বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না বরং আরও গভীর হয়ে ওঠে। “ইলিয়াস আলী কোথায়?” এমনই এক প্রশ্ন, যা গত ১৩ বছর ধরে অনুরিত। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তার স্ত্রী ও সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা আবারও এই প্রশ্ন তুলেছেন। তার কণ্ঠে ছিল ব্যক্তিগত বেদনা, কিন্তু সেই সঙ্গে ছিল রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহির দাবি। সংসদের ভেতরে উচ্চারিত এই প্রশ্ন নতুন নয়, তবে প্রতিবারই তা যেন নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি ঘটনার উত্তরহীনতা কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে একটি জাতির বিবেককে নাড়া দিতে পারে। ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে নিখোঁজ হন বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী এবং তার গাড়িচালক আনসার আলী। এই ঘটনার পরপরই দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। বিএনপি এটিকে পরিকল্পিত গুম হিসেবে অভিযোগ করে টানা হরতাল, অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সড়ক অবরোধ, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, সংঘর্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে, যেখানে ইলিয়াস আলীর রাজনৈতিক প্রভাব ছিল বেশি, সেখানে আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে। কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে; প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে, বহু মানুষ আহত হন। একই সময়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানায় এবং একটি নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের দাবি তোলে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আন্দোলনের তীব্রতা কমে এলেও, ঘটনার রহস্য আর ভেদ হয়নি। এই দীর্ঘ সময়ে সবচেয়ে বেশি ভার বহন করেছে একটি পরিবার। ১৩ বছর ধরে অপেক্ষা—যেখানে প্রতিটি দরজার শব্দ, প্রতিটি ফোনকল নতুন করে আশার জন্ম দেয়। হয়তো কোনো খবর আসবে, হয়তো কোনোদিন ফিরে আসবেন তিনি। এই আশাই বাঁচিয়ে রেখেছে পরিবারটিকে, যদিও বাস্তবতা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। সংসদে লুনার বক্তব্যে সেই অপেক্ষার ক্লান্তি যেমন ছিল, তেমনি ছিল অন্য অনেক পরিবারের প্রতিনিধিত্বও, যারা একইভাবে তাদের স্বজনদের খোঁজে বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। ফলে এই প্রশ্ন এখন আর একক কোনো পরিবারের নয়; এটি হয়ে উঠেছে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর সম্মিলিত কণ্ঠস্বর। শেষ পর্যন্ত, “ইলিয়াস আলী কোথায়?”—এই প্রশ্নটি কেবল একটি ব্যক্তির অবস্থান জানার দাবি নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারের পরীক্ষা। একটি নিখোঁজের ঘটনা কীভাবে দেশজুড়ে আন্দোলন, সংঘর্ষ এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে, ইলিয়াস আলীর ঘটনাই তার অন্যতম উদাহরণ। ১৩ বছর পরও যখন এই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই, তখন তা কেবল অতীতের একটি ঘটনার অপূর্ণতা নয়, বরং বর্তমানের ওপরও একটি ছায়া ফেলে। সময়ের সাথে অনেক কিছুই বদলায়, কিন্তু কিছু প্রশ্ন থেকে যায়—অস্বস্তিকর, কিন্তু অনিবার্য। ইলিয়াস আলীর ঘটনাও তেমনই একটি প্রশ্ন, যা উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে।