গণভোট, গুম প্রতিরোধসহ গুরুত্বপূর্ণ ২০ অধ্যাদেশ বাতিলের পথে

গণভোট, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা গুরুত্বপূর্ণ ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে। সংসদের চলতি অধিবেশনে এগুলো বিল আকারে উত্থাপন না করার সুপারিশ করেছে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় বিশেষ কমিটি। ফলে সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমা শেষে এসব অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও নীতিনির্ধারণী মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের ওপর পর্যালোচনা শেষে সংসদীয় বিশেষ কমিটি এ সুপারিশ দিয়েছে। গত ১২ মার্চ নতুন সংসদের প্রথম বৈঠকে এসব অধ্যাদেশ উপস্থাপনের পর সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে ১৪ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বৃহস্পতিবার সংসদে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিনের সভাপতিত্বে বিকেল সাড়ে ৩টায় অধিবেশন শুরু হয়।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অপরিবর্তিত অবস্থায় এবং ১৫টি সংশোধিত আকারে সংসদে বিল হিসেবে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে বাকি ২০টির মধ্যে ১৬টি এখনই উত্থাপন না করে পরবর্তী সময়ে আরও যাচাই-বাছাই করে শক্তিশালী করে নতুনভাবে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চলতি অধিবেশনে এসব অধ্যাদেশ উত্থাপন না হওয়ায় সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্ধারিত সময় শেষে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতা হারাবে। সেই হিসাবে আগামী ১২ এপ্রিলের পর এই ১৬টি অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যাবে।
অন্যদিকে চারটি অধ্যাদেশ সরাসরি রহিতের সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এসব অধ্যাদেশের আওতায় ইতোমধ্যে যেসব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে, তা বৈধতা দিয়ে আইন আকারে পাসের মাধ্যমে এগুলো বাতিল করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (২০২৫ ও ২০২৬ সংশোধন) এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশ।
বিশেষভাবে আলোচিত ১৬টি অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে গণভোট অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত একাধিক অধ্যাদেশ, রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ।
গণভোট অধ্যাদেশটি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জারি করা হয়েছিল। অন্যদিকে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশে গুমকে চলমান অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়। এছাড়া অভিযোগকারীর নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ এবং মানবাধিকার কমিশনের সুপারিশে ট্রাইব্যুনালে পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগের ব্যবস্থাও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
দুদক সংশোধন অধ্যাদেশের মাধ্যমে তদন্ত ক্ষমতা বাড়ানো, সরাসরি এজাহার দায়েরের সুযোগ এবং বিদেশে সংঘটিত আর্থিক অপরাধকে আইনের আওতায় আনার বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে কমিশনের সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাবও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে এসব অধ্যাদেশ এখনই উত্থাপন না করার পক্ষে সরকারের যুক্তি হলো—কিছু ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে, যা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন। বিশেষ করে গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতির বিষয়টি নিয়ে আপত্তি রয়েছে।
এদিকে বিরোধী দল, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা একাধিক সুপারিশে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। ১৪ সদস্যের কমিটিতে দলটির তিন সদস্য মোট ১৯টি সুপারিশে আপত্তি জানান। তাদের মতে, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার এবং গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো দেশের শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।
বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশের বিরোধিতা করে তারা বলেন, এসব উদ্যোগ বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। এগুলো কার্যকর হলে বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হতো এবং জনআস্থা বৃদ্ধি পেত।
এ বিষয়ে আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক বলেন, অধ্যাদেশগুলো কিছুদিন বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা পাওয়া গেছে। এখন এগুলো যাচাই-বাছাই করে নতুন করে আইন প্রণয়ন করা উচিত। তবে এ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তার মতে, বিচার বিভাগ স্বাধীন না হলে গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও আইনের শাসন কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
অন্যদিকে ৯৮টি অধ্যাদেশ অপরিবর্তিত অবস্থায় পাসের সুপারিশ করা হয়েছে, যার মধ্যে স্থানীয় সরকার, ব্যাংকিং, জ্বালানি, সাইবার নিরাপত্তা, সরকারি চাকরি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত বিভিন্ন অধ্যাদেশ রয়েছে। এছাড়া ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে পুনরায় উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, শ্রম আইন, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং ভূমি ব্যবহার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান।
সব মিলিয়ে, বিশেষ কমিটির এই সুপারিশ দেশের আইন ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। বিশেষ করে গণভোট, গুম প্রতিরোধ ও দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো বাতিলের পথে যাওয়ায় রাজনৈতিক ও নীতিগত বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।







