হাসপাতালে হাম রোগীর সংস্পর্শে আক্রান্ত হচ্ছে অন্য শিশুরা। চিকিৎসকরা বলছেন, মিজেলস ভাইরাসবাহী হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। হামে আক্রান্ত একজন শিশু তার সংস্পর্শে আসা ১২ থেকে ১৮ জন শিশুকে সংক্রমিত করতে পারে। এমন বাস্তবতায় দেশব্যাপী চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে হাসপাতালগুলোয় আইসোলেশন করে রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত জরুরি হয়ে পড়ছে। এদিকে সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে একজনের ও হাম সন্দেহে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগী পাওয়া গেছে ১ হাজার ১৫৯ জন এবং ১৫ মার্চ থেকে ২১ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ২৫ হাজার ৯৩৫জন। ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম রোগী ১৮৮ জন, এ পর্যন্ত নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৮০৫ জন। এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৭ হাজার ৯৫ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৪ হাজার ১০৬ জন। প্রাদুর্ভাব শুরুর পর নিশ্চিত হামে ৩৮ এবং সন্দেহজনক হামে ১৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে শয্যা সংকট থাকায় হাম ও চিকেন-পক্সের মতো অত্যন্ত ছোঁয়াচে ব্যাধিতে আক্রান্ত অনেক রোগী একসঙ্গে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এতে অন্য শিশু রোগীরা হাম সংক্রমিত হচ্ছে। গুরুতর অসুস্থ হয়ে অনেক শিশুকে আইসিইউ বা এইচডিইউতে নিতে হচ্ছে। সোমবার দুপুর ২টা। মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পঞ্চমতলার নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে চিন্তিত মুখে বসে আছেন রিজু আহমেদ ও শাফিয়া খানম শাম্মা দম্পতি। কাছে গিয়ে জানতে চাইলে শাফিয়া খানম যুগান্তরকে বলেন, তাদের ৩ মাসের শিশু শাহজাইন ইসলাম রুজাইন হাম আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের ৬ নম্বর আইসিইউতে ভর্তি। শাফিয়া খানম আরও জানান, ১৭ মার্চ বিকালে আমাদের সন্তান রুজাইনের প্রথমে ১০৩ ডিগ্রি জ্বর ওঠে। পরে কাশি শুরু হয়। পরদিন ১৮ মার্চ কুষ্টিয়া সদরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করি। চিকিৎসকরা জানান, বাচ্চার ব্রঙ্কিউলাইটিস ও নিউমোনিয়া হয়েছে। নিউমোনিয়ার কারণে ফুসফুসে পুঁজ জমছে। সেখানে ১২ দিন চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের রোগীর চাপ থাকায় একই শয্যায় হাম আক্রান্ত আরেক শিশুকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখান থেকে রুজাইন হাম সংক্রমিত হয়। শরীরে র্যাশ, মুখে ঘা হয়ে পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে। এরপর চিকিৎসকরা দ্রুত ঢাকায় নিতে বলেন। এখানে আনার পর আইসিইউতে ভর্তি করেছে। এখন পর্যন্ত তেমন উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। পাশেই ৫ নম্বর আইসিইউ শয্যায় ভর্তি মেহেরপুরের গাংনী থানার বামুন্দি থেকে আসা ১০ মাসের শিশু আয়াত। শিশুটির মা আয়েশা খাতুন যুগান্তরকে বলেন, ঈদের পর দিন বাচ্চার হঠাৎ জ্বর, বমি ও ডায়রিয়া দেখা দেয়। প্রথমে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি করতে পারিনি। পরে কুষ্টিয়ার সনো-টাওয়ারে একটি বেসকারি হাসপাতালে ৬ দিন ভর্তি করি। সনো-টাওয়ার হাসপাতালের জেনারেল ওয়ার্ডে হামের রোগী ভর্তি ছিল। সেখান থেকে হাম সংক্রমিত হয়। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় ১৪ এপ্রিল হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে বা?ড়ি চলে যাই। পরদিন হঠাৎ ডায়রিয়া শুরু হয়। তারপর রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে গেলে বাচ্চার আইসিইউ সাপোর্ট দরকার বলে জানতে পারি। কিন্তু কোনো শয্যা ফাঁকা নেই। তখন সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আসার পর চতুর্থ তলার একটি ওয়ার্ডে ভর্তি নেয়। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় প্রথমে দুদিন এইচডিইউতে রাখে। সেখান থেকে স্থানান্তর করে গত দুইদিন আইসিইউতে নিয়েছে। হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডা. শ্রীবাস পাল যুগান্তরকে বলেন, হাম, চিকেন পক্স ও মামস অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। এক রোগী অন্য রোগীর কাছাকাছি থাকলেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক হাসপাতালে রোগীর চাপ থাকায় আইসোলেশন বা দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করলেও সব সময় সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, হামের মতো রুবেলা, চিকেন পক্স, টাইফয়েড, ডেঙ্গুতেও গায়ে র্যাশ হয়। এক্ষেত্রে প্রথমে রোগ শনাক্ত জরুরি। হামের চিকিৎসা হয় উপসর্গভিত্তিক। বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে রেফার্ড হয়ে আসা রোগীদের প্রায় ১০ শতাংশই অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে গিয়ে হাম সংক্রমিত হয়েছে। সময়মতো হামের চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেকের পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। মহাখালী ডিএনসিসি হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, এক রোগ নিরাময়ের জন্য হাসপাতালে এসে উলটো নতুন রোগে (হাম) সংক্রমিত হওয়ার এমন পরিস্থিতিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ক্রস-ইনফেকশন’ বলা হয়। হাসপাতালের ভেতরের ক্রস-ইনফেকশনের পাশাপাশি পরিবারের ভেতরেও দ্রুত ছড়াচ্ছে শৃঙ্খল সংক্রমণ বা চেইন ইনফেকশন। ক্রস বা চেইন ইনফেকশন থেকে শিশুদের রক্ষায় হাম উপসর্গযুক্ত সব রোগীকে আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। চট্টগ্রামে আরও ভর্তি ৩৭ শিশু : চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে একদিনে আরও ৩৭ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১ জন ছাড়া সবাই নগরীর বাসিন্দা। মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। এদিন সুস্থ হওয়ায় নগরীর ১৮ শিশুকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ছিল ১৪৯ জন। তবে ঢাকা থেকে রিপোর্ট না আসায় এদিন নতুন করে হাম আক্রান্তের কোনো তথ্য জানাতে পারেনি সিভিল সার্জন কার্যালয়। সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম নগরী ও উপজেলায় এ পর্যন্ত ৪১ শিশুর দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে নগরীর ২৬ এবং উপজেলার বাসিন্দা রয়েছে ১৫ জন। সর্বশেষ মঙ্গলবার নতুন করে ৩৯ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজেলস ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ৫০৬ জনের নমুনা পাঠানো হলো। এর মধ্যে নগরীর ৩৮৩ এবং উপজেলার ১২৩ জন রয়েছে। এর আগে শনিবার উপজেলার দুই শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়। চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩৭ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বরিশালে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুর মৃত্যু : বরিশালে ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চার মাস বয়সি আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার বিকালে বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই শিশুর মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়া চার মাস বয়সি শিশু ইয়ামিন পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ভর্তি ২০ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। বাকি তিন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এদিকে ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গের ১০০ রোগী পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৯০ জন বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এছাড়াও ১ জানুয়ারি থেকে বরিশাল বিভাগে হামের সন্দেহজনক রোগী পাওয়া গেছে ২ হাজার ১১৭ জন। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৩৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ৮৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে ১ হাজার ৪৬৮ শিশু।