বাংলাদেশে কিছু দিন পর পরই নতুন রাজনৈতিক দল বা প্লাটফর্মের আত্মপ্রকাশ করতে দেখা যায়। অনেকে এটাকে মজা করে ‘রাজনৈতিক দোকান’ বলে অভিহিত করেন। যাই হোক, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়ত সহজ ব্যাপার হতে পারে। কিন্তু এটি গঠন করে সরাসরি ক্ষমতার মসনদে চলে আসা মোটেও কোন সহজ ব্যাপার নয়। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এমন একটি দল যাদের ক্ষেত্রে ঠিক এমন ঘটনাটিই ঘটেছিল। পঁচাত্তর পরবর্তী রাজনৈতিক শুন্যতায় এই দলটির অভূতপূর্ব এক উত্থান দেখেছিল জাতি। কিভাবে বিএনপির উত্থান হয়েছিল, আর কারই বা তাদের জনসমর্থনের ভিত্তি তৈরী করেছিল আজকে আমরা সেটি আলোচনা করব। স্বাধীনতার পর নতুন বাংলাদেশে ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত জটিল এবং বৈচিত্র্যময়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানের মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলে মুসলিম লীগ, জামায়াত সহ ইসলামি দলগুলো আইনত অস্তিত্ব সংকটে পড়ে এবং রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এই শূন্যতায় সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হয়। একই সাথে বিরোধী শিবির হিসেবে জাসদ ও সর্বহারা পার্টির মতো দলগুলোর হাত ধরে উগ্র বামপন্থার ব্যাপক উত্থান ঘটে। তৎকালীন শেখ মুজিব সরকার এই সশস্ত্র বামপন্থী তৎপরতা ও অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দমনে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। যা অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৯৭৫ সালের শুরুতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। এই ব্যবস্থায় সকল রাজনৈতিক দলকে একটি একক প্ল্যাটফর্মে একীভূত করা হয়। চারটি বাদে সকল সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা হয়। এই শাসন ব্যবস্থাকে একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসন হিসেবে অভিহিত করা হয়। মূলত বামপন্থীদের বৈপ্লবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞায় ইসলামপন্থীদের অন্তরালে চলে যাওয়া এবং পরিশেষে রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ একীভূত করার এই প্রচেষ্টাগুলোই ছিল সে সময়ের রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত পটপরিবর্তনের মাধ্যমে এই অধ্যায়ের অবসান ঘটে। ফলে দেশের রাজনীতিতে পুনরায় দক্ষিণপন্থী ও ইসলামি ধারার প্রত্যাবর্তনের পথ প্রশস্ত হয়। এই নতুন রাজনৈতিক ধারার বিস্তার ঘটে তৎকালীন সেনাপ্রধান ও পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। একই সাথে ৭১-৭৫ পর্যন্ত সময়ে যারা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিবেচিত ছিল তাদেরও একপ্রকারের পুনর্বাসন হয় এই সময়ে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব হত্যাকান্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। কিন্তু সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা চলমান ছিল। এর প্রেক্ষাপটে ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। এই অভ্যুত্থানে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয়। সেই সাথে ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এদিকে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানকে সাধারণ সৈনিকরা ‘ভারতপন্থী’ ষড়যন্ত্র হিসেবে সন্দেহ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাসদপন্থী সেনা কর্মকর্তারা সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে লিফলেট বিলি করে এক অভাবনীয় গণজাগরণ তৈরি করে। এর ফলাফল হিসেবে ৭ নভেম্বর ভোরে ঢাকা সেনানিবাস থেকে সিপাহিরা বিদ্রোহ শুরু করে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন। জিয়াউর রহমান মুক্ত হওয়ার পর ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। তৎকালীন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে প্রধান করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়। এই ঘটনার মাধ্যমেই বাংলাদেশে একদলীয় শাসনের অবসান এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত হয়। এই পেক্ষাপটে ক্ষমতা ধরে রাখতে একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এরই ধরাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বে জাগদল আত্মপ্রকাশ করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল জিয়াউর রহমানের জন্য একটি বেসামরিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। সেই সাথে আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁর পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তোলা। জাগদল দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকে থাকার চেয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বেশি কার্যকর ছিল। ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট এর প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন। পরে এই ফ্রন্টে থাকা বিভিন্ন ছোট রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও জাগদলকে একীভূত করে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করা হয়। তিনি যখন বিএনপি গঠন করেন, তখন তার মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের বিপরীতে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। এই প্ল্যাটফর্মটি তৈরিতে তিনি সবচেয়ে বড় সমর্থন পান বর্তমান বিলুপ্তপ্রায় মুসলিম লীগের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে। যার ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিএনপিকে মুসলিম লীগের রাজনীতির উত্তরসূরি হিসেবে চিহ্নিত করেন। বিএনপি তৈরির প্রেক্ষাপটটি ছিল মূলত একটি আদর্শিক শূন্যতা পূরণের চেষ্টা। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ায় মুসলিম লীগসহ পাকিস্তানপন্থী দলগুলো রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের ঘোষণা দিলে এই বিশাল রাজনৈতিক গোষ্ঠীটি একটি নতুন আশ্রয়ের সন্ধান পায়। জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি স্থায়ী ক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী জনবল প্রয়োজন। যা আওয়ামীলীগের বিপরীতে কেবল মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানপন্থী দলগুলোর পুরনো সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। এই তাগিদ থেকেই তিনি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাবেক মুসলিম লীগের নেতাকর্মীদের রাজকীয় সম্মানে বিএনপিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। জিয়াউর রহমান যাদের নিয়ে দল গঠন করেন, তাদের দীর্ঘ তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সেখানে মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের আধিক্য ছিল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম শাহ আজিজুর রহমান। তিনি পাকিস্তান আমলে কট্টর মুসলিম লীগ নেতা ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। তাকে জিয়াউর রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। এ ছাড়াও মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা খান এ সবুর এবং ব্যারিস্টার আবদুস সাত্তারের মতো ব্যক্তিরা বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আসীন হন। মশিউর রহমান যাদু মিয়ার মতো ঝানু রাজনীতিবিদের হাত ধরে তৎকালীন ডানপন্থী ও চীনপন্থী রাজনীতিকদের একটি বিশাল অংশ বিএনপির পতাকাতলে একত্রিত হয়। মূলত মুসলিম লীগের পুরনো ভোট ব্যাংক এবং তাদের অভিজাত নেতৃত্বকে ব্যবহার করেই বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড়িয়ে যায়। এদিকে ইসলামপন্থীদের সমর্থন আদায়ের কৌশল হিসেবে জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ এর প্রবর্তন করেন। এটি ছিল মূলত মুসলিম লীগের সেই পুরনো দ্বিজাতি তত্ত্বের একটি আধুনিক সংস্করণ। তিনি সংবিধানের শুরু থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ সরিয়ে ‘বিসমিল্লাহ’ এবং ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা’র বাণী সংযোজন করেন। এই পদক্ষেপগুলো কেবল মুসলিম লীগ নয়, বরং জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রক্ষণশীল গোষ্ঠীর অকুণ্ঠ সমর্থন নিশ্চিত করে। এভাবে ভারত-বিরোধিতা এবং ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে জিয়াউর রহমান যে রাজনৈতিক ধারা প্রবর্তন করেন, তা মূলত মুসলিম লীগের রাজনীতিরই নতুন মোড়ক। তাই ঐতিহাসিকভাবে বিএনপিকে মুসলিম লীগের রাজনীতির ধারক ও বাহক হিসেবে অভিহিত করা মোটেও অমূলক নয়। বিএনপির রাজনৈতিক বিবর্তন এবং জোট গঠনের কৌশল বাংলাদেশের রাজনীতির এক অনন্য ও জটিল বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি শুরুর দিকে যে সর্বজনীন প্ল্যাটফর্ম তৈরির চেষ্টা করেছিল, সেখানে অনেক ভিন্নমতের রাজনৈতিক ধারা একত্রিত হয়েছিল। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল তৎকালীন প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করা এবং একটি শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী ভিত্তি তৈরি করা। মুসলিম লীগের মতো দলগুলোর মূল স্রোতে বিলীন হওয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো দলের সাথে কৌশলগত জোট—এই দুটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জামায়াত তাদের স্বতন্ত্র আদর্শিক পরিচয় ও সাংগঠনিক কাঠামো বজায় রেখেও বিএনপির সাথে রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে। তা বিএনপির জন্য যেমন এক ধরণের জনসমর্থন বা শক্তির উৎস, তেমনি বিভিন্ন সময় এটি বড় ধরণের আদর্শিক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। সুতরাং, এই রাজনৈতিক সমীকরণ প্রমাণ করে যে, ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে বিএনপি আদর্শিক শুদ্ধতার চেয়ে কৌশলগত প্রয়োজনীয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এই সম্পর্ক কোনো স্থায়ী বা অবিচ্ছেদ্য আদর্শিক মেলবন্ধন নয়, বরং সময়ের প্রয়োজনে এবং অভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে গড়ে ওঠা এক বাস্তববাদী অংশীদারিত্ব, যা বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান মেরুকরণকে সংজ্ঞায়িত করছে।