রিয়াজুল ইসলাম, শরণখোলা (বাগেরহাট) থেকে: বাগেরহাটের শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জসহ সুন্দরবন-সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় ফসলের ক্ষেতে ইঁদুরের উপদ্রব বাড়ায় উদ্বিগ্ন কৃষকেরা। ধান, শাকসবজি ও রবিশস্য রক্ষায় কিছু কৃষক জমিতে বৈদ্যুতিক তার দিয়ে ইঁদুর মারার ফাঁদ তৈরি করছেন। কিন্তু এসব ফাঁদে শুধু ইঁদুরই মরছে না; প্রাণ হারাচ্ছেন কৃষক ও সাধারণ মানুষ। ঝুঁকিতে পড়ছে গবাদিপশু, বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যও।

সাম্প্রতিক সময়ে শরণখোলায় বৈদ্যুতিক ফাঁদে কৃষকের মৃত্যুর ঘটনা আবারও এই বিপজ্জনক প্রবণতার ভয়াবহতা সামনে এনেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ফসল রক্ষার নামে জমির আইল ও আশপাশে বিদ্যুতের তার পেতে রাখায় কখনো নিজের জমিতে কাজ করতে গিয়ে, কখনো অন্যের জমি পার হতে গিয়ে মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। অথচ এসব ফাঁদ সম্পর্কে আশপাশের জমির মালিক কিংবা পথচারীদের অনেকেই জানেন না।

কৃষকের ফসল রক্ষার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা অন্যের জীবন বিপন্ন করার অজুহাত হতে পারে না। তাই বিপজ্জনক বৈদ্যুতিক ফাঁদ বন্ধে প্রশাসনিক নজরদারি, জনসচেতনতা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।

শরণখোলায় প্রতিবেশীর জমির ফাঁদে কৃষকের মৃত্যু: গত ২১ অক্টোবর ২০২৬ বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার উত্তর সাউথখালী গ্রামে ইঁদুর মারার বৈদ্যুতিক ফাঁদে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মিজান হাওলাদার (৫০) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়। নিজের ধানখেতে কীটনাশক ছিটাতে যাওয়ার সময় প্রতিবেশীর জমির আইলে পেতে রাখা বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে তিনি মারা যান।

সূত্র জানায়, ওই এলাকার কৃষক সালেক মোল্লা ও বাবুল মোল্লা নিজেদের জমিতে ইঁদুর দমনের জন্য লোহার তারে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে ফাঁদ পেতে রেখেছিলেন। মিজান হাওলাদার নিজের জমিতে প্রবেশের সময় সেই তারের সংস্পর্শে আসেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। শরণখোলা থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর কথা ছিল এবং অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়েছিল।

এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, একটি জমির ফসল রক্ষার জন্য পাতা ফাঁদ কীভাবে অন্য জমিতে কাজ করতে যাওয়া মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে? একই এলাকার মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সতর্কতা ও প্রশাসনিক নজরদারি থাকলে এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব কি না, সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।

নিজের পাতা ফাঁদেই প্রাণ হারান কৃষক: শরণখোলায় বৈদ্যুতিক ফাঁদে মৃত্যুর ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ১৯ মার্চ ২০২৫ উপজেলার ধানসাগর গ্রামে নিজের পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান কৃষক মো. আলম শেখ (৫৫)। ইঁদুরের হাত থেকে বোরো ধান রক্ষার জন্য তিনি লোহার তারে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে ফাঁদ তৈরি করেছিলেন। পরদিন সকালে জমিতে গিয়ে খালে নামার সময় পা পিছলে তারের ওপর পড়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন তিনি। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

দেশের অন্য এলাকাতেও প্রাণহানির ঘটনা: বৈদ্যুতিক ফাঁদে মৃত্যুর ঘটনা শুধু শরণখোলায় সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন কৃষিপ্রধান এলাকায় একই ধরনের দুর্ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

বরগুনার তালতলীতে শিশুর মৃত্যু: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ উপজেলার বড়বগী ইউনিয়নের বড় ভাইজোড়া গ্রামে ধানখেতে ইঁদুর মারার বৈদ্যুতিক ফাঁদে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মো. ইমরান (৮) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে তার মায়ের সঙ্গে ধানখেতে ছাগলের জন্য ঘাস কাটতে গিয়েছিল। শিশুটি হরিণবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

বরগুনার তালতলীতে কৃষক কাদের মুন্সীর মৃত্যু: ৫ এপ্রিল ২০২৫ রাতে উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নের বড় আমখোলা গ্রামে ধানখেতের বৈদ্যুতিক ফাঁদে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কৃষক কাদের মুন্সী (৬৫) মারা যান।

খুলনার কয়রায় কৃষকের মৃত্যু: ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে খুলনার কয়রা উপজেলার বাগালী ইউনিয়নের গাজীনগর গ্রামে ইঁদুর মারার বৈদ্যুতিক ফাঁদে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কৃষক খোকন মোড়ল (৪৫) মারা যান। রাতের কোনো একসময় তিনি ধানখেতে গিয়ে বিদ্যুতের তারের সংস্পর্শে আসেন। পরদিন সকালে স্থানীয়রা তাঁকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান।

শরীয়তপুরে কৃষকের মৃত্যু: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও ইউনিয়নের নাজিমপুর গ্রামে ইঁদুর মারার জন্য ধানখেতে স্থাপন করা বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে কৃষক রিপন মাদবর (৪৫) মারা যান। এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, বৈদ্যুতিক ফাঁদে প্রাণহানি বিচ্ছিন্ন কোনো এলাকার সমস্যা নয়। তবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলো দিয়ে সারা দেশে প্রতিবছর ঠিক কতজন মারা যান, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

কেন এত বিপজ্জনক এই ফাঁদ?

কৃষিজমিতে পেতে রাখা বিদ্যুতের তার অনেক সময় ঘাস, কাদা, ফসল কিংবা জমির আইলের আড়ালে থাকে। ফলে দিনের বেলায়ও তারের উপস্থিতি সহজে বোঝা যায় না; সন্ধ্যা বা রাতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। জমিতে কাজ করতে যাওয়া কৃষক, পাশের জমির মালিক, ঘাস সংগ্রহকারী নারী-পুরুষ, শিশু কিংবা গবাদিপশু অসাবধানতাবশত এসব তারের সংস্পর্শে আসতে পারে। ফাঁদটি যে জমিতে স্থাপন করা হয়েছে, শুধু সেই জমির মানুষই নয়, আশপাশের অন্য জমিতে কাজ করা ব্যক্তিরাও ঝুঁকিতে থাকেন।এ ছাড়া ফাঁদ স্থাপনকারী কৃষক নিজেও কখনো অসতর্কতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতে পারেন। ফলে ফসল রক্ষার জন্য তৈরি করা এই ব্যবস্থা কৃষক ও সাধারণ মানুষের জন্যই বিপদের কারণ হয়ে উঠছে।

আইনে কী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব?

ইঁদুর দমনের উদ্দেশ্য থাকলেও এমনভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা, যাতে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়, তা জননিরাপত্তার গুরুতর বিষয়। কোনো ঘটনায় মৃত্যু ঘটলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা, বিদ্যুৎ সংযোগের ধরন, অবহেলা বা বেআইনি কাজের প্রমাণ এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় গ্রামবাসী।

এ ব্যাপারে স্থানীয় পর্যায় থেকে কয়েকটি পদক্ষেপের সুপারিশ এসেছে:

  • পুলিশের তদন্ত: বৈদ্যুতিক ফাঁদে মৃত্যু বা গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তির ভূমিকা নির্ধারণ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ।

  • বিদ্যুৎ বিভাগের নজরদারি: অননুমোদিত ও বিপজ্জনকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ঘটনা শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।

  • প্রশাসনের সমন্বিত অভিযান: শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জের কৃষিপ্রধান এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ফাঁদ শনাক্ত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।

  • কৃষকদের বিকল্প পদ্ধতি শেখানো: কৃষি বিভাগের মাধ্যমে নিরাপদ ইঁদুর দমন পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া।

  • দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ: কোথায়, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনা ঘটছে, তার তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ।

ফসল রক্ষায় চাই নিরাপদ বিকল্প: কৃষকের ফসল রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইঁদুরের উপদ্রবে ধান ও রবিশস্য নষ্ট হলে কৃষককে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। কিন্তু সেই ক্ষতি ঠেকানোর পদ্ধতি যেন অন্য মানুষের প্রাণহানির কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয়রা দাবী করেছেন, কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী ইঁদুরের গর্ত ও চলাচলের পথ শনাক্ত করা, জমি পরিষ্কার রাখা, অনুমোদিত ফাঁদ ব্যবহার এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইঁদুর দমন করা যেতে পারে। যেকোনো পদ্ধতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষ, গবাদিপশু ও বন্য প্রাণীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জের কৃষিজমিতে ইঁদুরের উপদ্রব মোকাবিলায় কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি বিপজ্জনক বৈদ্যুতিক ফাঁদ ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ করাও জরুরি।

এখনই কার্যকর পদক্ষেপের দাবি: প্রতি বছর বৈদ্যুতিক ফাঁদে মানুষের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হলেও এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জে প্রশাসন, পুলিশ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং কৃষি বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হলে বিপজ্জনক ফাঁদ ব্যবহারের প্রবণতা কমানো সম্ভব হতে পারে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষক সংগঠন, বাজার কমিটি, মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও সচেতনতামূলক প্রচার চালানো যেতে পারে। পাশাপাশি অভিযোগ গ্রহণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয়তা প্রয়োজন।

ফসল রক্ষার জন্য কোনো কৃষক যেন নিজের জীবন বিপন্ন না করেন, আবার অন্যের জমিতে পাতা ফাঁদে পড়ে কোনো নিরপরাধ মানুষকেও যেন প্রাণ দিতে না হয়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

ইঁদুর মারার ফাঁদে আর কোনো প্রাণহানি নয়। ফসল রক্ষা হোক নিরাপদ পদ্ধতিতে, আর মানুষের জীবন রক্ষায় বিপজ্জনক বৈদ্যুতিক ফাঁদ বন্ধে নেওয়া হোক কার্যকর ও আইনানুগ ব্যবস্থা।