জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষের মেয়াদ চার বছর এবং উচ্চকক্ষের মেয়াদ ছয় বছর করার প্রস্তাব দিয়েছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা। একই সঙ্গে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টা উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগ, সংসদের দুই কক্ষের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এসব প্রস্তাবের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

শনিবার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠকে এসব প্রস্তাব ও মতামত উঠে আসে। বৈঠকে বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে সংসদের দুই কক্ষের মেয়াদ ও গঠন, সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা হয়। রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়াকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে আনার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।

উচ্চকক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা

নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় সংসদের উচ্চকক্ষকে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ। এ ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও উচ্চকক্ষ বহাল রাখার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। এতে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের সময় উচ্চকক্ষকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মত দেন তাঁরা।

উচ্চকক্ষে উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করে তাঁকে স্পিকারের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় আসে। বিকল্প হিসেবে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচিত হলে তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

একইভাবে, সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতির ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বৈঠক শেষে বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া, কাঠামো ও কর্মপরিধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে আলোচনায় উঠে আসা প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের লিখিত মতামত দিতে বলা হয়েছে।

উচ্চকক্ষ গঠনে ১০০ আসন বণ্টনের প্রস্তাব

সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি নিয়েও বৈঠকে বিভিন্ন প্রস্তাব উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে ৫০টি আসন বণ্টন করা। বাকি ৫০টি আসন নিম্নকক্ষে দলগুলোর পাওয়া আসনের অনুপাতে বণ্টনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

এই প্রস্তাব কার্যকর হলে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টনে ভোটের হার এবং নিম্নকক্ষে পাওয়া আসনসংখ্যা—দুটি বিষয়ই বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এদিকে, দেশের বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কয়েকজন অংশগ্রহণকারী। উচ্চকক্ষ গঠনের পরিবর্তে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। ফলে উচ্চকক্ষের কাঠামো ও কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনায় ভিন্নমত রয়েছে।

সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকার বাড়ানোর প্রস্তাব

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাবও বৈঠকে আলোচিত হয়। এ ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও মতামত দেওয়া হয়।

দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় আসে। এসব প্রস্তাবের লক্ষ্য হিসেবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা

বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সংসদের দুই কক্ষের মেয়াদ, গঠন ও ক্ষমতা নির্ধারণের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে মতামত দেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা।

তবে সংসদের মেয়াদ নির্ধারণ থেকে শুরু করে উচ্চকক্ষ গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়োগ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো পরিবর্তন—কোনো বিষয়েই এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লিখিত মতামত পর্যালোচনার পর এসব বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।