শিল্পকলা একাডেমির সামনে দেয়ালে আঁকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’-এর সদস্যসচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াসকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। একই মামলায় গ্রেপ্তার বাকি তিনজনকেও দুই থেকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে এবং এর অর্থের জোগান কোথা থেকে এসেছে, তা জানতে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।

রবিবার বিকেলে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

রিমান্ড শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী সাংবাদিকদের বলেন, আসামিরা সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা করেছেন বলে রাষ্ট্রপক্ষ মনে করে। ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, তা তদন্তের স্বার্থে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

পিপি বলেন, ‘আমাদের দেশে বিশেষ করে ঢাকা শহরে মানুষ রাস্তাঘাটে হাঁটতে পারে না। এ জন্য ফুটপাত উচ্ছেদ করে আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের গ্রাফিতি দেওয়া হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি অঙ্কন করা হয়েছে। এ আসামিরা সেগুলো মুছে দিয়ে মূলত সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।’

আয়াসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি, গালাগালির মাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানো এবং পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগও করেন এই আইনজীবী।

আসন্ন দুর্গাপূজার প্রসঙ্গ টেনে ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করেন। তাঁর অভিযোগ, রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়কে পূজার আগে উসকানি দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ভাইরাল হওয়ার জন্য রাস্তাঘাটে গালাগালি করার প্রয়োজন নেই। আসামিরা বিভিন্ন সময়ে সরকার ও জনগণের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কথা বলেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এই ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, তা বের করা জরুরি উল্লেখ করে পিপি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয় হয়। সে অর্থের উৎস সম্পর্কেও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে আসামিদের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। শুনানি শেষে আদালত আয়াসকে তিন দিন, সাকিবুল হাসানকে তিন দিন এবং মারজিয়া খন্দকার রিমি ও সুজন মিয়াকে দুই দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেন।

আদালতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

রিমান্ড শুনানিতে আয়াসের আইনজীবী মনির হোসেন সুমনসহ আসামিপক্ষের কয়েকজন আইনজীবী রিমান্ড বাতিলের আবেদন করেন। তাঁরা আসামিদের জুলাইযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে আদালতে বক্তব্য দেন।

নারী আসামি মারজিয়া খন্দকার রিমির তিন বছরের একটি শিশু রয়েছে উল্লেখ করে তাঁর আইনজীবীরা রিমান্ড নামঞ্জুর ও জামিনের আবেদন করেন। শুনানির একপর্যায়ে বিচারক শিশুটি দুগ্ধপোষ্য কি না, তা জানতে চান। পরে আদালত রিমান্ডের আদেশ দেন।

আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জুলাইযোদ্ধা পরিচয়ের প্রসঙ্গে পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় যা-ই হোক, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। মুক্তিযোদ্ধা বা জুলাইযোদ্ধা, যে-ই হোন না কেন, অপরাধ করলে তাঁকে আইনের আওতায় আনতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

গত শনিবার দুপুরে শিল্পকলা একাডেমির সামনে দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মুছতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন একদল তরুণ। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে আল নূর মোহাম্মদ আয়াসসহ চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।

ঘটনাস্থলে এক নারীকে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দিতে দেখা যায়। এ সময় এক পুলিশ সদস্য তাঁকে বাধা দেন। ওই নারী দাবি করেন, তাঁরা ‘ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ’ জানাতে এসেছেন। পুলিশের বাধার মুখে আয়াসের নেতৃত্বে দলটি স্লোগানও দেয়।

এ ঘটনায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিদ্বেষ ছড়ানো এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মামলা করা হয়। মামলায় গ্রেপ্তার চারজনকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ।

গ্রাফিতি নিয়ে বিতর্ক

গত ৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচার ফুটপাত দখলমুক্ত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এরপর ফুটপাতসংলগ্ন দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ১০ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের গ্রাফিতি আঁকা হয়।

গত শুক্রবার ‘জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে এসব সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ছবি আঁকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সেখানে সত্যজিৎ রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে ‘পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করে তাঁদের প্রতিকৃতি আঁকার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

এর পরদিন শনিবার ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’-এর সদস্যসচিব আয়াসের নেতৃত্বে একদল ব্যক্তি গ্রাফিতিগুলো মুছতে গেলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। ওই ঘটনার পর চারজনকে আটক করে পুলিশ।

গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে। পুলিশের তদন্তে ঘটনার পেছনে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা কিংবা অর্থের জোগানদাতার বিষয়ে কী তথ্য উঠে আসে, তা এখনো জানা যায়নি।