রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মাছের আড়ত থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নয়ন হোসেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে শুধু মাছের আড়তে চাঁদাবাজির অভিযোগই নয়, নিজ এলাকায় বাড়ি দখলের চেষ্টা, নির্মাণাধীন ভবন, ফুটপাতের দোকান ও এমব্রয়ডারি কারখানা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। এমনকি সড়ক সংস্কারের সময় বাড়ির পানির ও পয়োনিষ্কাশন লাইনের কাজ নিজেদের লোক দিয়ে করিয়ে বাড়িপ্রতি ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ উঠেছে তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নয়ন হোসেন ও তাঁর অনুসারীদের কর্মকাণ্ডে আদাবর এলাকায় স্বাভাবিকভাবে বাড়ি নির্মাণ, সংস্কার ও ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠেছিল। পরিচিত মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করাতে চাইলেও বাধা দেওয়া হতো। নিজেদের লোক দিয়ে কাজ করানোর পর অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হতো। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হুমকি দেওয়া হতো। এ ছাড়া স্থানীয় বিএনপি নেতা মাসুম বাবুলের বাড়ি দখলের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে নয়ন ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে।

নয়নকে গ্রেপ্তারের কথা গত বৃহস্পতিবার জানায় ডিবি পুলিশ। গতকাল শুক্রবার আদাবর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বাড়ির পানির লাইনের কাজেও চাঁদা

আদাবরের মনসুরাবাদ হাউজিংয়ের ৬ নম্বর সড়কে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় সংস্কারকাজ চলছে। গতকাল দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কটি খুঁড়ে পানির লাইনের কাজ করা হচ্ছে। সড়কটির দুই পাশে রয়েছে ৫০ থেকে ৬০টি বাড়ি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়ক সংস্কারের সুযোগে বাড়িগুলোর পানির ও পয়োনিষ্কাশন লাইনের কাজ নিজেদের লোক দিয়ে করাতে বাধ্য করেছেন নয়ন হোসেনের অনুসারীরা। পরে কাজ শেষে বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়েছে।

স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, সড়কের ৬৯ ও ৭০ নম্বর বাড়ির পানির ও পয়োনিষ্কাশন লাইনের কাজের জন্য ৫৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। বাড়ির মালিক এত টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়।

বাড়িটির তত্ত্বাবধায়ক সাজু হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বাড়ির মালিক পরিচিত মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চার-পাঁচজন এসে তাঁদের দিয়েই কাজ করানোর জন্য চাপ দেন। তাঁরা নিজেদের ছাত্রদল নেতা নয়নের লোক বলে পরিচয় দেন। কাজ শেষে ৫৫ হাজার টাকা বিল করেন। এত টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁদের হুমকি দেওয়া হয়।

একই সড়কের আরেকটি বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী মো. শহীদুল্লাহ বলেন, তাঁদের বাড়ির একটি লাইনের কাজের জন্য তিন ধাপে জোর করে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। প্রথমে এত টাকা দিতে রাজি না হলেও পরে বাধ্য হয়ে দিতে হয়েছে। অন্য মিস্ত্রি দিয়ে কাজটি করালে ১০ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে যেত।

নির্মাণাধীন ভবন, দোকান ও কারখানায় চাঁদা

স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন জানান, আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নয়ন হোসেন ও সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার জসিমের নেতৃত্বে ছাত্রদলের নেতারা এলাকায় নির্মাণাধীন ভবন, ফুটপাতের দোকান এবং ছোট-বড় এমব্রয়ডারি কারখানা থেকে চাঁদা তোলেন।

তাঁদের অভিযোগ, এসব ব্যক্তি এলাকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে রেখেছেন। তাঁদের টাকা না দিয়ে এলাকায় নির্মাণকাজ ও ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় ব্যক্তিরা বলেন, নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে কাজ করতে গেলে চাঁদা দিতে হয়। ফুটপাতের দোকান ও কারখানাগুলো থেকেও টাকা নেওয়া হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে নানা ধরনের চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হয়।

বিএনপি নেতার বাড়ি দখলের চেষ্টা

নয়ন হোসেন ও মনিরুজ্জামান জসিমের নেতৃত্বে ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় বিএনপি নেতা মাসুম বাবুলের আলিফ হাউজিংয়ের একটি বাড়ি দখলের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন এই বিএনপি নেতা।

মাসুম বাবুল আদাবর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। তাঁর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, নয়ন ও তাঁর অনুসারীরা বাড়িটি দখল করতে না পারলেও ভাঙচুর করেন।

ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বাড়িটি দখল করতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে মাসুম বাবুলের অনুসারীদের সঙ্গে নয়নের অনুসারীদের সংঘর্ষ বাধে। পরে তাঁদের বাড়ির ফটক দিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। বাইরে থেকে বাড়িটির জানালার কাচ ভাঙচুর করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নয়ন ও তাঁর অনুসারীরা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে নানা ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন। বাড়ি দখলের চেষ্টা, নির্মাণকাজে বাধা ও চাঁদা আদায়ের ঘটনায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল।

আড়তে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার

কারওয়ান বাজারে মাছের আড়ত থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগে নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার তাঁর গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়।

তবে গ্রেপ্তারের পর আদাবর এলাকায় তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, নয়ন ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, বাড়ি দখলের চেষ্টা এবং নির্মাণকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

আদাবরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, এলাকার বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবন, দোকান ও কারখানা থেকে চাঁদা আদায়ের পাশাপাশি বাড়ির পানির ও পয়োনিষ্কাশন লাইনের কাজেও নিজেদের লোক নিয়োগ করে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়েছে।

নয়ন হোসেন ও মনিরুজ্জামান জসিমের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য জানা যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ছাত্রদল নেতাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।