ক্ষমতায় আসার মাত্র সাড়ে চার মাসের মাথায় প্রায় ৯৪ টি বিভিন্ন নেতিবাচক ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে বিএনপির ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। এ তথ্য উঠে এসেছে বিডি পলিটিক্স ওয়াচের এক গবেষণায়। দেশের শীর্ষস্থানীয় ছয়টি জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, সমকাল, যুগান্তর ও আমার দেশ পত্রিকায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সম্পর্কিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত দেশের প্রথম সারির সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত সংবাদ সমূহ বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি। এতে ছাত্রদলের বিভিন্ন অপরাধমূলক ও বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর পরই ক্ষমতা প্রদর্শন ও আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে রাজনৈতিক মাঠ দখলের সুযোগ পায় ছাত্রদল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং নেতাকর্মীদের ওপর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের শিথিলতার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
বিডি পলিটিক্স ওয়াচের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সময় বাড়ার সাথে সাথে ছাত্রদলের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে সংগঠনটির মোট ১৪টি নেতিবাচক ঘটনা রেকর্ড করা হয়। মার্চ মাসে এই সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৮ তে। এপ্রিল মাসে তা আরও বেপরোয়া রূপ নেয় এবং ঘটনার সংখ্যা ২৮-এ পৌঁছায়। মে মাসে সর্বোচ্চ ২৯টি ও জুনের প্রথমার্ধে ৫টি নেতিবাচক ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটিতে জুন মাসের ১৪ তারিখ পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। অর্থাৎ, শুরুর মাসের তুলনায় শেষ দেড় মাসে অপরাধ ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের হার দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা চরম সাংগঠনিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ, ছাত্রদলের বড় একটি অংশ মাঠপর্যায়ে সহিংসতা ও অবৈধ অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের সাথে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। প্রতিপক্ষের ওপর হামলা ও সংঘর্ষ এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও সংঘাত এই দুই ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মোট ৩৩টি ঘটনা ঘটেছে, যা মোট অপরাধের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি। এর থেকে স্পষ্ট হয় যে, ছাত্রদল নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন এবং রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে ক্রমাগত পেশি শক্তির ব্যবহার করেছে। ক্ষমতাসীন দল হওয়ায় বিএনপির রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় এসকল অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে ক্ষমতার পালাপদলের পর সবচেয়ে বেশি ঘটেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা। মোট ২১টি ঘটনার মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথে বড় ধরনের সংঘাতের জড়িয়েছে ছাত্রদল। এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ ৮টি রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে । বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও ঈশ্বরদীতে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে দেয়াল লিখন ও ‘গুপ্ত’ ট্যাগিং ইস্যুকে কেন্দ্র করে রক্তাক্ত সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এদিকে রূপগঞ্জে এনসিপির অনুষ্ঠান শুরুর আগেই মঞ্চ ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা ঘটে, যার প্রেক্ষিতে ছাত্রদল নেতাসহ ১২০ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করা হয়। এছাড়া ঝিনাইদহে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনাটি দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ক্ষমতার পালাবদলে চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন জায়গায় অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিল ছাত্রদল। এই চার মাসে ছাত্রদল সংশ্লিষ্ট ১৮ টি এমন ঘটনা পত্রপত্রিকায় এসেছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, চাঁদাবাজির ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না। বরং এটি ছিল সুসংগঠিত অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। এর মধ্যে পণ্যবাহী ট্রাক আটকে চাঁদা আদায়, বরিশালে সড়ক নির্মাণকাজ বন্ধ করে ঠিকাদারের কাছে চাঁদা দাবি এবং শাহবাগ ও মিরপুর এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন গণমাধ্যমে আসে। এছাড়া মে মাসে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে চিংড়ি রেণুবাহী গাড়ি আটকে চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এদিকে দেশের শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো ছাত্রদলের সহিংস রাজনীতির প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে তার কার্যালয়ে ছাত্রদলের তালা ঝুলিয়ে দেওয়া এবং নোয়াখালী সরকারি কলেজে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে প্রাধ্যক্ষকে উদ্দেশ্যে করে ছাত্রদল নেতার ‘আপনি আর বেশি দিন নাই স্যার’ বলে হুমকি দেওয়া কিংবা ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক মুসাদ্দিককে ‘দাঁত ফালায়ে দেওয়ার’ হুমকির ঘটনা ছাত্ররাজনীতির নেতিবাচক রূপ প্রকাশ করে।
শুধু রাজনৈতিক সংঘাতই নয়, ধর্ষণ, মাদক ও হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের সাথেও ছাত্রদল নেতাদের নাম জড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে দিনাজপুরে কলেজছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার মামলায় ছাত্রদল সংশ্লিষ্ট একজন গ্রেপ্তার হন। মে মাসে যুবদল ও ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা হওয়ার পর ভুক্তভোগী তরুণী এলাকাছাড়া হতে বাধ্য হন। বরগুনায় এক ছাত্রদল নেতার বাসা থেকে ৫০০ পিস ইয়াবাসহ তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অন্যদিকে, খুলনায় যুবদল নেতা হত্যার ঘটনায় সরাসরি ছাত্রদল নেতার সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলায় তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই চার মাসে হত্যা ও সহিংসতার মতো ৯টি চরম অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। যেখানে নিজেদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতাই এর মূল কারণ হিসেবে পত্রপত্রিকায় গুলোতে উঠে এসেছে। এছাড়া, ৫টি ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও নারী নিপীড়নের মতো সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়মূলক ঘটনা এবং ৪টি গণমাধ্যমের ওপর হামলা ও চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।
রাজনৈতিক ও সমাজ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একটি ছাত্র সংগঠনের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের এমন লাগামহীন ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। মাত্র চার মাসে ৯৪টি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের এই সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ছাত্রদলের ভাবমূর্তিকেৎ জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও এক বড় ধরনের নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সংগঠনটির নীতি-নির্ধারকরা যদি অবিলম্বে কঠোর ও শাস্তিমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন, তবে এই বিশৃঙ্খলা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মু’তাসিম বিল্লাহ বলেন, ‘বিডি পলিটিক্স ওয়াচের এই প্রতিবেদনটি দেশের ছাত্র রাজনীতির এক চরম অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরেছে। মাত্র চার মাসে একটি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় শতখানিক নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আসা, সেটিও আবার দেশের প্রথম সারির ছয়টি জাতীয় দৈনিকের তথ্যের ভিত্তিতে। এটাকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, এখানে দুটি বিষয় খুব স্পষ্ট ও আশঙ্কাজনক। প্রথমত, মাসভিত্তিক অপরাধের ঊর্ধ্বমুখী ব্যাপারটা প্রমাণ করে যে, নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের বেপরোয়া ভাব এবং আইনকে তোয়াক্কা না করার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অপরাধের তালিকায় চাঁদাবাজি, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ধর্ষণের মতো সামাজিক অপরাধের যে ভয়াবহ অনুপাত দেখা যাচ্ছে, তা প্রমাণ করে ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের মূল আদর্শিক জায়গা থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের ওপর কেন্দ্রীয় বা মূল দলের নেতৃত্বের কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বা চেইন অব কমান্ড নেই। তাই ছাত্রদলের নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে এই পরিসংখ্যানকে কোনো রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বা ব্লেম-গেম হিসেবে না দেখে, আত্মশুদ্ধির একটি আয়না হিসেবে নেওয়া।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় ইসলামী ছাত্রসংঘের তৎকালীন নেতা আব্দুল মালেকের ছবি যুক্ত হওয়ার পর তাঁকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রথম আলো। প্রতিবেদনে আব্দুল মালেকের পরিচয়, ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষানীতি নিয়ে একটি আলোচনা সভাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ এবং তাঁর মৃত্যুর ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী ছাত্রসংঘের পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ১৯৭১ সালে সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের ভূমিকার বিষয়ও প্রতিবেদনে এসেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতাসীন বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতার পাশাপাশি আগস্ট মাস জুড়ে দলটির নেতাকর্মীদের ঘিরে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনা সামনে এসেছে। চাঁদাবাজি, মাদক, সংঘর্ষ, হামলা, দখল, অস্ত্র প্রদর্শন ও সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণের মতো অভিযোগে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় কোথাও স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও দলীয়ভাবে বহিষ্কার, অব্যাহতি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।