বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণে কিছু প্রতীক, কিছু শব্দ, কিছু ইতিহাস বারবার ফিরে আসে। “স্বাধীনতার ঘোষক” তেমনই একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক টার্ম যা শুধু ইতিহাসের প্রশ্ন নয়, বরং ক্ষমতার ভাষ্য, বৈধতার ভিত্তি এবং জনমনে আবেগ তৈরির একটি কার্যকর হাতিয়ার।দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যায়, এই একটি প্রশ্নকে ঘিরেই দুই প্রধান ধারার ভিন্ন বয়ান গড়ে উঠেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিতর্কিত ভূমিকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ বরাবরই বলে এসেছে—“স্বাধীনতার ঘোষক একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমান।” দলটির নেতাদের ভাষ্যে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, ৭ মার্চের ভাষণ এবং ২৫ মার্চের ঘোষণার ধারাবাহিকতাই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই বয়ানকে আংশিক স্বীকার করলেও ভিন্ন জোর দেয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভিন্ন বক্তব্যে বলেছেন “মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন, যা সারা দেশে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।” এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে, যা হলো “ঘোষণা দেওয়া” বনাম “ঘোষণা পাঠ করা”। বিএনপি প্রায়ই এই দুইয়ের সীমারেখা ঝাপসা করে রাজনৈতিকভাবে “ঘোষক” শব্দটি ব্যবহার করে, যা তাদের দলীয় চিন্তা-চেতনার সাথে জড়িয়ে গেছে। ঐতিহাসিক বাস্তবতায় ফিরে গেলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমান ঘোষণা দেন— “I, Major Ziaur Rahman, on behalf of our great national leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, do hereby declare the independence of Bangladesh.” এই বাক্যটি নিজেই একটি দ্বৈত বাস্তবতা তুলে ধরে—ঘোষণার উৎস ও ঘোষণার প্রচার। কিন্তু রাজনীতি খুব কমই এই সূক্ষ্মতা ধরে রাখতে চায়। কারণ রাজনীতির লক্ষ্য ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠ নয়, বরং শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ন্যারেটিভ তৈরি করা। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বহুবার বলেছেন “স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই, এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে বঙ্গবন্ধুই ঘোষক।” অন্যদিকে বর্তমানে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে বারবার ফিরে আসে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা “স্বাধীনতার ঘোষণা জিয়াউর রহমানই প্রথম প্রচার করেন, যা মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করে।” এই দ্বন্দ্ব কেবল ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নয়; এটি আসলে দুইটি রাজনৈতিক ধারার প্রতিযোগিতা—একটি “মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের বৈধতা” প্রতিষ্ঠা করতে চায়, অন্যটি “যুদ্ধের সংগঠক ও কার্যকর ভূমিকা”কে সামনে আনে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই বিতর্ক এত বছর পরও এত গুরুত্বপূর্ণ? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। এখানে ইতিহাস শুধু অতীত নয়—এটি বর্তমানের ক্ষমতার ভিত্তি। জুলাই অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী রাজনীতিতে যে দল মুক্তিযুদ্ধের বয়ানকে নিজের সঙ্গে শক্তভাবে যুক্ত করতে পারবে, সে দল জনমনে নৈতিক উচ্চতা দাবি করতে পারবে বলে ধরে নেওয়া হতো। ফলে “স্বাধীনতার ঘোষক” হয়ে উঠেছিল একটি প্রতীক যার মাধ্যমে রাজনৈতিক বৈধতা নির্মাণ করা হয়। তবে একাডেমিক ও গবেষণামূলক বিশ্লেষণে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। অনেক গবেষক মনে করেন, স্বাধীনতার রাজনৈতিক ঘোষণা এসেছে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে, আর সেই ঘোষণাকে যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন জিয়াউর রহমান। কিন্তু এই ভারসাম্যপূর্ণ ব্যাখ্যা জুলাই অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী রাজনৈতিক বক্তৃতায় খুব কমই জায়গা পেত। কারণ রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্বৈততা নয়, স্পষ্ট ও একমুখী বয়ান পছন্দ করে। যাই হোক, “স্বাধীনতার ঘোষক” বিতর্কটি ইতিহাসের চেয়ে রাজনীতির ক্ষেত্রেই বেশি সক্রিয়। এটি বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামীলীগের মধ্যকার একটি চলমান ন্যারেটিভ যুদ্ধ, যেখানে এই দুইটি দল নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে ইতিহাসের নির্দিষ্ট অংশকে তুলে ধরতে চাই। যাইহোক না কেন, ২৪ এর অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশ এর অভ্যুদয় হয়েছে। সাধারণ মানুষের মাঝে রাজনৈতিক ও ইতিহাসের সচেতনতা বেড়েছে। তাই আশা করা যায়, দেশের মানুষ রাজনৈতিক ময়দানের প্রতিযোগীতায় শক্তিশালী ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ধরেই আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মান করবে।