আইনের শাসন সূচকে বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থানের সামান্য উন্নতি হলেও বিচারব্যবস্থা ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় দুর্বলতা কাটেনি। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের (ডব্লিউজেপি) ২০২৬ সালের সূচকে ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩তম। দেওয়ানি বিচারব্যবস্থায় ১৩২তম এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় ১৩৩তম অবস্থানে রয়েছে দেশটি। সামগ্রিক স্কোরে দুই ধাপ এগোলেও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে ঘানা, কেনিয়া, লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওন, নাইজেরিয়া ও জিম্বাবুয়ের মতো আফ্রিকার কয়েকটি দেশের চেয়ে।

ডব্লিউজেপির প্রকাশিত ‘রুল অব ল ইনডেক্স ২০২৬’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১-এর মধ্যে ০.৩৯১। এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ০.৩৯৩, যা আগের বছরের তুলনায় ০.৬ শতাংশ বেশি। এতে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৫তম থেকে দুই ধাপ এগিয়ে ১২৩তম হয়েছে। তবে স্কোর এখনো বৈশ্বিক গড় ০.৫৫-এর অনেক নিচে।

বার্ষিক হিসাবে সামান্য উন্নতি হলেও দীর্ঘমেয়াদি চিত্র উদ্বেগজনক। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের আইনের শাসনের সামগ্রিক স্কোর কমেছে ০.৮ শতাংশ। এ সময়ে সূচকের আটটি মানদণ্ডের মধ্যে ছয়টিতেই অবনতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে দেওয়ানি বিচারব্যবস্থায়।

দেওয়ানি বিচার ও মৌলিক অধিকারে সবচেয়ে দুর্বল

ডব্লিউজেপির সূচকে বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল ক্ষেত্র মৌলিক অধিকার সুরক্ষা। এ ক্ষেত্রে ০.৩০ স্কোর নিয়ে ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩তম। বিশ্বের সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকা ১১টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশও। আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত মৌলিক মানবাধিকার কতটা সুরক্ষিত, তা এ মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়।

দ্বিতীয় দুর্বলতম ক্ষেত্র দেওয়ানি বিচার। এ বিভাগে ০.৩৬ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩২তম। নাগরিকেরা দেওয়ানি বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে কতটা কার্যকরভাবে নিজেদের অভিযোগ ও বিরোধের নিষ্পত্তি করতে পারেন, তা এই মানদণ্ডে পরিমাপ করা হয়।

ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় ০.৩২ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ রয়েছে ১১৭তম স্থানে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা ও বিধিবিধানের প্রয়োগে ০.৪০ স্কোর নিয়ে অবস্থান ১২৪তম। ঘুষ, অনুচিত প্রভাব ও সরকারি সম্পদের অপব্যবহার বিবেচনায় নেওয়া ‘দুর্নীতির অনুপস্থিতি’ মানদণ্ডে ০.৩৫ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৩তম।

সরকারি ক্ষমতার ওপর আইনি নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে ০.৩৮ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ রয়েছে ১১১তম স্থানে। তুলনামূলক ভালো অবস্থান উন্মুক্ত সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সূচকে। উন্মুক্ত সরকারে ০.৪১ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম। আর আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় ০.৬৩ স্কোর নিয়ে অবস্থান ১০৭তম।

পাঁচ বছরে ছয় মানদণ্ডে অবনতি

ডব্লিউজেপির কান্ট্রি প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের আইনের শাসনের সামগ্রিক স্কোর ০.৪০ থেকে কমে প্রায় ০.৩৯ হয়েছে। আটটি মানদণ্ডের মধ্যে ছয়টিতেই অবনতি দেখা গেছে।

এ সময়ে সবচেয়ে বেশি, ৪.২ শতাংশ অবনতি হয়েছে দেওয়ানি বিচারে। উন্মুক্ত সরকারে অবনতি হয়েছে ২.৮ শতাংশ এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় ১.৫ শতাংশ। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতায় ০.৯ শতাংশ, ফৌজদারি বিচারে ০.৭ শতাংশ এবং দুর্নীতির অনুপস্থিতি মানদণ্ডে ০.২ শতাংশ অবনতি হয়েছে।

অন্যদিকে সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা মানদণ্ডে ২.৩ শতাংশ এবং আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় ০.৬ শতাংশ উন্নতি হয়েছে। অর্থাৎ, এক বছরের সামান্য অগ্রগতি সত্ত্বেও পাঁচ বছরের হিসাবে বিচারব্যবস্থা, অধিকার সুরক্ষা ও সরকারি কার্যক্রমের স্বচ্ছতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পিছিয়েছে বাংলাদেশ।

দক্ষিণ এশিয়ায় চতুর্থ, পেছনে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান

আঞ্চলিক তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আইনের শাসনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ অঞ্চলে নেপাল ৭১তম, শ্রীলঙ্কা ৭৪তম এবং ভারত ৮৮তম স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের পরে পাকিস্তান ১৩১তম এবং আফগানিস্তান ১৪২তম অবস্থানে রয়েছে।

আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গেও তুলনায় পিছিয়ে বাংলাদেশ। সূচকে ঘানা ৬২তম, কেনিয়া ১০০তম, লাইবেরিয়া ১০৩তম, সিয়েরা লিওন ১১০তম এবং নাইজেরিয়া ১২০তম স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের ঠিক এক ধাপ ওপরে রয়েছে জিম্বাবুয়ে, ১২২তম স্থানে।

বিশ্বের ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিক থেকে হলেও চলতি বছর স্কোর বৃদ্ধির হিসাবে দেশটি বিশ্বের ১৫তম বৃহত্তম অগ্রগতি অর্জনকারী এবং দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ অগ্রগতি অর্জনকারী দেশ হয়েছে। তবে সামগ্রিক স্কোরের উন্নতি বিচারব্যবস্থা ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষার দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার প্রমাণ নয়।

রাজনৈতিক বিভক্তি ও মানবাধিকার সংকটের প্রভাব

আইনের শাসন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি মনজিল মোরসেদ সমকালকে বলেন, বিদেশি সংস্থাগুলো বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এসব প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বাংলাদেশের অবস্থান ভালো, এমনটি দেখানোর সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, দেশে সবচেয়ে বড় মানবাধিকার সংকটগুলোর একটি রাজনৈতিক বিরোধ ও বিভক্তি। একটি দেশে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে এ ধরনের সংকট তৈরি হয়। রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

মনজিল মোরসেদ বলেন, বড় একটি রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটির নেতাকর্মীরা স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছেন না। মিছিল-মিটিং করলে তাঁদের আটক করা হচ্ছে। তাঁর মতে, একটি বড় রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলে তা মানবাধিকারের প্রশ্ন তৈরি করে।

তিনি আরও বলেন, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ ও মৌলিক অধিকার কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ঘটনায় উঠে আসছে। মবের মাধ্যমে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনাও মৌলিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ।

মনজিল মোরসেদের মতে, রাজনৈতিক বিভক্তি দূর না হলে আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি কঠিন হবে। সরকারের উচিত, মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং রাজনৈতিক বিভক্তি দূর করার উদ্যোগ নেওয়া। তা করা গেলে বাংলাদেশ বর্তমান অবস্থান থেকে অনেক ওপরে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি।