যেন বলতে না পারে যে দেশে কোনো মানবাধিকার কমিশন নেই”—এই বাস্তবতা থেকেই এই পদক্ষেপ। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এই সিদ্ধান্তকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। তার মতে, ২০০৯ সালের আইন অতীতে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হয়েছে, বিশেষ করে ভিন্নমত দমন এবং বিরোধী দলকে চাপে রাখার হাতিয়ার হিসেবে। ফলে সেই আইনে ফিরে যাওয়া মানে পুরনো বিতর্কিত কাঠামোকেই পুনরুজ্জীবিত করা। হাসনাত আবদুল্লাহ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতার বিচার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ, তার বক্তব্যে একটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন উঠে আসে—আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে কি অতীতের দায় এড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে? সবমিলিয়ে সরকার এবং বিরোধী দলের এই দুই অবস্থানের মাঝে বাস্তবতা হলো- বাংলাদেশে মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন। ২০০৯ সালের আইনের অধীনে গঠিত কমিশন কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছে, সেটি যেমন আলোচনার বিষয়, তেমনি নতুন অধ্যাদেশটি কতটা কার্যকর ও ভিকটিম-ফ্রেন্ডলি ছিল, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যখন বলছে, নতুন অধ্যাদেশটি ত্রুটিপূর্ণ এবং আরও স্টেকহোল্ডার পরামর্শ প্রয়োজন, তখন সেটি একধরনের ‘কনসালটেটিভ অ্যাপ্রোচ’-এর ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু বিরোধীদল এটিকে দেখছে সময়ক্ষেপণ বা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে। এই দ্বন্দ্বটাই আসলে পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সরকারের সাম্প্রতিক মানবাধিকার রেকর্ডের প্রশ্ন। আইনমন্ত্রী দাবি করেছেন, বর্তমান সরকারের ৪২ দিনের মেয়াদে কোনো গুম বা ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেনি। এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা, যা সরকারের মানবাধিকার প্রতিশ্রুতিকে সামনে আনে। তবে সমালোচকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা ছাড়া এমন দাবি দিয়ে পুরো চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে, ২০০৯ বনাম ২০২৫—এটি কেবল দুটি আইনের লড়াই নয়। এটি আসলে একটি বৃহত্তর প্রশ্নের প্রতিচ্ছবি: বাংলাদেশ কি একটি স্থিতিশীল কিন্তু বিতর্কিত পুরনো কাঠামোর ওপর নির্ভর করবে, নাকি নতুন কিন্তু অপরিপক্ব আইনি কাঠামোকে সময় নিয়ে পরিপূর্ণ করার পথে হাঁটবে? তবে এই মুহূর্তে সরকার যে পথটি বেছে নিয়েছে, তা হলো ‘সাময়িক প্রত্যাবর্তন, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার’। কিন্তু এই পথ কতটা কার্যকর হবে, আর তা সত্যিই মানবাধিকার সুরক্ষাকে শক্তিশালী করবে কি না—সেই উত্তর এখনো সময়ের হাতেই রয়ে গেছে। টিআই/