সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে গাজীপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব চৌধুরী ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে। দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের জন্য কাজ করায় তাকে দল থেকে স্থায়ী বহিষ্কারের দাবি জানিয়ে দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি আবেদন করেন গাজীপুর-১ আসনের বিএনপি প্রার্থীর প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী ও দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির শ্রমবিষয়ক সহসম্পাদক হুমায়ূন কবীর খান। আবেদনটি বিএনপি মহাসচিবের মাধ্যমে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বরাবর দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ‘নির্বাচনে গাজীপুর-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মজিবুর রহমানের ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে প্রচার-প্রচারণায় অংশগ্রহণ না করে বিরুদ্ধে অবস্থান নেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি প্রকাশ্যে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী শাহ আলম বকশীর পক্ষে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের জন্য কাজ করেছেন। এমনকি তার সমর্থিত নেতাকর্মীদেরও একই নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি (ইশরাক) জামায়াতের প্রার্থীর সঙ্গে যোগসাজশ করে তার কাছ থেকে পাঁচ কোটি টাকা গ্রহণ করেন। ওই টাকা তার অনুসারীদের দিয়ে ভোটারদের মাঝে বিতরণ করেছেন। এছাড়াও নির্বাচনের দিন নিজ ভোটকেন্দ্রে জামায়াতের প্রার্থীর সঙ্গে ভোট দিয়ে এসে হাস্যোজ্জ্বল ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন, যা ভোটারদের জামায়াতের প্রার্থীকে ভোট দিতে উৎসাহিত করে।’ লিখিত আবেদনে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচন শুরুর পর থেকেই তিনি দলীয় প্রতীক ধানের শীষের বিপক্ষে অবস্থান নেন এবং তার নিজস্ব অনুসারীদের নিয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এমনকি ভোটের দিন জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে আলিঙ্গনের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং ভোটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। এছাড়া আবেদনে দাবি করা হয়, আগে জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব থাকাকালে কালিয়াকৈর উপজেলা ও পৌর বিএনপির কমিটি গঠনে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩৬ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেই কমিটির উপজেলা ও পৌর কমিটির আহ্বায়কসহ নেতাদের নির্বাচনি মাঠে দেখা যায়নি এবং তারা বিরোধিতা করেছেন। এ বিষয়ে এর আগেও দলীয় চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, কালিয়াকৈর উপজেলার বলিয়াদি এলাকায় গাজীপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকীর বাড়ি। স্বাধীনতার পর থেকে বিএনপি কখনো এই আসন থেকে জয়লাভ না করলেও বলিয়াদি কেন্দ্রে সব সময় বিএনপির প্রার্থী বিপুল ভোটে জয় পেয়েছেন। তবে এবারের নির্বাচনে সেখানে ধানের শীষ পরাজিত হয়। এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে, ইশরাক সিদ্দিকী জামায়াত প্রার্থীর কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে তা অনুসারী ও ভোটারদের মাঝে বিতরণ করেছেন। গাজীপুর-১ আসনের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী হুমায়ূন কবীর খান স্বাক্ষরিত আবেদনে আরও বলা হয়, দায়িত্বশীল পদে থেকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করায় চৌধুরী ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকীকে অবিলম্বে সব দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে স্থায়ী বা আজীবন বহিষ্কার করা হোক-এটাই স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি। জাতীয় নির্বাচনে ইশরাক সিদ্দিকী দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, যা ওই সংসদীয় আসনের মানুষের মুখে মুখে। স্থানীয় বিএনপি নেতারা জানান, ইশরাক তার অনুসারীদেরও ধানের শীষের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য বলেছেন এবং তারা প্রকাশ্যেই কাজ করেছেন। কালিয়াকৈর শ্রমিক দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-১ আসনে চৌধুরী ইশরাক ধানের শীষের বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে নির্বাচন করেছেন। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ও বহিষ্কার দাবি করছি। গাজীপুর জেলা জাসাসের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক শাহ এরশাদ ফকির বলেন, ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকী দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন। ধানের শীষের বিরুদ্ধে গিয়ে তারেক রহমানের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ও বহিষ্কার দাবি করছি। উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকী ধানের শীষের বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে নির্বাচন করেছেন। তিনি দলের জন্য ক্ষতিকারক। উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক পারভেজ আহম্মেদ বলেন, নির্বাচনের দিন ১২৮টি কেন্দ্র ঘুরেছি। কেন্দ্রে ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকীর অনুসারীরা দাঁড়িপাল্লার নির্বাচন করেছেন। এটা প্রমাণিত, তারা তারেক রহমানের ধানের শীষের বিরোধিতা করেছেন। তিনি প্রথম থেকেই অপরাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আমরা তাকে আগেই বয়কট করেছি। এবার তার বহিষ্কার দাবি করছি। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির শ্রমবিষয়ক সহসম্পাদক হুমায়ূন কবীর খান জানান, নেতাকর্মী ও সমর্থক হিসাবে বিএনপি মনোনীত সংসদ-সদস্য প্রার্থী মজিবুর রহমানের পক্ষে নির্বাচন পরিচালনা করেছি। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমাদের প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয় অর্জন করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় গাজীপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকী নির্বাচন শুরু হওয়ার প্রথম থেকেই দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ধানের শীষকে পরাজিত করার জন্য জামায়াতের প্রার্থীর প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন বিদ্যমান রাখেন। পাশাপাশি দাঁড়িপাল্লা প্রতীককে বিজয়ী করার জন্য তার অনুসারীদের নিয়ে তৎপরতা চালান। অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও পাওয়া যায়নি।