২০০৭ সালের এক-এগারোর সময় তিনি ছিলেন ক্ষমতার নেপথ্যের একজন প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা। গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি, শীর্ষ রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার, বিশেষ কারাগার, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাঁর নাম। পরে রাজনৈতিক সরকার এলে তাঁর চাকরির মেয়াদ বাড়ে। তারপর হন সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ী। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ছিলেন আলোচিত, সমালোচিত ও বিতর্কিত। সেই লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গত সোমবার রাতে গ্রেপ্তার করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এক-এগারোর নেপথ্যের সেই প্রভাবশালী কর্মকর্তার এই পরিণতি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে বাংলাদেশের সেই অস্বাভাবিক সময়ের রাজনীতি, সেনাবাহিনী ও ক্ষমতার সম্পর্কের পুরোনো প্রশ্নগুলো। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রমতে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন এক-এগারোর পটপরিবর্তনের প্রধান উদ্যোক্তা বা মূল কুশীলব। তখন তিনি ছিলেন সাভারে অবস্থিত সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি। তিনি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর-ডিজিএফআইকে সঙ্গে মিলে পুরো পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন। তখন এমন আলোচনাও ছিল যে তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ শুরুতে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন; যদিও তিনি পরে ওই পরিকল্পনায় যুক্ত হন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির দিন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের সঙ্গে বঙ্গভবনে যে সেনা কর্মকর্তারা গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে নবম পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীও ছিলেন। তিনি সেদিন বঙ্গভবনে সশস্ত্র অবস্থায় গিয়ে চাপ প্রয়োগ করেন। চাপের মুখে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তখন একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। সেই পদ থেকেও তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। এক-এগারোতে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর এমন ভূমিকার ক্ষেত্রে তাঁর ভায়রা ভাই সাঈদ এস্কান্দারেরও (প্রয়াত) সম্মতি ছিল বলে তখন প্রচার ছিল। সাঈদ এস্কান্দার বেগম খালেদা জিয়ার ভাই। আবার মইন উ আহমেদকে যে কয়েকজন ডিঙিয়ে সেনাপ্রধান করা হয়েছিল, তাতেও সাঈদ এস্কান্দারের প্রভাব ছিল বলে আলোচনা রয়েছে। তাঁরা দুজন সেনাবাহিনীতে ব্যাচমেট ছিলেন। যদিও মইন উ আহমেদ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, দেশের রাজনৈতিক সংকট, নির্বাচন পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক চাপের বিষয় রাষ্ট্রপতিকে বোঝাতে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বঙ্গভবনে যান এবং সেই বৈঠকের পরই জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত হয়। জরুরি অবস্থা জারির পর সেনা-সমর্থিত নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এরপর মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির (টাস্কফোর্স) সমন্বয়ক হন। এই পদ ছিল সে সময়ের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রশাসনিক অভিযান সমন্বয়-কাঠামোর একটি। এই কমিটির অধীন দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, বিশেষ অভিযান ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। মাসুদ উদ্দিন পরে পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন। মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর এক-এগারো: বাংলাদেশ ২০০৭-২০০৮ বইয়ে লিখেছেন, সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সামরিক-বেসামরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি নিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছিল, যেখানে কিছু সামরিক কর্মকর্তা নেপথ্যে থেকে রাজনৈতিক যোগাযোগ, প্রশাসনিক সমন্বয় ও অভিযান বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতেন। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নামও সেই প্রেক্ষাপটে এসেছে। এ ছাড়া তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ছিল—ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দল (প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টি) গঠনের প্রচেষ্টার নেপথ্যেও তখনকার কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা ভূমিকা রেখেছিলেন, যাঁদের মধ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নামও আলোচনায় আসে। তিনি ছিলেন রক্ষীবাহিনীতে। ১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনী অবলুপ্ত করে তাদের সেনাবাহিনীতে আত্তীকরণ করা হয়। সেভাবেই মাসুদ উদ্দিন সেনাবাহিনীতে আসেন। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও বিতর্কের শুরু এক-এগারো সরকারের সবচেয়ে আলোচিত কার্যক্রম ছিল দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। বহু শীর্ষ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিশেষ কারাগার, জিজ্ঞাসাবাদ, রিমান্ড—এসব বিষয় তখন ব্যাপক আলোচনায় আসে। ওই বিশেষ অভিযান নিয়ে বিতর্কও ছিল। অভিযোগ ওঠে, অনেক গ্রেপ্তারে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি, জিজ্ঞাসাবাদের সময় চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে, কিছু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও ছিল। মাসুদ উদ্দিন টাস্কফোর্সের প্রধান ও সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি থাকা অবস্থায়ই তাঁর বিরুদ্ধে কিছু কিছু দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরে জনপরিসরে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বিতর্কিত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের সঙ্গে কিছু কিছু বিষয়ে মাসুদ উদ্দিনের মতভেদ দেখা দেয়। এরপর ২০০৮ সালের ২ জুন তাঁর চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যাস্ত করে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে দেন মইন উ আহমেদ। এরপর ২ সেপ্টেম্বর তাঁকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার নিযুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার তিন দফায় তাঁর চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করে। অবসর গ্রহণের পর তিনি ঢাকায় একাধিক ব্যবসায় যুক্ত হন। এক-এগারোর সময় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা এবং বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানসহ উভয় দলের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক আলোচনায় বিভিন্ন সময়ে এমন অভিযোগ আসছিল যে ওই সময়ের গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়ার নেপথ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী অন্যতম ছিলেন। এমনকি তারেক রহমানকে নির্যাতনের নেপথ্যেও তাঁর নাম বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত বা নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশ্যে নেই। সমঝোতা ও ২০০৮ সালের নির্বাচন এক-এগারোর পর দুই প্রধান নেত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের সংসদ ভবন এলাকায় দুটি বাড়িকে বিশেষ কারাগার ঘোষণা করে সেখানে রাখা হয়। পরে সেই বিশেষ কারাগারে শেখ হাসিনার সঙ্গে তৎকালীন সেনা নেতৃত্বের রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছিল—এমন আলোচনা অনেক দিন ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে তখন জানা গিয়েছিল, সমঝোতার অংশ হিসেবে তখন শেখ হাসিনা জামিনে মুক্তি পেয়ে বিদেশ চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু অনেক চাপ সত্ত্বেও খালেদা জিয়া দেশ ছেড়ে যেতে রাজি হননি। যদিও তাঁর দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে (কোকো) জামিনে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠানো হয়েছিল।