নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দুইমাস পার হলেও এখনও আলোচনায় ‘জুলাই সনদ’। নির্বাচনের আগে সকল রাজনৈতিক দল জুলাই সনদের স্বাক্ষরের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকলেও সরকারি দল বিএনপি সাংবিধানিক নানা জটিলতার কথা বলছে। এ নিয়ে টানা বিতর্কের ধারাবাহিকতায় ২৭ এপ্রিলও সংসদে তীব্র বাকযুদ্ধ লক্ষ্য করা গেছে। এদিনে দেশের মূলধারায় গণমাধ্যমের সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, দিনব্যাপী আলোচনায় ছিল ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ ও ‘জুলাই সনদ’। জাতীয় সংসদে এই সনদকে কেন্দ্র করে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সংসদীয় কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা গেছে করা যাচ্ছে। অন্যদিকে সংসদের বাইরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষকে সতর্ক করছেন এবং বিরোধীদলকে আন্দোলন নিয়ে সাবধান করেছে। সংসদে ‘জুলাই সনদ’ বিতর্ক সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল করিম জুলাই সনদকে ‘আননেসেসারি বা অপ্রয়োজনীয়’ বলায় এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াতের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, “এই অভ্যুত্থানের ওপর দাঁড়িয়েই বর্তমান সংসদ ও সরকার।” এ বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের বক্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি মতভিন্নতাকে ‘গণতন্ত্রের সৌন্দর্য’ হিসেবে অভিহিত করে বাকস্বাধীনতার ওপর জোর দিয়েছেন। তবে এই বিতর্ক ইঙ্গিত দেয় যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংজ্ঞাগত বা কৌশলগত পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। চিফ হুইপ পরে বক্তব্যটি ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলেও সামগ্রিক রাজনীতি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উত্তেজনার রেশ রয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর যশোর সফরে ষড়যন্ত্রের সতর্কতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যশোরের উলসী খালে জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেছেন। এখান থেকে তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। বিরোধী দলকে ইঙ্গিত করে তিনি গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে যারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তাদের ‘ভুত’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। জুলাই সনদ প্রসঙ্গে সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও সরব হচ্ছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী ১১ দলীয় জোট। এ বাস্তবতায় ১৯৯৪ সালে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগ ও জামায়াতের যুগপৎ আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে সতর্ক করেছেন। সেই সময়ে ১৭৩ দিন হরতাল ও অর্থনীতি ক্ষতির স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, “কোনো অবস্থাতেই আর বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না।” পাশাপাশি এদিন প্রধানমন্ত্রী নারীদের জন্য ‘এলপিজি কার্ড’ এবং মেয়েদের শিক্ষা ‘ডিগ্রি পর্যন্ত ফ্রি’ করার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সংসদীয় ‘অনীহা’ এদিন জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এক উদ্বেগজনক চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে লুৎফুজ্জামান বাবরসহ একাধিক সংসদ সদস্যের বক্তব্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। এ নিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে অসন্তোষ প্রকাশ করতেও দেখা গেছে। এ পরিস্থিতিতে চিফ হুইপ সংসদকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী সংসদের প্রাণ, তিনি না থাকলে কেউ বক্তব্য দিতে চান না”। এটি প্রমাণ করে যে, বর্তমানে সরকার দলীয় সংসদীয় কাঠামো ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ছে, এখানে নীতি-নির্ধারণী আলোচনার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে শোনানোই অনেকের কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাই মামলার ধীরগতিতে বিচারহীনতার আশঙ্কা দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গত ৯ মাসেরও বেশি সময়ে জুলাই হত্যাকণ্ড সংক্রান্ত ৯০ শতাংশ মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। ১৮৫৫টি মামলার মধ্যে মাত্র ১৭৬টির তদন্ত শেষ হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশাল সংখ্যক ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গণহারে মামলার কারণে তদন্ত প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে একদিকে শহীদ পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে সাংবাদিকসহ ‘নিরপরাধ’ ব্যক্তিরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। একইসঙ্গে সরকারের জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রশাসনে ‘বিএনপি ঘরানার’ বড় রদবদল গণমাধ্যমগুলোর সংবাদ বিশ্লেষনে দেখা গেছে, একদিনেই ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের শীর্ষ পদে পরিবর্তন এনেছে। এনটিআরসিএ, খাদ্য অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোতে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও আলোচিত বিষয় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সৈয়দ আবদাল আহমদকে প্রধান তথ্য কর্মকর্তা (পিআইও) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। প্রশাসনের এই ঢেলে সাজানো প্রক্রিয়াটি মূলত শাসনব্যবস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার একটি চূড়ান্ত প্রয়াস হিসেবেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আজকের সার্বিক চিত্র বলছে, সরকার ‘জুলাই সনদ’-কে তাদের সাধারণ রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রধানমন্ত্রী যখন মাঠ পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মসূচি (খাল খনন, এলপিজি কার্ড) দিয়ে জনসমর্থন পোক্ত করার চেষ্টা করছে, তখন সংসদের ভেতরে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা ও ব্যক্তিনির্ভরতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মামলার তদন্তে ধীরগতি এবং প্রশাসনে গণহারে রদবদল নির্দেশ করে যে, সরকার এখন গণঅভ্যুত্থানে আকাঙ্খার চেয়ে ‘প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ’ নিশ্চিত করতেই বেশি মনোযোগী।