নতুন করে সংলাপের প্রস্তুতির মধ্যে উন্মুক্ত হলো হরমুজ প্রণালী

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই দ্বিতীয় দফা সংলাপের প্রস্তুতি জোরদার হয়েছে, এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে এই ঘোষণা দেন। দুই শীর্ষ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি ও আলজাজিরা এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আব্বাস আরাগচি জানান, লেবাননে যুদ্ধবিরতি চলাকালীন হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে জাহাজগুলোকে ইরানের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সমন্বিত রুট বা পথ অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছে দেশটি।
ইরানের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দেশটিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরান এইমাত্র ঘোষণা করেছে যে তাদের প্রণালী (হরমুজ) পুরোপুরি উন্মুক্ত এবং যাতায়াতের জন্য প্রস্তুত। ধন্যবাদ!’
তবে হরানের সঙ্গে স্থায়ী কোনো চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকবে বলেও হুশিয়ার করেছেন তিনি। এমনকি হরমুজ প্রণালী খুললেও দেশটির ওপর নৌ-অবরোধ বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এ সংক্রান্ত এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প লেখেন, “হরমুজ প্রণালি এখন ব্যবসা এবং জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তবে ইরানের সাথে আমাদের যাবতীয় লেনদেন বা চুক্তি শতভাগ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দেশটির ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে বহাল থাকবে।’
তবে এই সমঝোতা প্রক্রিয়াটি খুব দ্রুত শেষ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুকে কেন্দ্র করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া টানা ৪০ দিনের সংঘাতের পর ৮ এপ্রিল ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। শুরু থেকেই এ সংঘাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান।
যুদ্ধবিরতির তৃতীয় দিনে ইসলামাবাদে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠিত হলেও টানা ২১ ঘণ্টার আলোচনার পরও কোনো সমঝোতা হয়নি এবং ১১ এপ্রিল তা ব্যর্থতায় শেষ হয়।
সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পরদিন ১২ এপ্রিল হরমুজ প্রণালি ও ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ জারি করে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকোম)। এতে বলা হয়, কোনো বিদেশি জাহাজ ইরানের বন্দরে প্রবেশ করতে পারবে না এবং ইরানের কোনো জাহাজও বন্দর ত্যাগ করতে পারবে না।
তবে অবরোধের মধ্যেই ১৬ এপ্রিল ‘ডিপ সি’, ‘সোনিয়া আই’ ও ‘দিওনা’ নামে তিনটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে।
সমুদ্রে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, খার্গ দ্বীপ থেকে যথাক্রমে ২, ৮ ও ৯ এপ্রিল এসব জাহাজে অপরিশোধিত তেল লোড করা হয়। ফলে ১০ এপ্রিলের পর এই প্রথম কোনো ইরানি ট্যাংকার প্রণালি পাড়ি দেয়। জাহাজগুলোর গন্তব্য জানা না গেলেও এটি মার্কিন অবরোধের কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন তুলেছে।
এদিকে সংলাপ ব্যর্থ হলেও কূটনৈতিক তৎপরতা থেমে নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই দ্বিতীয় দফা সংলাপে বসতে আগ্রহী এবং ভেন্যু হিসেবে ইসলামাবাদে যেতে তাদের আপত্তি নেই বলে জানিয়েছে।
এর পর থেকেই দ্বিতীয় দফা সংলাপ আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে পাকিস্তান। দেশটির উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার থেকেই নিরাপত্তা জোরদারসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের তেহরান সফরও এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আনাদোলু এজেন্সিকে পাকিস্তানের একটি সূত্র জানায়, “আমরা মঙ্গলবার থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছি। মূলত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্ছিদ্র করার দিকেই মনযোগ দেওয়া হচ্ছে।”
এরই মধ্যে লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর প্রতি সংহতি জানিয়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান।
এদিকে ইরানের এই ঘোষণার পরপরই তেলার বাজারে এর প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। এই সিদ্ধান্তের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১১ শতাংশেরও বেশি কমে যায়।







