রাজধানীর হাজারীবাগে এ জে আর পার্সেল অ্যান্ড কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের পর এবার প্রতিষ্ঠানটির গুদামে পেট্রল ঢেলে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেছে দুর্বৃত্তরা। আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই কর্মীরা তা নিভিয়ে ফেলেন। এর আগে মামলার বাদীকে মুঠোফোনে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মীকে মারধর করে মুঠোফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

রোববার (২৫ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে গুদামের পেছনের অংশে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তিনটি মোটরসাইকেলে করে ছয়জন দুর্বৃত্ত গুদামের কাছে আসে। একপর্যায়ে তারা কাপড়ে পেট্রল ঢেলে গুদামের পেছনে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করে। আশপাশের লোকজন বিষয়টি দেখতে পেয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলেন। পরে দুর্বৃত্তদের ধাওয়া করলে তারা মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।

গত ২০ অক্টোবর সন্ধ্যায় সিকদার মেডিকেল কলেজসংলগ্ন এ জে আর পার্সেল অ্যান্ড কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, হামলাকারীরা নিজেদের শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের লোক পরিচয় দিয়ে জমির ভাড়া দাবি করে। এ ঘটনায় করা মামলায় ইমনকে হুকুমদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে।

পাঁচ দিনে ধারাবাহিক হামলা

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২০ অক্টোবরের হামলার আগে হামলাকারীরা কার্যালয়ের আশপাশের বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে দেয়। এরপর মুখোশ ও হেলমেট পরা একদল ব্যক্তি দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে নিরাপত্তাকর্মীদের হুমকি দেয়। পরে গুদাম ও কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়। সিসিটিভি ক্যামেরা ও ফুটেজ সংরক্ষণের যন্ত্র ডিভিআর খুলে নেওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি ল্যাপটপ ও অন্যান্য মালামাল লুট করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, লুট হওয়া পণ্য ও মালামালের মূল্য প্রায় ৩১ লাখ টাকা। হামলাকারীরা হুমকি দেয়, এখন থেকে জমির ভাড়া শিকদার গ্রুপকে না দিয়ে ইমনকে দিতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, দুই বছর আগে শিকদার গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি করে জমিটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল।

এ ঘটনায় ২১ অক্টোবর এ জে আর কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবস্থাপক (এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন) আফসার উদ্দিন বাদী হয়ে হাজারীবাগ থানায় মামলা করেন। মামলায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ আনা হয়।

এরপর গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে মুঠোফোনে আফসার উদ্দিনকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁকে বলা হয়, শনিবারের মধ্যে সমঝোতা না করলে তাঁর ‘লাশ পড়ে থাকবে’। এ ঘটনায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

হুমকির কয়েক ঘণ্টা পর শনিবার ভোরে প্রতিষ্ঠানটির দুটি কাভার্ড ভ্যান ভাঙচুর করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এর পরদিন রোববার ভোরে গুদামে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করা হলো।

কর্মীকে মারধর করে মুঠোফোন-মানিব্যাগ ছিনতাই

গুদামে আগুন দেওয়ার চেষ্টার প্রায় দুই ঘণ্টা পর রোববার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মীকে মারধর ও ছিনতাইয়ের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, কাজ শেষে ওই কর্মী বাসায় ফিরছিলেন। পথে ছয় থেকে সাতজন দুর্বৃত্ত তাঁর গতিরোধ করে। তিনি এ জে আর কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী কি না, তা জানতে চাওয়ার পর তাঁকে মারধর করা হয়। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা একটি স্মার্টফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

এ জে আর কুরিয়ারের ব্যবস্থাপক আফসার উদ্দিন বলেন, একের পর এক হামলা, ভাঙচুর ও হুমকির কারণে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা আতঙ্কে রয়েছেন। কেউ কেউ ভয়ে কাজে আসছেন না। এর মধ্যে আবার একজন কর্মীকে মারধর করা হয়েছে। তাঁরা কর্মীদের নিরাপত্তা ও ঘটনার বিচার চান।

আটজন গ্রেপ্তার, উদ্ধার চারটি ডিভিআর

হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশাররফ হোসেন বলেন, আসামিরা টাকা আদায়ের জন্যই ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। এ ধরনের হামলা ও ভাঙচুর ঠেকাতে পুলিশ কাজ করছে। পাশাপাশি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

ওসি আরও বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার দুই আসামির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লুট হওয়া সিসিটিভি ক্যামেরার চারটি ডিভিআর উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার রাতে রায়েরবাজারের একটি মাঠের কাছ থেকে সেগুলো উদ্ধার করা হয়।

ধারাবাহিক হামলা, হত্যার হুমকি ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টার ঘটনায় তদন্তের অগ্রগতি এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।