#বাম দুর্গ থেকে তৃণমূলের উত্থান #গেরুয়া শক্তির উত্থানে ডান বলয়ে দুঃশ্চিন্তা #বদলে যাচ্ছে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বরাবরই দেশটির জাতীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একসময় টানা তিন দশকের বেশি সময় বামফ্রন্টের অপ্রতিদ্বন্দ্বী আধিপত্য ছিল রাজ্যটিতে। পরে ‘পরিবর্তন’-এর ডাক দিয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। আর এখন সেই পশ্চিমবঙ্গেই দেখা যাচ্ছে নতুন এক বাস্তবতা, গেরুয়া শক্তির উত্থান। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফল এবং গত চার দশকের নির্বাচনী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ধাপে ধাপে এক নাটকীয় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। বামপন্থার দুর্গ থেকে তৃণমূলের উত্থান এবং সর্বশেষ বিজেপির বিস্তার—এই পুরো যাত্রা এখন নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বামফ্রন্টের দীর্ঘ স্বর্ণযুগ ১৯৭৭ সালের পর পশ্চিমবঙ্গ কার্যত বামফ্রন্টের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ১৯৮২ সালের নির্বাচনে বামফ্রন্ট ২৩৮টি আসন পায়। একই নির্বাচনে কংগ্রেস পায় ৪৯টি আসন। বিজেপি ও তৃণমূলের অস্তিত্ব তখন কার্যত ছিল না। ১৯৮৭ সালে বামফ্রন্ট আরও শক্তিশালী অবস্থানে যায়। তারা ২৫১টি আসনে জয় পায়। কংগ্রেস পায় ৪০টি আসন। ১৯৯১ সালেও বামফ্রন্টের আধিপত্য অব্যাহত থাকে। ওই নির্বাচনে তারা ২৪৫টি আসন পায়, আর কংগ্রেস পায় ৪৩টি। ১৯৯৬ সালে কিছুটা আসন কমলেও বামফ্রন্ট তখনও শক্তিশালী ছিল। তারা পায় ২০৩টি আসন। কংগ্রেস পায় ৮২টি আসন। এই দীর্ঘ সময়ে শিল্পনীতি, কৃষি সংস্কার এবং সংগঠিত ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে বামফ্রন্ট রাজ্যের রাজনীতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করেছে। তৃণমূলের জন্ম এবং কংগ্রেসের পতন ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন। এর প্রভাব প্রথম বড়ভাবে দেখা যায় ২০০১ সালের নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে তৃণমূল ৬০টি আসন পায়। বামফ্রন্ট পায় ১৯৯টি আসন। কংগ্রেস নেমে আসে ২৬ আসনে। ২০০৬ সালে বামফ্রন্ট আবার শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন করে। তারা পায় ২৩৫টি আসন। অন্যদিকে তৃণমূল মাত্র ৩০টি আসনে সীমাবদ্ধ থাকে। তবে এই সময়েই সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শিল্পায়নের নামে ভূমি অধিগ্রহণের বিরোধিতা করে মমতা ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করেন। ২০১১: ‘পরিবর্তন’-এর বছর ২০১১ সাল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় মোড় পরিবর্তনের বছর। ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ১৮৪টি আসনে জয় পায়। কংগ্রেস পায় ৪২টি আসন। অন্যদিকে বামফ্রন্ট নেমে আসে মাত্র ৬২ আসনে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হন এবং ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর রাজনীতি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ২০১৬: তৃণমূলের আধিপত্য ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পর আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে তৃণমূল। ২০১৬ সালের নির্বাচনে দলটি ২১১টি আসনে জয় পায়। বামফ্রন্ট নেমে যায় ৩২ আসনে। কংগ্রেস পায় ৪৪টি আসন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বিজেপির উত্থানের সূচনা। দলটি প্রথমবারের মতো ৩টি আসনে জয় পায়। যদিও সংখ্যাটি ছোট ছিল, তবে এটি ভবিষ্যতের বড় পরিবর্তনের পূর্বাভাস ছিল। ২০২১: বিজেপির বড় উত্থান ২০২১ সালের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবারও বড় পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। তৃণমূল কংগ্রেস ২১৩টি আসনে জয় পেলেও বিজেপি নাটকীয়ভাবে ৭৭টি আসনে উঠে আসে। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে বিজেপির আসন সংখ্যা ৩ থেকে ৭৭-এ পৌঁছানো রাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস জোট করেও কোনো আসনে জয় পায়নি। এটি ছিল পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহ্যবাহী রাজনীতির বড় ধস। এবার কি নতুন অধ্যায়? সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফলে আবারও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় ধরনের পালাবদলের আভাস মিলছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজ আসনে পরাজিত হয়েছেন। বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগোচ্ছে। এটি শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও বড় পরিবর্তন। যে রাজ্য একসময় বামপন্থার পরীক্ষাগার ছিল, পরে আঞ্চলিক শক্তির দুর্গে পরিণত হয়েছিল, সেই রাজ্য এখন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ পছন্দ করেন না। বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের পর মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল। তৃণমূলের দীর্ঘ শাসনের পরও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি দুর্নীতির অভিযোগ, কর্মসংস্থান সংকট, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং কেন্দ্র-রাজ্য রাজনীতির সংঘাতও নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ও নতুন আতঙ্ক পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।বামপন্থার পতন, কংগ্রেসের সংকুচিত অবস্থান, তৃণমূলের অনিশ্চয়তা এবং বিজেপির উত্থান—সব মিলিয়ে রাজ্যের রাজনীতি নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। চার দশকের পরিসংখ্যান বলছে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি কখনো স্থির থাকে না। বিজেপির উত্থান এবং ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাবনার মধ্যে বিভিন্ন জেলায় বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং প্রতিপক্ষের কর্মীদের ওপর আক্রমণের অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিভিন্ন সহিংস ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে, যদিও এসব ঘটনার অনেকগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তৃণমূল অভিযোগ করছে, ফলাফলকে কেন্দ্র করে তাদের নেতাকর্মীদের টার্গেট করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপির দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল যেভাবে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন চালিয়েছে, এখন তার প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতিও নতুন করে মাথাচাড়া দেয়। বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা, সীমান্তবর্তী জেলা এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর অঞ্চলগুলোতে নতুন প্রশাসনিক অবস্থান কী হবে, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্যও এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়লে তার প্রভাব দুই দেশের বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর পড়তে পারে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়—এর সামাজিক, নিরাপত্তাগত এবং আঞ্চলিক প্রভাবও আগামী দিনগুলোতে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। টিআই/