দীর্ঘ সময় পর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে। এই সংসদে বিএনপি ছিল সরকারী দল, অন্যদিকে বিরোধী দলের আসনে ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয়ে জোট। প্রায় সাড়ে পনের বছরের ফ্যাসিবাদী আমল পেরিয়ে নতুন বাংলাদেশে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা গঠিত হয়েছে ১৩ তম জাতীয় সংসদ। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। এই ২০ দিনের সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধিবেশনে বাংলাদেশ দেখেছে এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যেখানে দীর্ঘদিনের সংঘাতের বদলে স্থান পেয়েছে সৌহার্দ্য এবং প্রতিহিংসার বদলে জায়গা করে নিয়েছে জাতীয় স্বার্থ। এই অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে অভাবনীয় সহমর্মিতা প্রকাশ পেয়েছে, তা বাংলাদেশের মানুষকে একটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জোরালো বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সমাপনী বক্তব্যে সেই ঐক্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে যেমন প্রতিহিংসামুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করেছেন, তেমনি বিরোধী দলীয় নেতাও সরকারের প্রতিটি গঠনমূলক কাজে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। জাতীয় নেতৃত্বের এই দূরদর্শী ও উদার মানসিকতা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ একটি পরিপক্ব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের এই নতুন পথচলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তিনি কেবল বিরোধী দলীয় নেতার বাসভবনে যাননি বরং চীফ হুইপসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। দেশ পরিচালনার জন্য সহযোগীতা চেয়েছেন। এই ইতিবাচক উদ্যোগের প্রতিফলন দেখা গেছে সংসদের ভেতরেও। বিএনপির শীর্ষ নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ থেকে শুরু করে স্বয়ং স্পিকার নিজে বিরোধী দলের নেতাদের সম্পর্কে অত্যন্ত সম্মানজনক ও ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। এর বিপরীতে বিরোধী দলের নেতারাও তাদের বক্তব্যে জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন এবং একই সাথে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবদান ও ত্যাগের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছেন। পারস্পরিক এই শ্রদ্ধাবোধ কেবল সংসদীয় পরিবেশকেই শান্ত রাখেনি, বরং গত কয়েক দশকের নোংরা রাজনৈতিক কাঁদা ছোড়াছুড়ির সংস্কৃতিকেও আমূল বদলে দিয়েছে। জাতীয় সংকট মোকাবিলায় এই সংসদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয় ও কার্যকর। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে চলা জ্বালানি সংকট নিরসনে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে স্বাগত জানিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে তিনি উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে এই সংসদ দলমতের ঊর্ধ্বে উঠতে সক্ষম হয়েছে। এদিকে সরকারী দল বিএনপির পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদ ছেড়ে দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। যদিও বিরোধী দল জামায়াত সেটি গ্রহণ করেনি। এছাড়া সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোতে বিরোধী দলের সদস্যদের সক্রিয় উপস্থিতি ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে, যা জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। এই অধিবেশনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিল পাস হওয়া ছিল একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই বিল পাসের মাধ্যমে সংসদীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অবসান ঘটানোর পথ প্রশস্ত হয়েছে, যা দেশবাসীকে নিশ্চিত করেছে যে অগণতান্ত্রিক শক্তির রাজনীতি এ দেশে দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থগিত হতে চলেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই প্রথম অধিবেশনে বিরোধীদলের গঠনমূলক ভূমিকা লক্ষ্য করা গেছে। যেখানে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা প্রতিদিনই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন। যদিও রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে বিতর্কিত আখ্যা দিয়ে বক্তব্য বয়কট করলেও অন্যান্য যে কোন ইস্যুতে তারা বেশ গঠনমূলক ছিলেন। ফলে বিরোধী দল কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে প্রতিটি আলোচনায় গঠনমূলক ভূমিকা রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, উপনেতা এবং হুইপদের বক্তব্যে বারবার এটিই উঠে এসেছে যে, ক্ষমতার চেয়ে দেশ বড়। এই সংসদের প্রতিটি মুহূর্ত প্রমাণ করেছে যে, যখন রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা এবং পারস্পরিক বিশ্বাস থাকে, তখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র। সালাউদ্দিন আহমেদসহ বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ইতিবাচক মনোভাব এবং বিরোধী দলের নেতাদের দায়িত্বশীল আচরণ এটিই ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন বিভাজনের পরিবর্তে সংহতির পথে হাঁটছে। সর্বপরি, ১২ মার্চের সেই শুরু থেকে ১ এপ্রিলের সমাপনী পর্যন্ত ত্রয়োদশ সংসদ এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে, যেখানে স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই হবে সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।