অর্জন নাকি দুর্নীতি আর ঋণের ঘানি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ?

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বর্তমানে বাংলাদেশের ইতিহাসের একক বৃহত্তম এবং জটিলতম অবকাঠামো প্রকল্প। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাবনা জেলার পদ্মা নদীর তীর ঘেষে রূপপুরে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের একেবারে শেষ পর্যায়ে। পতিত আওয়ামী লীগের আমলে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি দেশকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বিশ্বের ৩৩তম দেশের অভিজাত ক্লাবে জায়গা করে দিয়েছে। সেই সাথে এটি ঘিরে উন্মোচিত হয়েছে পতিত সেই সরকারের রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন এবং নজিরবিহীন ঋণের এক দীর্ঘমেয়াদী ফাঁদ।
গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রকল্পের ১ নম্বর ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়া ও রাজনৈতিক মহলে এটি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি বৈশ্বিক মর্যাদাপূর্ণ অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক মনে করা হচ্ছে। কিন্তু এর নেপথ্যে রয়েছে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং এর আর্থিক অস্বচ্ছতা। যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ বোঝা হতে পারে বলে মনে করেছেন অনেকে।
এই প্রকল্পের গোড়াপত্তন এবং বাস্তবায়নের সময়কাল পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, এটি ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এক সুদূরপ্রসারী কৌশল। বিশেষ করে ২০১৪ সালের বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মহলে বৈধতার সংকট কাটাতে প্রভাবশালী দেশগুলোর সমর্থন ছিল অপরিহার্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত যেমন আঞ্চলিক প্রভাবে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে আসছিল, তেমনি রাশিয়ার রাজনৈতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে রূপপুর প্রকল্পকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাশিয়া সফরের সময় তড়িঘড়ি করে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প সহ মোট ৫টি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সেই সাথে নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। যা দেশের বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের চেয়ে ক্ষমতা সুরক্ষা এবং রাশিয়া-ভারত বলয়ের দেশগুলোর আস্থা অর্জনই ছিল তার প্রধান অগ্রাধিকার। মূলত রাশিয়ার সাথে এই ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের বিশাল ব্যয়ের চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকার নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার পথ পরিস্কার করেন। সেই সাথে দেশের ভবিষ্যৎকে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের জালে আটকে দেন।
রূপপুর প্রকল্পের সবচেয়ে অন্ধকার দিক হলো এর নজিরবিহীন দুর্নীতি এবং অস্বাভাবিক প্রকল্প ব্যয়। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ বা ১১.৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন বৈশ্বিক তদন্ত সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে পিলে চমকানো অভিযোগ। দাবি করা হয়েছে, প্রকল্প চূড়ান্ত হওয়ার সময় শেখ হাসিনা, তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এবং ভাগ্নি টিউলিপ সিদ্দিকের যোগসাজশে রাশিয়ার সাথে এই চুক্তির বিনিময়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বা ৫৯ হাজার কোটি টাকা গোপন কমিশনের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ একটি অফশোর অ্যাকাউন্টে সরিয়ে ফেলার অভিযোগটি বর্তমানে গভীর তদন্তের আওতায় রয়েছে। প্রকল্পের কেনাকাটায় দুর্নীতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বালিশ কাণ্ড’, যেখানে একটি বালিশের দাম ৫,৯৫৭ টাকা ধরা এবং তা উপরে তোলার জন্য ৭৬০ টাকা মজুরি দেখানো হয়েছিল। এছাড়া ৪৩ হাজার টাকার বিছানা বা ১৬ হাজার টাকার কমফোর্টার ক্রয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে যে অর্থ লুট হয়েছে, তা উন্নয়নের আড়ালে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির এক নিষ্ঠুর উদাহরণ।
প্রকল্পের আর্থিক কাঠামো বলছে, ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এই ঋণের মূল টাকা পরিশোধ শুরু হবে। ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ আগামী ২৮ বছর ধরে এই বিশাল ঋণের কিস্তি টানতে হবে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণকে। এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার মূল ঋণের সাথে ইতিমধ্যে প্রকল্পের ব্যয় আরও ২৬ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা শুধু সুদ বাবদ রাশিয়াকে পরিশোধ করতে হবে, যা বছরে দাঁড়ায় প্রায় ৩৬৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২৮ বছর শেষে শুধু সুদ বাবদই বাংলাদেশকে গুনতে হবে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কুদানকুলাম পারমাণবিক প্রকল্পের তুলনায় রূপপুরের ব্যয় কয়েক গুণ বেশি হওয়ার মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা কৃত্রিমভাবে ব্যয় বৃদ্ধি বা ‘প্যাডিং’ কে দায়ী করেছেন। এর ফলে প্রকল্প থেকে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম এতটাই বেশি হবে যে, তা সাধারণ গ্রাহক বা শিল্পমালিকদের জন্য সাশ্রয়ী হওয়া অসম্ভব।
সার্বিকভাবে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পকে স্রেফ একটি কারিগরি অর্জন বা বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটানোর পথ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি যেমন উচ্চ-প্রযুক্তির ব্যবহারের মাইলফলক, ঠিক তেমনি এটি অদূরদর্শী রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সীমাহীন দুর্নীতির এক জীবন্ত দলিল। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যখন একটি উন্নত অর্থনীতির স্বপ্ন দেখছে, তখন এই প্রকল্পের নামে নেওয়া বিশাল ঋণের বোঝা এবং লুণ্ঠিত হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে রূপপুর প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য ‘সাদা হাতি’ নাকি আশীর্বাদ হবে, সেই প্রশ্নটি আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।







